📷 আর্কাইভ ছবি অবলম্বনে এআই পুনর্নির্মাণ।
শরীফ খিয়াম আহমেদ, ঢাকা
বাংলাদেশের প্রধান মাতৃভাষা বাংলাকে তিনি বিশ্বমঞ্চে অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছেন। অথচ দশকের পর দশক ধরে এই ভূখণ্ডের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলোর প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে আছেন। কী জীবন্ত, কী প্রভাবসঞ্চারী! আজও কত প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নোবেলজয়ী এই বাঙালি কবি বাংলা তথা ভারতবর্ষ ভাগের কারণে এখন ভারতীয় বিবেচিত হলেও বাংলাভাষীদের নিজস্ব জাতিরাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে তিনি এক সমুজ্জ্বল নক্ষত্র। একই কারণে পাকিস্তানপন্থী বাংলাদেশিদের দু-চক্ষের বিষ। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন এখানকার বাঙালি সংস্কৃতি মুছে ফেলতে রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা ভাষাকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল, তখন রবীন্দ্রনাথের গান ও সাহিত্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। যারই ধারাবাহিকতায় তিনি আজও এই জনপদের বাংলাভাষীদের স্বাধিকার আন্দোলন এবং আত্মবিশ্বাসের এক অবিচ্ছেদ্য ভিত্তিপ্রস্তর।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির দেওয়ালজুড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ কয়েকজন বাঙালি মনীষীর ছবি আঁকা হয়েছিল। ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ নামের একটি সংগঠনের সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াসের নেতৃত্বে একদল লোক সেখানে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি লেপে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আয়াসসহ চারজনকে আটক করে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রদ্রোহ, সামাজিক উসকানি প্রদান এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত তাঁদের রিমান্ডে পাঠায়। এমন সময়ে আমরা দেখতে পাই, এক রিকশাচালক নিজ উদ্যোগে কাঁধের গামছা ও পানি দিয়ে সযত্নে কবির প্রতিকৃতির ওপর থেকে কালি পরিষ্কার করে দেন। তাঁর এই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসার ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সর্বস্তরের মানুষের প্রশংসায় ভাসেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি বিকৃতির চেষ্টার প্রতিবাদে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনও রাজপথে নেমে আসে। ওই দেয়ালচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে শিল্পীরা ‘শতকণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত’ এবং ‘যে কবি জনতার’ শিরোনামে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের আইনি পদক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধে এটা যখন আবারও স্পষ্ট হয় যে, বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবমাননা বাংলাদেশিরা কোনোভাবেই মেনে নেয় না, ঠিক তখন “বদলাইতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত” শীর্ষক এক ভিডিও নিয়ে হাজির পিনাকী ভট্টাচার্য। বাংলাদেশে উগ্রপন্থী মুসল্লিদের প্রিয় এই ফ্রান্স-প্রবাসী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের কথার সারমর্ম হলো, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের মানুষের স্বার্থে এবং ঢাকাকে কেন্দ্র করে নতুন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কলকাতার জমিদার ও বাবুরা তাঁদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের চারণ কবি হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেছিলেন। গানটি পূর্ববঙ্গের সাধারণ চাষা-ভূষা ও মেহনতি মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক নয়, বরং এটি কলকাতার জমিদার শ্রেণির শোষণ ও অখণ্ড ভারতের ভাবধারা বহন করে।
ভিডিওতে দাবি করা হয় যে, গানটি প্রথম প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়। পিনাকীর ভাষ্যমতে তারা ইসলামোফোবিক; পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করত। ১৯৭১ সালে সিরাজুল আলম খানসহ কয়েকজন নেতা সাধারণ মানুষের সরাসরি মতামত বা গণভোট না নিয়েই ইকবাল হলের ক্যান্টিনে বসে এটি জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। পিনাকী ভট্টাচার্য সিরাজুল আলম খানকে ভারতের ‘র’-এর এজেন্ট চিত্তরঞ্জন সুতারের ঘনিষ্ঠ সহচর বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, চিত্তরঞ্জন সুতার ও ভারতীয় গোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথের ‘অখণ্ড সোনার বাংলা’ ভাবধারাকে সামনে রেখে এই গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেছিল।
পিনাকীর দাবি, অবিলম্বে একটি গণভোটের মাধ্যমে এই গান বাতিল করা উচিত এবং বাংলাদেশের নিজস্ব আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও মুক্তির প্রতীক বহনকারী একটি নতুন জাতীয় সংগীত নির্বাচন করা প্রয়োজন। এর দুই দিন আগে ফেসবুকে তিনি লিখেছিলেন, “আয়াসকে গ্রেফতার করসেন ভালো কথা, এবার ছাইড়্যা দেন। মনে রাইখেন, সে আমাদের কমরেড।”
এই প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের পুনর্পাঠ জরুরি। “বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁদের এ কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই যে ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাশাসক আইয়ুব খান এবং তাঁর তল্পিবাহকেরা পাকিস্তানে তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালনে বাধা দিয়েছিল। আর যাঁরা সেই ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত নন, তাঁদের এ কথা জানা জরুরি যে এ ঘটনার পর এই দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল।” ঢাকার দৈনিক প্রথম আলোতে এভাবেই লিখেছেন বাংলাদেশি-মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সেই লেখায় তিনি আরও বলেছেন, “এর ঠিক ছয় বছর পর রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে দেশে একটি বিতর্কের সূচনা হয়। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন যে পাকিস্তানের আদর্শের সঙ্গে না মিললে রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই প্রশ্নটি উঠেছিল ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় বেতারে রবীন্দ্রসংগীত প্রচারিত হয়নি এই প্রেক্ষাপটে; সম্ভবত লিখিতভাবেই তা করা হয়েছিল। খাজা শাহাবুদ্দিনের বক্তব্যের পরে মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর বলেছিলেন, পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন এবং রবীন্দ্রসংগীত হিন্দু সংস্কৃতির অংশ।”
আলী রীয়াজ যোগ করেন, “এ ধরনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবী-শিল্পীদের এক বড় অংশ প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন। এই বছরই ছায়ানটের উদ্যোগে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার এই প্রচেষ্টার পক্ষেও অনেক লেখক-অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবী সরকারের হয়ে কথা বলেছিলেন। বিতর্কের রেশ চলেছে অনেক দিন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মানুষের মনে ‘নিষিদ্ধ’ হননি।”
পরবর্তীতে আলী রীয়াজ যখন বাংলাদেশের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় উদ্ভূত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে তাণ্ডব চালায়। হামলাকারীরা নিচতলার পার্কিং ও সার্ভার রুমে অগ্নিসংযোগ করে। ভবনের প্রতিটি তলায় প্রবেশ করে সিসিটিভি ক্যামেরা, কম্পিউটার, সাউন্ড সিস্টেম এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। শ্রেণিকক্ষ ও মিলনায়তনে থাকা শিক্ষার্থীদের অনুশীলনের হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, তানপুরাসহ বহু বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলে এবং কিছু ল্যাপটপ-সরঞ্জাম লুটপাট করে।
সংস্কৃতিজন প্রয়াত ড. সনজীদা খাতুনের প্রতিকৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। পিনাকী ভট্টাচার্য তাঁর ভিডিওতে সনজীদা খাতুনকে ব্যঙ্গ করে ‘বাঙ্গু প্রগতিশীল’ আখ্যা দিয়ে তাঁর শেষকৃত্য রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ করেন। জাতীয় সংগীত পরিবর্তন বিতর্ককে কেন্দ্র করে তথাকথিত প্রগতিশীল গোষ্ঠী কীভাবে রবীন্দ্র সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে আছেন, তা বোঝাতেই তিনি সনজীদা খাতুনের শেষকৃত্যের এই উদাহরণটি ব্যবহার করেছেন।
আইয়ুব খানের সামরিক সরকারের প্রবল নিষেধাজ্ঞা ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন সনজীদা। এই শতবর্ষ উদ্যাপনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছায়ানট। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে দীর্ঘকাল সভাপতির দায়িত্ব পালন করে ছায়ানটকে বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষালয় ও জাতীয় দুর্গে পরিণত করেন সনজীদা। ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজনের নেপথ্যে তাঁর অসামান্য অবদান ছিল, যা পরবর্তীতে বাঙালি জাতির সার্বজনীন উৎসবের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশি লেখকদের একাধিক প্রবন্ধের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের জুন মাসে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে আইয়ুব খান সরকারের কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানান। ঢাকার নবাব পরিবারের এই সদস্য সংসদে দাবি করেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও রচনা পাকিস্তানের সংস্কৃতি, আদর্শ ও জাতীয় চেতনার পরিপন্থী।” তিনি ঘোষণা দেন, রেডিও পাকিস্তান ও ঢাকা টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসংগীতের সম্প্রচার বন্ধ বা অত্যন্ত সীমিত করা হবে, যাতে পাকিস্তানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন না হয়।
তাঁর এই বক্তব্যের পর সংসদে উপস্থিত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি সংসদ সদস্যরা প্রবল প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। বাঙালি আইনপ্রণেতারা এই সিদ্ধান্তকে পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি ও ভাষার ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁরা যুক্তি দেন যে, রবীন্দ্রনাথ কোনো ধর্মের বা দেশের একক সম্পত্তি নন; তিনি বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর গানকে পাকিস্তানি সংস্কৃতিবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেওয়া অত্যন্ত সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক।
সংসদে বিরোধী দল ও গণমাধ্যমের তোপের মুখে পড়ে পরবর্তীতে সরকার সুর কিছুটা নরম করার চেষ্টা করে। সংসদে জানানো হয়: “পুরো রবীন্দ্রনাথকে একেবারে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না, তবে যেসব গান পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ভাবধারার সাথে মেলে না, সেগুলোই কেবল বেতার-টিভিতে প্রচার করা হবে না।” কার্যত এটি ছিল একপ্রকারের পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা, যা রেডিও পাকিস্তান থেকে রবীন্দ্রসংগীতকে দৃশ্যত ছেঁটে ফেলেছিল।
বদরুদ্দীন উমর তখন লিখলেন, “রবীন্দ্রসঙ্গীত বাতিল করার আন্দোলন রবীন্দ্রবিরোধিতার শেষ পর্যায় নয়। এটা একেবারে প্রথম পর্যায়। এরপর ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথের কাব্য, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, চিঠিপত্র সব কিছুর মধ্যে ‘তৌহিদবাদ-বিরোধী’ মালমসলা যথাসময়ে আবিষ্কৃত হবে এবং মুমীনের দল সেগুলো বরদাশত করতে নারাজ বলে ঊর্ধ্ব গগনে মাদল বাজিয়ে ধরণীতল উতলা করবেন। এখন রবীন্দ্রসঙ্গীত বাতিলের চেষ্টা হচ্ছে রেডিও-টেলিভিশন থেকে; কাব্যসাহিত্য সম্পূর্ণভাবে বাতিল হবে পাঠ্যপুস্তক থেকে। কারণ রবি ঠাকুরের গান শুনলে যদি ধর্মনাশ হয় তাহলে তাঁর কাব্যসাহিত্য চর্চা করলে দেশের ধর্মরক্ষা পাবে কেমন করে? এ যুক্তি নিতান্তই অকাট্য এবং প্রথমটি স্বীকার করলে দ্বিতীয়টি অস্বীকার করার উপায় থাকে না।”
আইয়ুব খানের সামরিক শাসন আমলে বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে বদরুদ্দীন উমর যে ঐতিহাসিক ট্রিলজি—‘সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৬), ‘সংস্কৃতির সংকট’ (১৯৬৭), ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৯)—রচনা করেছিলেন, তার দ্বিতীয় বইয়ের “রবীন্দ্রনাথ ও পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি” শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি আরও লিখলেন, “রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু’ এবং ‘ভারতীয়’, এই দুই কারণে তাঁকে নাকি বাতিল করা উচিত। মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, তক্ষশীলাকে এঁরা পাকিস্তানের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে সগৌরবে প্রচার করে বিদেশি মুদ্রা অর্জন করতে দ্বিধাবোধ করেন না। তাঁদের যত দুশ্চিন্তা এবং আপত্তি পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। এদেশের লোকের ঠুনকো ঈমান কোন্ কবিতা, গান অথবা উপন্যাসের দ্বারা বিনষ্ট হতে পারে সেদিকে তাঁদের সতর্ক দৃষ্টি। এ মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে হলে কাফেরদের বর্জন করতেই হবে এবং তার সাথে মুনাফেকদেরকেও।”
উমর লিখেছিলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা এবং রক্ষা করার স্বর্গীয় দায়িত্ব যাঁরা গ্রহণ করেছেন তাঁদের মতে রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু’ এবং ‘ভারতীয়’; কাজেই রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলে অথবা রবীন্দ্র কাব্যসাহিত্যের চর্চা করলে এদেশের ‘তৌহিদবাদী’ মুসলমানদের দুনিয়া এবং আখেরাত দুইই বরবাদ হবে। এই সমস্ত সংস্কৃতিসেবীদের মধ্যে এমন কিছু সংখ্যক ব্যক্তি আছেন যাঁরা মাত্র কিছুকাল আগে পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথকে ভাঙিয়ে দিন গুজরান করেছেন। এখন রবীন্দ্রচর্চার দ্বারা আর বিশেষ সুবিধা নেই, কাজেই তাঁরা রবীন্দ্র-বিরোধী। তাঁদের প্রধান যুক্তি এই যে, রবীন্দ্রনাথ বাঙলা সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও পূর্ব পাকিস্তানী সংস্কৃতির তিনি কেউ নন। অর্থাৎ তাঁদের মতে পূর্ব পাকিস্তানী সংস্কৃতির সাথে বাঙলা সাহিত্য সম্পর্কহীন।”
তাঁর ভাষ্য ছিল, “রবীন্দ্রবিরোধী এই আন্দোলনকে প্রথম দৃষ্টিতে উন্মাদ মনে হলেও আসলে এটা যে বাঙ্লা ভাষা ও সাহিত্য চর্চা বিরোধী আন্দোলন একথা বোঝার জন্য খুব বেশি মস্তিষ্ক চালনার প্রয়োজন হয় না। এ আন্দোলন ১৯৪৮ বা ১৯৫২ সালের মতো সরাসরি বাঙ্লাকে অস্বীকার এবং বাতিল করার আন্দোলন নয়। এ আন্দোলন তার থেকে অনেক সূক্ষ্ম এবং পরোক্ষভাবে বাঙ্লা ভাষা ও সাহিত্যকে পঙ্গু করার আন্দোলন। এর অনেক দিক আছে এবং রবীন্দ্রবিরোধিতা তারই একটি। এ বিরোধিতাকে তাই বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে এর চরিত্রকে একটি সামগ্রিক পটভূমিতে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। সেতা করলে দেখা যাবে যে রবীন্দ্র-বিরোধিতা, বাঙ্লা ভাষা সরলীকরণ, নববর্ষ উৎসব বন্ধ করার প্রচেষ্টা ইত্যাদি সমস্তই একই উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বরং এ উদ্দেশ্যের সাথে ১৯৪৮ এবং ১৯৫২ সালের বাঙ্লা ভাষা বিরোধী প্রচেষ্টা ওতপ্রোত যোগসূত্রে জড়িত।”
আইয়ুব খান সরকার প্রকাশের পরপরই উমরের বইটি বাজেয়াপ্ত করেছিল। ট্রিলজির তাঁর শেষ বইটিতেও তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকে একটি ‘বিচিত্র মহাদেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উমর লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্য প্রথম বিশ্বপরিচয় লাভ করে এবং তাঁর সৃষ্টি বহু বিদেশি সভ্যতার সাথে ভারতীয় সংস্কৃতির যোগসাধনার শ্রেষ্ঠ ফসল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শাসকগোষ্ঠী ও একশ্রেণির প্রতিক্রিয়াশীল ‘সংস্কৃতিসেবী’ কায়েমী স্বার্থে যে রবীন্দ্র-বিরোধিতা গড়ে তুলেছিল, উমর তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, কীভাবে মার্কিন অপসংস্কৃতি বা বিদেশি প্রভাবকে মেনে নিয়েও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বা গানকে ‘ইসলাম-বিরোধী’ বা ‘বিজাতীয়’ আখ্যা দিয়ে বর্জন করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রের অংশ।
উমরের ভাষ্যমতে, পাকিস্তান আন্দোলনকালে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের প্রধান আদর্শিক হাতিয়ারই ছিল সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা। ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ বইয়ের ‘ভাষা ও বানান সংস্কারের রাজনীতি’ প্রবন্ধে তিনি জানান, পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা ও হরফ সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার পেছনে কোনো ভাষাগত বা বৈজ্ঞানিক কারণ ছিল না; বরং এটি ছিল শোষক বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর একটি গভীর রাজনৈতিক চক্রান্ত। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান বাংলা হরফকে ‘হিন্দু হরফ’ বা দেবনাগরী থেকে সৃষ্ট আখ্যা দিয়ে এর পরিবর্তে আরবি হরফ চালুর প্রস্তাব করেন। কেউ কেউ আবার ‘বিজ্ঞানসম্মত’ করার অজুহাতে রোমান হরফ প্রবর্তনের সুপারিশ করেন।
মওলানা আকরাম খাঁ-র নেতৃত্বে গঠিত ভাষা কমিটি বাংলা ভাষা থেকে তথাকথিত ‘হিন্দু ও সংস্কৃত প্রভাব’ ছেঁটে ফেলার প্রস্তাব করে। তারা শব্দ ও বাক্যাংশ পরিবর্তনের অদ্ভুত উদাহরণ দেয়—যেমন “আমি তোমায় জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না” বাক্যটির বদলে “আমি তোমায় কেয়ামতের দিন পর্যন্ত ভুলিব না” চালু করার কথা বলা হয়। এছাড়া ‘সহজ বাংলা’ তৈরির নামে ভাষা সংক্ষেপণ এবং টাইপরাইটারে লেখার সুবিধার অজুহাতে বাংলা বর্ণমালা কেটে ছোট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
উমরের যুক্তি ছিল, একটি ভাষার হরফ বা গঠন পরিবর্তনের জন্য যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, তৎকালীন সমাজে তার অস্তিত্ব ছিল না। টাইপরাইটার বা অবৈজ্ঞানিক বর্ণমালার অজুহাত তুলে শাসকগোষ্ঠী মূলত পূর্ব বাংলার মানুষদের তাদের হাজার বছরের ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল, যাতে সহজেই তাদের ওপর মানসিক ও রাজনৈতিক শোষণ কায়েম রাখা যায়।
এমন প্রেক্ষাপটেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামের একটি ঐতিহাসিক সংকলন। এতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীসহ পূর্ব পাকিস্তানের প্রখ্যাত ১৮-২০ জন বুদ্ধিজীবীর রবীন্দ্র-বিষয়ক নিবন্ধ স্থান পায়, যা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আরেকটি বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব ছিল।
কালি ও কলমের রবীন্দ্র সার্ধজন্মশতবার্ষিকী সংখ্যায় “রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশ” শীর্ষক এক প্রবন্ধে আনিসুজ্জামান লিখেছেন, “রবীন্দ্রসংগীত-সম্পর্কিত এই বিতর্ক শুরু হওয়ার আগেই আমি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তানের লেখকদের প্রবন্ধের একটি সংকলনের কাজে হাত দিয়েছিলাম। তথ্যমন্ত্রীর বিবৃতির পরে আমার সে-প্রয়াস অন্য মাত্রা নিলো। আমার প্রস্তাবিত লেখকদের কেউ কেউ সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁরা এতে লিখবার ঝুঁকি নিতে রাজি হলেন না, কিন্তু অন্য অনেকে আবার বেশ উৎসাহী হয়ে উঠলেন। পরিকল্পিত সংকলনটি সরকারি নীতির উপযুক্ত প্রতিবাদ হিসেবে গণ্য হলো।”
“আমি জয়নুল আবেদিনকে ধরলাম বইটির জন্যে রবীন্দ্রনাথের একটি প্রতিকৃতি এঁকে দিতে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি তাঁকে প্রতিকৃতি-শিল্পী মনে করি? বললাম, তা নয়; যে-মনোভাব নিয়ে তিনি সরকারি নীতির বিরুদ্ধে বিবৃতিতে স্বাক্ষর দিয়েছেন, সেই মনোভাব থেকেই যদি ছবিটা এঁকে দেন! তিনি আর দ্বিধা করলেন না। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ—তখন তাঁর বয়স ৮২—রবীন্দ্রসংগীত-বিষয়ে বিতর্ক এড়িয়ে গেছেন এ-যাবত। তাঁর কাছে যখন আমার সংকলনের জন্যে লেখা চাইলাম, বললেন, তিনি মুখে-মুখে বলে যাবেন, আমি যেন শ্রুতিলিপি নিই। একদিন তাঁর বাড়িতে, একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনে তাঁর অফিসকক্ষে বসে কাজটা করলাম। পরে তিনি সংশোধন করে দিলে সংকলনের গোড়ায় সেটা ছাপলাম। যতদূর জানি, এটাই শহীদুল্লাহর শেষ লেখা।”
আনিসুজ্জামান আরও লিখেছেন, “তিরিশজন প্রাবন্ধিকের লেখা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বের হলো ১৯৬৮ সালে। এর প্রকাশনা-অনুষ্ঠানে যেমন জনসমাগম হলো, পত্রপত্রিকায় তেমনি তার খবর বের হলো গুরুত্বের সঙ্গে। পরের বছরেই তো শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘটল গণ-অভ্যুত্থান, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঢেউ তুঙ্গে উঠল। সভা-সমিতিতে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া প্রায় রেওয়াজ হয়ে দাঁড়াল।” একই লেখায় তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ‘আমার সোনার বাংলা’ এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, তখন বহু জায়গায় তা অশুদ্ধ উচ্চারণে ও ভুল সুরে কিন্তু সত্যিকার আবেগ দিয়ে গাইতে শুনেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম দশচরণ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতরূপে গৃহীত হয়।”
“পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, মুসলিম লিগের জয়জয়কার। তাঁরাও সংস্কৃতি বিষয়ে লাগসই তত্ত্ব খুঁজছেন। কিছুকাল পর সেটা দিলেন সৈয়দ আলী আহসান। তিনি বললেন, আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং জাতীয় সংহতির প্রয়োজনে আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত। তবে পাঠক্রমে কিংবা রাষ্ট্রীয় বেতারে রবীন্দ্রনাথের স্থান এতে কোনোভাবেই পরিবর্তিত হয়নি। লেখক-শিল্পী মজলিস কিংবা পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের মতো প্রতিষ্ঠানও রবীন্দ্র-জয়ন্তী পালনে কোনো বাধা অনুভব করেনি।” এভাবেই আনিসুজ্জামান সেই সময়টাকে স্মরণ করেন।
তিনি লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বড়রকম বিতর্ক দেখা দিল ১৯৬১ সালে। সারা বিশ্বব্যাপী রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের আয়োজন হচ্ছে, কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা স্বদেশে তা করতে দিতে চায় না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বলে বাংলা একাডেমীও এক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নিল না। রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পালনের জন্যে ঢাকায় বেসরকারিভাবে তিনটি কমিটি গড়ে উঠল। একটি—ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মুরশেদকে সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের রিডার খান সারওয়ার মুরশিদকে সম্পাদক করে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এতে যোগ দেন। দ্বিতীয়টি গঠিত হয় সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে—সংস্কৃতিসেবীদের অধিকাংশ ছিলেন তাতে। তৃতীয়টি হয় প্রেসক্লাবকে ঘিরে। শেষে অবশ্য তিনটি কমিটিই একযোগে কর্মসূচি স্থির করে।”
“এরই মধ্যে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন বিচারপতি মুরশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলে, রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের আয়োজনের পেছনে আছে ঢাকার ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশন, তারাই জোগাতে যাচ্ছে অর্থের। এমন একটি উদ্যোগের সঙ্গে কি বিচারপতির জড়িত থাকা সংগত হবে? বিচারপতি মুরশিদ জানান, কমিটির তহবিলে যাতে এ-ধরনের অর্থ সংগৃহীত না হয়, তিনি তা নিশ্চিত করবেন। কমিটির সদস্যদের চাঁদা তুলতে নিষেধ করে দিলেন তিনি, বললেন, প্রয়োজনীয় অর্থ নিজেই সংগ্রহ করে দেবেন। আমরা অবাক, বিচারপতি আবার কার কাছে টাকা চাইবেন? পরে জেনেছিলাম, পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল এ কে এম হাফিজউদ্দীনকে তিনি সেই অনুরোধ জানান, হাফিজউদ্দীনও কাজটি করে দিয়েছিলেন।”
আনিসুজ্জামান আরও জানান, শুনেছি, তখন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চিফ সেক্রেটারি নাকি রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের আয়োজন সম্পর্কে সুফিয়া কামালের কাছে জানতে চান, ‘এসব কী হচ্ছে?’ সুফিয়া কামাল জবাবে বলেছিলেন, ‘সারা পৃথিবীতে যা হচ্ছে, তাই।’
এসব ঘটনার বহু বছর পর, স্বাধীন বাংলাদেশে ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলাকালে শক্তিশালী দুটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। মোট ১০ জন প্রাণ হারান এবং বহু শিল্পী ও সাধারণ শ্রোতা আহত হন। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) তৎকালীন প্রধান মুফতি হান্নানসহ বেশ কয়েকজন জঙ্গির বিরুদ্ধে এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং আদালতে তাঁদের সাজা দেওয়া হয়।
টীকা: এই নিবন্ধে বদরুদ্দিন উমর এবং আনিসুজ্জামানের যেসকল উদ্ধৃতি ও রচনার অংশবিশেষ উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে বানানরীতি প্রমিতিকরণের উদ্দেশ্যে পরিবর্তন না করে হুবহু তাঁদের প্রকাশিত রূপেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
মাতিয়া বানু শুকু: যে আলো ছড়ায় নিভৃতে
শিল্পে উৎসর্গিত জীবন ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।
রাজীব আশরাফ এবং একটি অসমাপ্ত আখ্যান
ভয়ে ভয়ে একদিন অর্ণবকে বলেছিলেন, “আমিও লেখি।”


মন্তব্য করুন