📷 লেখক
“ক’জনের সৌভাগ্য এমন/দুনিয়া দিয়েছে একজন/মায়েরই মতো বড় বোন।” তাঁর কোনো এক জন্মদিনে লিখেছিলাম এমনটা। যিনি আছেন বলেই ‘আপা’ আর ‘আম্মা’ মিলে একত্রিত হয়ে ‘আপাম্মা’ নামের একটা শব্দ জন্ম নিয়েছে আমার দুনিয়ায়। তাঁর মতো দৃঢ়চেতা পরিশ্রমী মানুষ, আমি অন্তত এই জীবনে আর দেখি নাই। তিনি মাতিয়া বানু শুকু। বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির বিস্তৃত গগনে উজ্জ্বল, অথচ নির্মোহ এক অতলস্পর্শী নক্ষত্র। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রযোজক, সুপরিচিত নাট্যকার, বা নন্দিত নির্মাতা শুধু নন; সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র ও নাট্যচর্চার একটি অপরিহার্য মুখ। যার প্রতিটি পদক্ষেপ গভীর জীবনদর্শন ও শিল্পতাত্ত্বিক দায়বদ্ধতায় মাপা।
প্রচারের চাকচিক্য এড়িয়ে প্রায় দুই দশক ধরে ঘটিয়ে চলেছেন এক নিভৃত বিপ্লব। তাঁর বিশ্বাস, শিল্প সৃষ্টি হওয়া উচিত মনের ক্ষুধায়, কেবল বিক্রির জন্য নয়। বছর পাঁচেক আগের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার কাজ আর জীবন আলাদা কিছু না, দুটো একই জিনিস। একটা আরেকটার সাথে মিশে গিয়েছে।” কাজের কোনো আইডিয়া যখন মাথায় আসে, তখন তা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি গভীরভাবে নিমগ্ন থাকেন এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে স্রেফ ধ্যানের মতো মনে করেন। যার ভাষ্য, “আমি নিজের মনের ক্ষুধা মেটানোর জন্য কাজ করি।” সেই মনেরও রয়েছে একটি নিজস্ব দর্শন। শুকুর বয়ানে, “আমি আমার কাজ দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক ও মননকে স্পর্শ করতে চাই।” অর্থাৎ তিনি এমন একজন, যিনি সবসময় সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিয়েই ভাবছেন।
অনন্য এই মানবাত্মার জন্মদিন ছিল গত পরশু, মানে ৫ সেপ্টেম্বর। এবার তাঁর এই বিশেষ দিনটি কেটেছে জীবনের কঠিনতম সংগ্রামের মধ্যে, দেশ থেকে দূরে, ভারতের চেন্নাইতে। সেখানকার ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে কর্কট রোগের সাথে লড়াই করছেন ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিনের এই জ্যেষ্ঠ কন্যা। সার্বক্ষণিক সাথে আছেন তাঁর সহযোদ্ধা ও জীবনসঙ্গী নূরুল আলম আতিক। তিনিও একাধিকবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রকার। যারা এই তল্লাটের ন্যূনতম খোঁজ রাখেন, তারা প্রত্যেকেই জানেন, বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চিত্রভাষার এক শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে শুকু-আতিকের এই যৌথতা।
তাঁদের যৌথ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘পাণ্ডুলিপি কারখানা’ কেবল গতানুগতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেনি, বরং গল্পের বুনন ও শৈল্পিক উপস্থাপনায় এক নতুন ব্যাকরণ তৈরি করেছে। আতিকের প্রতিটি নিরীক্ষাধর্মী কাজে শুকুর সমর্থন যেমন অবিচল ছিল, তেমনি শুকুর কাজেও আতিকের সৃজনশীল প্রেরণা ছিল নিরন্তর। একে অপরের পরিপূরক হিসেবে তাঁরা বাংলাদেশের সুস্থ ধারার শিল্পচর্চাকে এগিয়ে নিয়েছেন। আতিকের জবানিতে শুকুর কাজের প্রতি নিষ্ঠা কেবল একজন নির্মাতার নয়, বরং একজন আজীবন শিল্প-সাধকের।
সৃজনশীলতার সেই সুন্দর তপোবনে আজ এক বিষণ্ণতার ছায়া। কারিগরদের জীবনের এমন অনেক ট্র্যাজেডি অনেক সময় পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। কী এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখি আমরা! যখন তাঁদের চলচ্চিত্র ‘মানুষের বাগান’ ২০২৬ সালের মে মাসে নয়াদিল্লিতে আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করছে, ঠিক তখন চেন্নাইতে থাকা এই নির্মাতা দম্পতিকে চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এটিই আমাদের বাস্তবতা। তবে এখানে ট্র্যাজেডিটি আরও প্রকট। কারণ যে মানুষটির বাবা একটি দেশের মানুষের আত্মপরিচয় ও ভাষার লড়াইয়ের অন্যতম সংগঠক, সেই পরিবারের উত্তরসূরি আজ নিজের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঘোষণা করলেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা,” তখন নিস্তব্ধ হলরুমে প্রথম বজ্রধ্বনি তুলেছিলেন আব্দুল মতিন। তিনি সাধারণ ছাত্রদের ভিড় থেকে চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন— ‘নো, নো’। এই প্রতিবাদ জিন্নাহকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তবে এর জন্য মতিনকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। তৎকালীন সরকার তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করে। তবে তাঁর সেদিনের সেই ‘না’ কেবল একটি শব্দ ছিল না, বরং তা ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার শপথ, যা পরবর্তী মুক্তির আন্দোলনের সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছিল।
ভাষা মতিনের সেই সাহসিকতা আর শুকুর বর্তমান জীবনসংগ্রাম আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ভাষা আন্দোলন কেবল রাজপথের লড়াই ছিল না; ছিল আত্মপরিচয় ও সৃজনশীলতার অধিকার রক্ষার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের উত্তরাধিকার আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন আমাদের সংস্কৃতিকর্মীরা—কখনও নতুন গল্পের বয়ানে, আবার কখনও হাসপাতালের বিছানায় নিঃশব্দ যন্ত্রণায়। মতিনকন্যা শুকু সব সময় বাবার কাছ থেকে পাওয়া দেশপ্রেম ও নাগরিক দায়িত্ববোধের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, যা তাঁকে একজন সচেতন নির্মাতা হিসেবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
বাবার আদর্শ তাঁর জীবন ও চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। বাবার আপসহীন ব্যক্তিত্ব এবং দেশপ্রেম তাঁর শৈশবেই এক গভীর চারিত্রিক দৃঢ়তা তৈরি করে দিয়েছিল। বাবার একটি অমোঘ মন্ত্র তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, “তুমি ভাষাসৈনিকের সন্তান, তোমার দায়বদ্ধতা বেশি।” এই চেতনা থেকেই তিনি একজন নাগরিক হিসেবে শিল্পকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন। শুকু নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর বাবা অত্যন্ত রসিয়ে রসিয়ে অনেকটা ‘সিনেমাটিক’ ভঙ্গিতে গল্প বলতেন। সেই বলার ধরন দেখেই ছোটবেলা থেকে শুকুর মনে নিজস্ব দৃশ্যকল্প তৈরির এবং গল্প লেখার অভ্যাস গড়ে উঠেছিল।
চারুকলার ছাত্রী শুকু একসময় জানতে পারেন, তাঁর বাবা চমৎকার ছবিও আঁকতে পারতেন। বাবার একটি স্কেচ খাতা পেয়ে তিনি যারপরনাই আনন্দিত হয়েছিলেন। চারুকলা থেকে পাস করার পর শুকু একসময় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (টেক্সটবুক বোর্ড) বইয়ের জন্য ইলাস্ট্রেশন বা ছবি আঁকার কাজও করেছেন। পরবর্তীতে নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে সক্রিয় হওয়ার পর তিনি আবার নিজেকে ‘নারী নির্মাতা’ হিসেবে আলাদা কোনো বিশেষ ক্যাটাগরিতে বা বাড়তি সুযোগের বেড়াজালে দেখতে চাননি কখনো।
পুরুষ নির্মাতাদের মতোই সমান প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে কাজ করাটাই তাঁর কাছে স্বাভাবিক। কোনো এক উপস্থাপক বা সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছিলেন, নিজেকে তিনি তাত্ত্বিক অর্থে “নারীবাদী” মনে করেন না। তবে একজন নারী হিসেবে মেয়েদের মনস্তত্ত্ব ও তাঁদের গল্প ফুটিয়ে তুলতে তিনি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। “মেয়েদের গল্প লিখতে আমার আরাম লাগে, সহজ লাগে,” বলেছিলেন তিনি।
ব্যক্তিগতভাবে আমি পাণ্ডুলিপি কারখানায় যুক্ত হয়েছিলাম ২০১৫ সালে, মূলত ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’র চিত্রনাট্য উন্নয়নের কাজে—যে চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন মাতিয়া বানু শুকু। তখন থেকেই শুনে আসছি, তিনি প্রায়ই বলতেন, চলচ্চিত্রের নিজস্ব একটি আন্তর্জাতিক ভাষা রয়েছে, যার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো মুখের ভাষার প্রয়োজন হয় না। সিনেমার দৃশ্যপট ও উপস্থাপনা যদি শক্তিশালী হয়, তবে সংলাপ ছাড়াই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষ সাবটাইটেল ছাড়াই তা সহজে বুঝতে ও তার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে।
পরবর্তীতে টিভি নাটকে চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাঁর প্রখর দৃশ্য ভাবনার বিষয়টি সরাসরি টের পাই। খুব সীমিত আয়োজন কিংবা রসদ দিয়েও ক্যামেরার সামনে এক সুবিশাল ক্যানভাস ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ এক ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। চারুকলায় পড়াশোনা করার কারণেই বোধহয় রঙের নান্দনিক ব্যবহার ফুটিয়ে তুলে নাটকের দৃশ্যভাষাকে তিনি সংবেদনশীল ও অর্থবহ করে তুলতে পারেন। এছাড়া মানুষের সঙ্গে খুব সহজে মিশে যাওয়ার যে স্বাভাবিক গুণ তাঁর মধ্যে আছে। তাই গল্পগুলোতে প্রান্তিক ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারাকে এক সুতোয় বাঁধার চমৎকার প্রয়াস দেখা যায়—যার সাথে জড়িয়ে থাকে তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধ।
একজন শিল্পী যখন তাঁর সমস্ত মেধা ও জীবন দেশের শিল্প-সংস্কৃতি তথা সমাজকে উজাড় করে দেন, তখন বার্ধক্যে বা অসুস্থতায় কেন তাঁকে অসহায় বোধ করতে হয়? শিল্পীদের জন্য একটি স্থায়ী এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কি আমাদের রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব নয়? থেমে থেমে বারবার ভাবনায় আসছে এই প্রশ্ন দুটি। মাতিয়া বানু শুকু এখন ক্যানসারের জটিল ধাপে রয়েছেন, যার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী।
নির্দিষ্ট আর্থিক নিরাপত্তা বা রাষ্ট্রীয় বীমা না থাকায় তাঁর পরিবার আজ চরম চাপের সম্মুখীন। ব্যক্তিগত স্তরে বন্ধুরা পাশে দাঁড়ালেও এই লড়াকু নির্মাতার দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এখন সময়ের দাবি। কারণ লড়াই কেবল এক মাতিয়া বানু শুকুর নয়, বরং আমাদের জাতীয় মেধার সুরক্ষার। আর এই সহায়তা কোনো অনুকম্পা নয়, যেন এক সৃজনশীল আত্মার প্রাপ্য সম্মান হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুকু আমাদের শিখিয়েছেন শিল্পের প্রতি নিরঙ্কুশ সততা কী এবং কেন তা প্রচারের চেয়েও বড়। ভাষাসৈনিকের সন্তান হিসেবে তিনি যে দায়বদ্ধতার উত্তরাধিকার বহন করছেন, তা তাঁর কাজের প্রতিটি ফ্রেমেই উজ্জ্বল। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি সেই দিনের, যখন মাতিয়া বানু শুকু ক্যানসারকে জয় করে সুস্থ হয়ে তাঁর চিরচেনা ‘মানুষের বাগান’-এ ফিরবেন। তাঁর এই সংগ্রাম জয়ী হোক, তিনি ফিরে আসুন তাঁর প্রিয় ক্যামেরার পেছনে—এটাই আমাদের একান্ত প্রার্থনা।
📷 লেখক
পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত বাংলাদেশ
কী লেখা ছিল আত্মসমর্পণ দলিলে?
বিজয়ের প্রাক্কালে জাতির মস্তিষ্কে আঘাত
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ।
চূড়ান্ত লড়াইয়ের মুখে ঢাকা
১৫ মাইলের মধ্যে মিত্রবাহিনী।
বেসামাল ইয়াহিয়া, দিশেহারা মালিক
ভোরেন্টসভকে হুঁশিয়ার করেন কিসিঞ্জার।
চূড়ান্ত বিজয়ের অদূরে মিত্রবাহিনী
বঙ্গোপসাগরের পথে মার্কিন নৌবহর।
যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া ইয়াহিয়া
আন্তর্জাতিক চাপ বনাম মুক্তির অগ্রযাত্রা।
‘মানুষের বাগান’ ইতিমধ্যে বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। চলচ্চিত্রটি মর্যাদাপূর্ণ দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এবং উত্তর আমেরিকার ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড অর্জনের মাধ্যমে এর শৈল্পিক ও কারিগরি শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্রটি এবার কলকাতার মঞ্চে নিজের মহিমা ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে নন্দনে ‘পঞ্চম ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এ এটি প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে।







মন্তব্য করুন