ভুলতা এলাকায় ইত্তেহাদুল ওলামার নেতাদের সংবাদ সম্মেলন।
গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি হামলার দশম বার্ষিকীর দিনেই ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জে বাউল মতাদর্শের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে ‘ইত্তেহাদুল ওলামা’ নামের একটি সংগঠন। তাদের অভিযোগ—মাজারে শান্তিপূর্ণ দাওয়াতি কাজে গিয়ে তারা বাউল অনুসারীদের হামলার শিকার হয়েছেন এবং ওলামাদের এই কার্যক্রমকে ‘জঙ্গি কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অপপ্রচার করা হচ্ছে।
রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল বাজার এলাকার হযরত কলিমউদ্দিন শাহর (রহ.) মাজারে শনিবার (২৭ জুন) ওরসের বাউল গানের অনুষ্ঠানে বাধা দিতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়া যুবকদের ‘শান্তিপূর্ণ দাওয়াতি কার্যক্রম’ চালাতে যাওয়া ‘ওলামায়ে কেরাম’ দাবি করে ইত্তেহাদুল ওলামা জানিয়েছে, বাউল অনুসারী গোষ্ঠী অতর্কিত হামলা চালিয়েছে।
রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় বুধবার (১ জুলাই) বিকেলে ‘সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদী জনতা’-র ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন ডেকে এমনটা জানানো হয়েছে। ইত্তেহাদুল ওলামার নেতারা গানের মাধ্যমে লোকজ আধ্যাত্মিকতা চর্চাকারী বাউল সম্প্রদায় ও তাদের অনুসারীদের পথকে ‘ভ্রান্ত মতবাদ’ আখ্যা দিয়ে মাজারগুলোতে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন।
লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের রূপগঞ্জ উপজেলার সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হযরত মাওলানা মাহাবুবুর রহমান গাজীপুরী বলেন, “গোলাকান্দাইল হাটে হযরত কলিমউদ্দিন শাহ (রহ.)-এর ওরস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একদল ‘দায়ী’ (ধর্ম প্রচারক) শান্তিপূর্ণভাবে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে যান।”
“তারা সূরা নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াত—‘আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে’—এই নির্দেশনা অনুসরণ করেই সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কোনো কথা না শুনেই বাউল অনুসারী গোষ্ঠী তাদের ওপর বিনা কারণে অতর্কিতে হামলা চালায়, যাতে কয়েকজন আহত হন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে,” বলেন তিনি।
ইত্তেহাদুল ওলামার নেতারা মনে করেন, এই হামলাটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং উসকানিমূলক। এর উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা, শান্তিপূর্ণ ধর্ম প্রচার কাজে বাধা দেওয়া এবং ইসলাম প্রচারকে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ লাগিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করা। “আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দুষ্কৃতকারীদের সকল অপপ্রচার বন্ধ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে, অন্যথায় ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদী জনতা কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করবেন,” বলেন মাওলানা মাহাবুবুর।
এমন দিনেই ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের জঙ্গি হামলায় নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আদর্শিক বা অন্য কোনো কারণেই সন্ত্রাসবাদকে কখনো ন্যায্যতা দেওয়া যায় না। সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সর্বক্ষেত্রে মোকাবিলায় আমাদের সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
শামা ওবায়েদ বলেন, “দশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সেই রাতের ক্ষত এখনো আমাদের জাতীয় চেতনা থেকে মুছে যায়নি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার ছায়া আজও আমাদের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। এটি আমাদের জাতির ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়।”
তিনি বলেন, “আমাদের সহনাগরিক এবং ভারত, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আজ আমরা তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আমরা শুধু তাদের স্মৃতিকেই নয়, তাদের সাহস, দৃঢ়তা ও সংহতিকেও সম্মান জানাই।” ওই হামলায় ইতালির নয়জন নাগরিকসহ ২৪ জন নিহত হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।
বাংলাদেশে হাজার বছরের লালিত লোকজ ধর্মচর্চার ওপর উগ্রবাদী বা বৈশ্বিক ‘জঙ্গিবাদী’ মতাদর্শের হিংস্র থাবা বিস্তৃত হওয়ার নজিরও রয়েছে। ২০১৬ সালের মে মাসেই কুষ্টিয়ায় বাউল সাধক লালনের ভক্ত, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক মীর সানাউর রহমানকে কুপিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে আইএস।
একই সময়ে রাজশাহীর তানোর উপজেলার সুফি সাধক, মুদি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে হত্যা করা হয়। তার আগের মাসে, অর্থাৎ এপ্রিলে একই কায়দায় খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মুক্তমনা অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম। চলচ্চিত্র ও সংগীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। আরও আগে ২০১৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশ্য সড়কে খুন হয়েছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফিউল ইসলাম, যিনিও লালনভক্ত ছিলেন।
এর আগে ২০১৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় মধ্য বাড্ডার নিজ বাসায় সুফিবাদী পীর, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খিজির খানকে জবাই করে হত্যা করা হয়। একই মাসে আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি চলার সময় পুরানো ঢাকা হোসেনী দালান চত্বরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় একজন নিহত হন।
তার আগের মাসে চট্টগ্রাম নগরের আকবর টিলা এলাকায় ‘ল্যাংটা ফকিরের মাজারে’ রহমতউল্লাহ ওরফে ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেম আবদুল কাদেরকে জবাই করা হয়। আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৪ সালের আগস্টে ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই করে দুর্বৃত্তরা।
তার আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ইমাম মাহদির প্রধান সেনাপতি দাবিদার লুৎফর রহমান ফারুক, তাঁর বড় ছেলে ও চার অনুসারীকে গোপীবাগের বাসায় ঢুকে জবাই করে দুর্বৃত্তরা।
“আপনারা দেখেছেন যে অনুষ্ঠানে এই ঘটনা ঘটেছে সেখানে প্রকাশ্যে বাউল শিল্পীদের গান এবং বাদ্যযন্ত্রের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এ ধরনের আয়োজন শরিয়তসম্মত নয়,” উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা মাহাবুবুর আরও বলেন, “বাউল সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দকে এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।”
শরিয়তসম্মত পরিবেশ ও অডিটের দাবি
ইত্তেহাদুল ওলামার নেতারা কলিমউদ্দিন শাহ (রহ.) মাজারসহ রূপগঞ্জের সকল মাজারে প্রশাসন কর্তৃক হিসাব নিরীক্ষণ (অডিট) করার দাবি জানান। একই সাথে তারা বলেছেন, মাজারগুলোতে মাদক সেবন, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাসহ সকল প্রকার অনৈসলামিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।
তাদের ভাষ্য, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে যদি কোনো প্রকার অবৈধ, অনৈতিক বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকে, তবে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। মাজারগুলো যেন কেবল শরিয়তসম্মত উপায়ে চলে তা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানানো হয়।
উল্লেখিত মাজারের ২৭ জুনের হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত, এবং আহত কর্মীদের যথাযথ চিকিৎসা ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে এই সংবাদ সম্মেলনে। একই সঙ্গে বাউল সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দকে সব ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
ইত্তেহাদুল ওলামার রূপগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক মুফতি হাবিবুল্লাহ হাশেমী বলেন, “আগামী ৩ জুলাই রূপগঞ্জের সমস্ত মসজিদে সম্মানিত খতিব সাহেব মসজিদের জুমার আলোচনার মাধ্যমে বাউল সম্প্রদায় ধর্মবিশ্বাসীদের সমস্ত কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মুসলমানদের সতর্ক করবেন।” নামাজের পর বাউলবিরোধী লিফলেট বিতরণের কথাও জানান তিনি।
ইত্তেহাদুল নেতারা এসব পদক্ষেপকে তাদের “ঈমানি দায়িত্ব” হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা কোনো পাল্টা সহিংসতায় জড়াবেন না; বরং আইনি পথেই এই ঘটনার ন্যায়বিচার চান বলেও উল্লেখ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
হামলার ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, মারেফতি গানের আসরে কালেমাখচিত পতাকা উড়িয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে ঢুকে পড়ছেন কথিত ‘শান্তিপূর্ণ দাওয়াতি কার্যক্রম’ চালাতে যাওয়া ‘ওলামায়ে কেরাম’। গান বন্ধ করা নিয়ে মাজার ভক্তদের সাথে বচসায় জড়ান তারা। পরে মারধরের শিকার হন।
মারধরের শিকার হওয়া স্থানীয় ব্যবসায়ী কাউসার আহমেদ সজলও এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছিলেন, তারা ১০-১২ জন মিলে কলিমউদ্দিন শাহ মাজারের ওরসে গিয়েছিলেন মূলত ‘দাওয়াত’ দিতে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মাজার কর্তৃপক্ষকে গান-বাজনা এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার মতো ‘অনৈসলামিক’ কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো।
তার দাবি অনুযায়ী, মাজারের লোকজন তাদের কথা না শুনে উল্টো তাদের ওপর চড়াও হয় এবং হামলা করে। তিনি অভিযোগ করেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে এবং তার সঙ্গীদের ‘জঙ্গি’, ‘আতঙ্ক’ বা ‘ত্রাস সৃষ্টিকারী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তিনি একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা হিসেবে অভিহিত করেন।
তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের কিছু লোক এবং যাদের তিনি ‘মোদির সন্তান’ বলে সম্বোধন করেছেন, তারা এই ঘটনা নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে।
ঘটনার পর পুলিশের রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এইচ এম সালাউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেছেন, “শনিবার (২৭ জুন) মাজারে ওরস চলছিল। শেষ পর্যায়ে তবারক বিতরণের সময় নিজেদের ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয় দেওয়া কয়েকজন সেখানে বাধা দেয়। এ সময় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সামান্য হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তারা সেখান থেকে চলে যায়।”
তিনি বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়, তবে তার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।” এ ঘটনায় এখনও কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ওসি।
এই ঘটনায় হযরত কলিমউদ্দিন শাহর (রহ.) মাজার প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সাধারণ মাজার ও বাউল ভক্তদের সেদিনের হামলার ঘটনাকে ‘তৌহিদী জনতার উচিত শিক্ষা’ হিসেবে প্রচার করতে দেখা গেছে।
বাউলদের একটি সংগঠনের নেতা আবুল সরকার কারাবন্দী থাকাকালে তাঁর স্ত্রী আলেয়া বেগম কারণ হিসেবে মূলত আদর্শগত সংঘাত, মাজার সংস্কৃতির সুরক্ষা এবং উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক কৌশলকে দায়ী করেছিলেন। আলেয়া বেগমের মতে, বাউলরা ওলি-আউলিয়া এবং মাজারের প্রচারক। অন্যদিকে একটি গোষ্ঠী মাজার ভেঙে ফেলার পক্ষে। এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে তারা বাউলদের ‘প্রতিপক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বী এবং শত্রু’ হিসেবে গণ্য করছে।
তিনি বলেছিলেন, যারা মাজার ভাঙছে তারা মূলত মানুষের ভক্তির জায়গায় আঘাত করছে। উগ্রপন্থীরা বাউলদের ভিন্নমতাবলম্বী মনে করে এবং তারা চায় দেশে ইসলামের কেবল একটিই ভাষ্য থাকুক, যা বাউল দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক।
২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর দিবাগত রাতে মাদারীপুরের একটি গানের আসর থেকে মানিকগঞ্জ জেলা ডিবি পুলিশ বাউলদের নেতা আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ‘ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তিমূলক মন্তব্য’ করার অভিযোগে ঘিওর থানায় দণ্ডবিধির ১৫৩, ২৯৫-এ এবং ২৯৮ ধারায় মামলা করা হয়।
একই বছরের ৪ নভেম্বর রাতে মানিকগঞ্জের ঘিওরে একটি মেলায় ‘জীব ও পরম’ নামক আধ্যাত্মিক পালাগান পরিবেশন করার সময় তিনি ‘জীব’ (মানুষ) এবং তাঁর সহশিল্পী ‘পরম’ (স্রষ্টা) সেজেছিলেন। পালাগানের এক পর্যায়ে স্রষ্টার বিশালত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি “আল্লাহর গোয়া (পশ্চাৎদেশ) ও মাথা খুঁজে পাচ্ছেন না।”
তাঁর ভক্তদের মতে, এটি ছিল স্রষ্টার সামনে মানুষের চিন্তার ক্ষুদ্রতা প্রকাশের একটি দার্শনিক ভঙ্গি, কিন্তু এর খণ্ডিত অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং প্রায় ছয় মাস পর তিনি জামিনে মুক্ত হন।
তার আগে আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে তাঁর ভক্তরা মানববন্ধন করতে গেলে ‘আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে সমবেত মুসল্লিদের হামলায় বাউল নেতার বেশ কয়েকজন অনুরাগী আহত হন। আলেয়া তখন হামলাকারীদের মানসিকতাকে ‘হিংস্রতায় ভরা’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর মতে, যাদের মনে সৌহার্দ্যবোধ বা মানবতা নেই, তারাই এ ধরনের পীড়ন চালাচ্ছে।
মানিকগঞ্জে আবুল সরকারের ফাঁসির দাবিতে হওয়া মিছিলে বিক্ষোভকারীরা বাউলদের জবাই করে হত্যা এবং তাঁদের সকল আখড়া ধ্বংস করার হুমকি প্রদান করে। বিক্ষোভকারীরা তখন অভিযোগ করেছিলেন, আবুল সরকার নিজেকে পীর পরিচয় দিয়ে কোরআনের আয়াত ভুলভাবে উচ্চারণ ও ব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন এবং আল্লাহর শানে বেয়াদবি করছেন।
সেখানকার ওলামায়ে কেরামও বলেছিলেন, বাউলদের গান ও বাদ্যযন্ত্রের অনুষ্ঠান শরিয়তসম্মত নয়। তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন, বাউলরা শরিয়তের বিধানকে গৌণ মনে করে এবং নাচ-গান ও মাদককে আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।
প্রসঙ্গত, বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে দুটি ধারা সমান্তরালভাবে প্রবহমান—একটি হচ্ছে প্রথাগত ওলামায়ে কেরাম নির্দেশিত আক্ষরিক বিধিবিধান বা শরিয়তভিত্তিক ইসলাম, এবং অন্যটি হলো লৌকিক মরমী ব্যঞ্জনা বা বাউল দর্শন।
ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে বাউল মতবাদটি মূলত একটি ‘সমন্বয়বাদী’ ধারা, যা সুফিবাদ, বৈষ্ণব তত্ত্ব, সহজিয়া ও লোকজ দর্শনের মিশ্রণে গঠিত। অন্যদিকে, শরিয়তপন্থী ধারাটি নিজেকে ওহি-নির্ভর জ্ঞান এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট সুন্নাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত মনে করে।
বর্তমানে এই দুই ধারার মধ্যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোবদ্ধ সংঘাত দৃশ্যমান। বাউলরা যেখানে তাদের সাধনাকে স্রষ্টা-প্রেমের এক বিমূর্ত পথ হিসেবে দেখে, ওলামায়ে কেরাম সেখানে এই দর্শনকে ইসলামের মৌলিক আকিদার পরিপন্থী এবং মাজারকেন্দ্রিক অনৈসলামিক চর্চার মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন।
এই বিরোধ কেবল তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং রূপগঞ্জ বা মানিকগঞ্জের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোর মতো সামাজিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। সুফি গবেষণাধার্মী প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’ (সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ) চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) ওপর করা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ সময়ে দেশে অন্তত ছয়টি মাজারে হামলার ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে। মাত্র দুটিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এর আগের একটি প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটে। যার বিপরীতে মামলা হয়েছিল মাত্র ১১টি।
মাজার সংস্কৃতির মূলে কোপ: নিজ দরবারে দাফন মিলছে না সাধকের
হত্যাকে যখন ‘কথিত’ শব্দে জায়েজ করে সংবাদমাধ্যম।
ঈদের আলোয় বাউলের ঘরে কেন বিষাদের সুর?
বিনাবিচারে বন্দী মহারাজ, অন্তহীন অপেক্ষায় আলেয়া।
ধর্মীয় উগ্রতা বনাম লোক-আধ্যাত্মিকতা
ইসলামী সভ্যতা হাজার বছর ধরে এই দ্বন্দ্ব দেখে আসছে।
ফিতনার রাজনীতি: একটি পাঠ-অনুসন্ধান
আল্লাহ ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্তদেরকে ভালবাসেন না।
সুফি গান: যা বলেছিলেন ফারুকী
আসর নিষিদ্ধ জেনে বিষ্মিত হয়েছিলেন উপদেষ্টা।
হুমকিতে হাজার বছরের আধ্যাত্মিকতাচর্চা, রেহাই পায়নি মাজারের গাছও
শাহ আলী মাজারে সংবাদ সম্মেলন শনিবার।


মন্তব্য করুন