📷 ওয়ানম্যান নিউজরুম
১৮ জুলাই, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর। মেট্রোরেলের নিচে ফুটওভার ব্রিজে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। এই আগুনের শিখা আর ছাত্র-জনতার আক্রোশের মাঝে সেদিন শুধুমাত্র সাংবাদিক পরিচয়ের কারণে আরেকটু হলেই গণপিটুনিতে প্রাণ হারাতাম। আসলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে সরকার লাশ ফেলতে শুরু করার পরও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলকে তোষণকারী সাংবাদিকতা থেমে ছিল না। যে কারণে তখন সাংবাদিকদের ওপর সবাই—সব আন্দোলনকারী—রেগে ছিলেন। সেই আক্রোশই আমার ওপর আছড়ে পড়তে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই আদনান সাকিব—যে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হলেও আমার সাথে পরিচয় ছিল ‘ব্যান্ড মিউজিক’ করার সুবাদে—সে আমাকে দেখে এগিয়ে এলো। তার একটি ‘ভাইয়া’ ডাক তখন উত্তেজিত জনতাকে কিছুটা প্রশমিত করেছিল। এরপর সাকিবের হাতেই আমার মোবাইল ওরফে ক্যামেরাটি ধরিয়ে দিয়ে অন-রেকর্ড বলতে শুরু করলাম সেখানে আমি কী দেখেছি; আর তা শুনে সবাই থেমে গিয়েছিল। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত আবার সাংবাদিকতাই আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। এ মুহূর্তের কথা যতবার মনে পড়ে বা লিখি, সাকিবের প্রতি মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে।
এর মাত্র একদিন পরই অবশ্য আবারও আক্রান্ত হয়েছিলাম; তখন বাঁচিয়েছিলেন আরেক সহযোদ্ধা মুক্তাদির রশিদ রোমিও। আবার কামরান রেজা চৌধুরীর কারণেও বহুবার বেঁচে গেছি।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয় জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে রক্তপাতের শুরু, তা এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ রূপ নেয় ১৮ জুলাই। শিক্ষার্থীদের ডাকা দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির দিনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসেন। ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডাসহ দেশজুড়ে শুরু হয় নজিরবিহীন সংঘাত। বিটিভি ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং পুরো পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ জুলাই থেকে মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন শাসকদল আন্দোলন দমনে “অপ্রত্যাশিত ও মারাত্মক মারণাস্ত্রের বলপ্রয়োগ” শুরু করে।
পেশাগত দিক থেকে সেই দিনটি ছিল চরম সংকট ও চ্যালেঞ্জের। সংঘাতের তীব্রতার সমান্তরালে সরকার দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি করে দেশকে বহির্বিশ্ব থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কঠোর সেন্সরশিপের সেই অবরুদ্ধ সময়ে আমার তৎকালীন কর্মস্থল, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘বেনারনিউজ’-এ মাঠের ফুটেজ ও ব্রেকিং নিউজ পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এর দুই থেকে তিন দিন পর, যখন জানতে পারলাম ‘এএফপি’-র ঢাকা অফিস বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে, তখন সেখান থেকে ফুটেজগুলো পাঠাতে সমর্থ হই। কিন্তু ততক্ষণে বাংলাদেশে আরও অনেক রক্ত ঝরে গেছে, লাশের মিছিল দীর্ঘতর হয়েছে এবং আন্দোলনের গতিপথ চিরতরে বদলে গেছে।
তখন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং গণমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ থাকায় সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নথিভুক্ত করা কঠিন ছিল। পরবর্তীতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্রের ক্রসম্যাচিং থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, ১৮ জুলাই এক দিনেই ৪১ থেকে ৫০ জনের মতো মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এটিই ছিল এই আন্দোলনের প্রথম বড় গণ-হত্যাকাণ্ড, যা পরবর্তী সময়ে ১৯ জুলাইয়ের আরও বড় বিপর্যয় (যেদিন ১৪৮ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন) এবং সামগ্রিক সরকার পতনের আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।


মন্তব্য করুন