Rajib Ashraf

ছবি: লেখক

শরীফ খিয়াম আহমেদ

রাজীব আশরাফ। এটা মূলত তাঁর ‘পেন নেইম’। লেখালেখি শুরুর পরপরই নিজের দাপ্তরিক ও ডাকনামের সমন্বয়ে নিজেই নামটি রেখেছিলেন। এছাড়া নিজের ‘র‌্যাপার নেইম’ দিয়েছিলেন ‘জিপসি অ্যাশ’। সরকারি নথিতে তাঁর আসল নাম ‘এ.এস.এম. আশরাফুল আনোয়ার’— আর পারিবারিক ডাকনাম রাজীব। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় আশরাফুল আলম রাজীব নামেই তাঁর লেখা ছড়া প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়েছিল লুৎফুর রহমান রিটন সম্পাদিত ছোটদের কাগজে।

রাজীবের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পাদক রিটন এবং পত্রিকাটির সহ-সম্পাদক খালিদুর রহমান জুয়েল তাঁর ছড়াকার সত্তা বিকশিত হওয়ার ভিতটা গড়ে দিয়েছিলেন। তবে রাজীবের লেখালেখিটা শুরু হয়েছিল মূলত তাঁর প্রয়াত পিতা এম.এ. বাশার মিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে গিয়ে। পেশায় সেনাবাহিনীর জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার হলেও তিনি লুকিয়ে কবিতা লিখতেন। যা কখনো কোথাও প্রকাশিত হয়নি। তবে রাজীব বাবার লেখাগুলো চুরি কের পড়তেন। তাঁর এই পড়ুয়া স্বভাবটিও বাবার কাছ থেকে পাওয়া। তাঁর বদৌলতেই শৈশবে হাতের কাছে সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশের ক্লাসিক সব উপন্যাসসহ বাংলা সাহিত্যর বিশাল এক ভাণ্ডার পেয়েছিলেন রাজীব। আর গৃহিনী মা দেলোয়ারা বাশার ছিলেন রাজীবের নিরাপদতম আশ্রয়। আমৃত্যু রাজীবের সব কাজে পাশে ছিলেন তিনি। শৈশব-কৈশোরে তিনি কখনো কোনো ইচ্ছেপূরণে বাঁধার কারণ হননি বলে এক সাক্ষাতকারে উল্লেখ করেছিলেন রাজীব। তিনি ছিলেন বাশার দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থতম।

শৈশবে লেখালেখিতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য রাজীব তাঁর খালাতো ভাই মাসুদুল গনি মাসুদকে স্মরণ করতেন। পরবর্তী ব্যাংক কর্মকর্তা হওয়া সেই মাসুদ ভাই তাঁর সদ্য প্রাথমিক পেরুনো ভাইটির লেখায় মুগ্ধ হয়ে প্রতি বছরের শুরুতে তাঁকে একটি ডায়েরি গিফট করতেন।লিখে লিখে কত দ্রুত ওই ডায়েরির পাতা শেষ করা যায়, সেটাই ছিল রাজীবের তখনকার স্বপ্রণোদিত তাগাদা। নিজের জীবনবোধের বিবর্তনের জন্য রাজীব আরো এক দম্পতির প্রতি খুব কৃতজ্ঞ ছিলেন। তারা হচ্ছেন বর্তমানে শিল্পী ও নির্মাতা আরাফাত মহসীন নিধির বাবা-মা সামসুজ্জামান আকন্দ সাজন ও মাহমুদা বেগম আপন। উত্তরসূরী নামের একটি শিশু সংগঠনের সদস্য হিসেবে তাদের সঙ্গ পেয়েছিলেন রাজীব।

জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর জন্ম তারিখ ১৯৮৪ সালের ১১ জুন উল্লেখ থাকলেও রাজীব মূলত জন্মেছিলেন ১৯৮২ সালের ১৭ ডিসেম্বর। তাঁর জন্ম ঢাকার মিরপুরে বিহারি অধুষ্যিত একটি এলাকায়। শৈশব ও কৈশোরের কিছুকাল তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকাতেও কাটিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে মিরপুরের জান্নাত একাডেমি স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ২০০১ সালে বিএন কলেজ উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করা রাজীবের সাথে আমার পরিচয় ২০০২ সালে; সূত্রটা ছিল বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, তাঁর জীবনের এই অধ্যায়টি অনেকটাই কম আলোচিত। কবে ও কার মাধ্যমে তিনি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলেন, সেটা তাঁর কোনো লেখা বা সাক্ষাতকারে পেলাম না।

পরে সংগঠনের তখনকার একাধিক নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ করেছি। তারাও এ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট কিছু জানাতে পারেননি। তবে তাদের অনেকের লেখায় রাজীবের সেসময়কার কর্মকাণ্ডের একটা ঝলক পাওয়া যায়। যেমন ডা. আহম্মদ সাজেদুর হক রুবেল জানিয়েছেন, এক সময়ে মিরপুরসহ পুরো ঢাকা মহানগর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেওয়াল রাঙানো থাকতো তাঁর দেওয়াল লিখনে। বিবিয়ানা লং মার্চ, হরতাল বা মিছিলের রাজীব; শামসুন্নাহার হলে ছাত্রী নিপীড়নের প্রতিবাদে হওয়া ঐতিহাসিক সফল আন্দোলনের কর্মী। যে আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ও প্রক্টর পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। এ বিষয়ক সর্বশেষ আপডেটটি আমি পেয়েছিলাম রাজীব মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ পর, ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে। জানলাম, রাজীবের আগে তাঁর বড় বোন আয়েশা বেগম পলক ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। তেজগাঁও কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। আবার রাজীবের অগ্রজ আশরাফুল আলম বাবুও সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।

রাজনীতি জড়ানোর আগে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রেও আসা-যাওয়া ছিল রাজীবের। সেখানেই এক আড্ডায় তিনি ‘স্যাটায়ার’ লেখার পরামর্শ পান। এরপর সেই আড্ডার সঙ্গী সৌরভ সাখাওয়াতের সূত্রেই দৈনিক প্রথম আলোর রম্য প্রকাশনা আলপিনে লেখালেখির সুযোগ তৈরী হয় তাঁর। একটি সম্পাদক সুমন্ত আসলাম ডেকে পাঠালেন। উচ্চ মাধ্যমিকের দুটো বছর ধুমিয়ে লিখেছেন আলপিনে। এ সময়ই তিনি টের পান, লেখা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটা অসঙ্গতি দূর করার বা সচেতেনতা সৃষ্টির হাতিয়ারও হতে পারে। ওই সময় তাঁর প্রথমবারের মতো মনে হয়, একজন লেখকের অবশ্যই রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা উচিত।

রাজীবের পরবর্তী আরো কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড খুব সুনির্দিষ্টভাবে পাওয়ায় যায় তাঁর আরেক বন্ধু জুয়েল কলিন্দের লেখায়। তিনি জানিয়েছেন, ২০০৩ এর মাঝামাঝি বা শেষের দিকে রাজীব ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে দিয়ে মিরপুরেই বাউণ্ডুলে নামের একটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলেন । এই সংগঠন নিয়মিত দ্রোহমন্ত্র নামে একটি দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করতো। পরে বাউণ্ডুলের নাম হয়ে যায় পথিকৃৎ। পরে বাচ্চাদের জন্য ‘কল্পলোক’ নামের একটি থিয়েটারও গড়ে তুলেছিলেন রাজীবরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট, বর্তমানে যেটি অনুষদ; এখানকার ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন রাজীব। ভাষ্কর্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০০২ সালে এখানে ভর্তি জন্য কোচিং করতে এসে প্রবর রিপনসহ আরো অনেক কবিবন্ধু হয় তাঁর। পরবর্তীতে যারা তাঁর লেখালেখি, লিটলম্যাগ প্রকাশসহ নানা কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করতেন রাজীব। এরই ধারাবাহিকতায় রাজীব গীতিকার হিসেবে তুমুল পরিচিত পেলেও তিনি মূলত নিজেকে একজন লেখক এবং ‘ঢাকা-বেইজড ফিল্মমেকার’ পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করতেন।

চারুকলায় পড়ার সময়ই ২০০৪ সালে তিনি বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সটি সম্পন্ন করেন। কোর্সটি করতে করতেই নির্মাণ করেন নিজের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘জলচর’। ক্লাসেই প্রথম প্রদর্শিত হয়েছিল সেটি। তখন তারেক মাসুদ তাঁর এই কাজটির প্রশংসা করলে তিনি বেশ উৎসাহ পেয়েছিলেন। বলা যায় এটাই তাঁর চলচ্চিত্রকার জীবনের শুরু। তখন থেকেই তিনি ফিল্ম সোসাইটি ও ফিল্ম ফোরাম আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। চলচ্চিত্র নির্মানের ব্যবহারিক দিকগুলো শেখার জন্য প্রখন মনযোগ দিতে পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৫ সালে তিনি চারুকলায় পড়া বাদ দেন।

২০০৬ সালে তিনি গাঁও প্রোডকশনে যোগদান করেন। যে প্রতিষ্ঠানকে তিনি নিজের একটি ফিল্মস্কুল এবং প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সামির আহমেদকে নিজের গুরু ও মেন্টর বলে মনে করতেন। আর ফাহিম ফেরদৌস, ফুয়াদ নাসেরসহ সেখানকার সহকর্মীরা আমৃত্য তাঁর আত্মারই অংশ ছিলেন।

২০০৮ সাল থেকে রাজীব দেশসেরা নির্মাতাদের প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সামির আহমেদ ছাড়াও অমিতাভ রেজা, পিপলু আর খান, তানভীর হাসান, অনিমেষ আইচ, নুরুল আলম আতিক ও টোকন ঠাকুরসহ আরো অনেকের সাথে কাজ করেছেন তিনি।

সহকারি পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন শতাধিক বিজ্ঞাপনে কাজ করা রাজীব ২০১২ থেকে ২০১৪ এশিয়াটিক জেডব্লিউটি-তে সিনিয়র কপি রাইটার হিসেবে কাজ করেছেন। এই সময়, তিনি সেভেন আপের একটি বিজ্ঞাপনের জন্য তাঁর লেখা জিঙ্গেলকে পুরস্কৃত করেছিল ব্র্যান্ড ফোরাম।

দেশ টিভির জন্য ‘শূণ্য স্বর’ নামের একটি টিভি ফিকশন তৈরী করেছিল রাজীব। ‘ওয়ারিদ ইনস্ট্যান্ট ক্যাশ’ সিরিজের তিনটি, বাংলালিংক নবাবি কল রেট, এপি এগ নুডলস (টিভি কমার্শিয়াল), এয়ারটেল উইন ব্যাক, এয়ারটেল ট্রান্সপারেন্ট সিরিজের দুটি দুটি টিভি বিজ্ঞাপনের পরিচালক ছিলেন তিনি।

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে তৈরী এভিরও পরিচালক হিসাবে কাজ করেছেন রাজীব। চ্যানেল ওয়ানের উদ্বোধনী বিজ্ঞাপন ও থিম সং ‘সম্ভাবনার দুয়ার’এর চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার ছিলেন তিনি। টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র। আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্য লিখেছিলেন জলবায়ু পরিবর্তন বিষয় স্ক্রিপ্ট।

এটিএন বাংলায় প্রচারিত ১৪ পর্বের রিয়েলিটি শো ডিপ্লোমা মিষ্টির লড়াইয়েরও ছিলেন রাজীব। অনিমেষ আইচের খণ্ড নাটক “রাতের গল্প”, মাকসুদ হোসেনের ‘বাহাত্তর ঘোঁটার’চিত্রনাট্যকারও তিনি। ২০১৯ থেকে ২০২১ রাজীব স্কেচ স্টুডিওর চলচ্চিত্রকার এবং জ্যাক্স কমিউনিকেশনের ক্রিয়েটিভ সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন।

আশৈশব শ্বাসকষ্টে ভোগা রাজীব ২০২১ সালে ভয়াবহ অসুস্থ হওয়ার পর তাঁল ফুসফুসের অস্ত্রোপচার করা হয়। শারীরিক ধকল কাটাতে ২০২২ সালের আগস্ট অবধি তিনি বিশ্রামে ছিলেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরের তিনি বিগ কন্টেন্ট নাম একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। মৃত্যুর মাস দুয়েক আগে সেখান থেকে অব্যাহতি নেন তিনি।

রাজীবের আরো একটি অস্ত্রপচারের কথা ছিল ২০২৩ সালে। কিন্তু মৃত্যুর দুয়েক আগেই ডাক্তার তাঁকে পরীক্ষা করে জানায়, তাঁর ফুসফুস বেশ ভালোভাবে ‘রিকভার’ করছে। আপাতত অপারেশন না করলেও হবে। খবরটি জানানোর সময় রাজীবের কণ্ঠের প্রাণোচ্ছলতা আমি ফোনের অন্যপাশ থেকেও বেশ টের পাচ্ছিলাম। জীবনের শেষ দুটি মাস ছাড়াও ২০১৪ থেকে ২০১৮ একজন ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে টিকে ছিলেন রাজীব আশরাফ। ওই সময়কালে, তিনি অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য গল্প ও চিত্রনাঠ্য অনেক সঙ্গীত পরিচালকের জন্য গান লিখেছেন।

২০০৬ সালে প্রকাশিত সঙ্গীতশিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণবের গান ‘হোক কলরব’ পরবর্তীতে দশকে এসে দেশ-বিদেশের একাধিক ছাত্র আন্দোলনের স্লোগান হয়ে ওঠার পর থেকে আলোচনায় ছিলেন রাজীব। তাঁর লেখা কবিতা থেকেই এটি তৈরী করেছিলেন অর্ণব। রাজীব বলতেন, শুধুমাত্র সিনেমা এবং জিঙ্গেল হিসেবে ব্যবহৃত লেখাগুলো তিনি গান হিসেবে লিখেছেন, অন্যান্যগুলো কবিতা হিসেবে লেখা। সুর করায় গান হয়ে গেছে। অর্ণবের সাথেও রাজীবের পরিচয়ের সূত্রটাও কিন্তু ফিল্মমেকিং। হাবীব ওয়াহিদের চারটি গানের মিউজিক ভিডিওতে কাজ করতে গিয়ে তাদের আলাপ। তার আগে ২০০৫ সালে প্রকাশিত অর্ণবের চাইনা ভাবিস অ্যালবামটি রাজীবকে মুগ্ধ করেছিল। তাই সে ভয়ে ভয়ে একদিন অর্ণবকে বলেছিলেন, “আমিও লেখি।”

অর্ণব প্রথম তাঁর যে লেখাটি সুর করেছিলেন সেটি হোক কলরবে অ্যালবামের ১০ নম্বর ট্র্যাক, প্রকৃত জল। এর বেশ কিছুদিন পর কোনো এক মাঝ রাতে সামিরের বাসায় বসেই তিনি লিখেছিলেন হোক কলরব। ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আন্দোলনকারীদের মুখে মুখে এই গান, তখন টাইমন অব ইন্ডিয়াসহ প্রতিবেশী দেশের অনেক প্রভাবশালী গণমাধ্যমে তাঁকে সাক্ষাতকার দিতে হয়েছিল। অর্ণবের মোট চারটি অ্যালবামে রাজীবের লেখা গান রয়েছে। অর্ণবের গাওয়া হোক কলরব, ধূসর মেঘ, ঘুম, রোদ বলেছে হবে, একটা মেয়ে, প্রতিধ্বনি, মন খারাপের একটা সকাল, কে আমি, ইট কাঠ পাথরের, যখন জোনাক জ্বলে, নাম ছিলো না, বিভ্রমসহ তুমুল জনপ্রিয় বেশ কিছু গান এনেছে এই জুটি।

চলচ্চিত্রের গানও লিখেছেন রাজীব আশরাফ। রেদওয়ান রনির ‘আইসক্রিম’ সিনেমাতে অর্ণব গেয়েছেন রাজীবের লেখা ‘বোকা চাঁদ। এয়ারটেল প্রযোজিত প্রায় সব টেলিছবিতে গান লিখেছেন রাজীব আশরাফ। গানগুলো হলো-‘জলকণা উড়ে যায়’ (ভালোবাসি তাই), ‘ভালোবাসি তাই ভালোবেসে যাই’ (ভালোবাসি তাই ভালোবেসে যাই), ‘এই আমার শহর’ (অ্যাট-এইটিন অলটাইম দৌড়ের ওপর), ‘যাযাবর পাখনা’ (মাংকি বিজনেস), ‘এই যাত্রার শেষ কোথায় অজানা’ (ইউ-টার্ন)। এছাড়া আরাফাত মহসিন পরিচালিত ‘জোনাক পোকা’ টেলিছবিতে ‘নিঝুম রাতের তারা, আদনান আল রাজীবের ‘মিডেল ক্লাস সেন্টিমেন্ট’ নাটকে ‘প্রহর’, ওল্ড স্কুলের মোবাশ্বের চৌধুরীর সুর-সঙ্গীতে তারিনের কণ্ঠে ‘কালো মখমল’ নাটকের গানও রাজীব আশরাফের লেখা।

জলচরের পর রাজীব আরো কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। যার মধ্যে ‘বিস্ময়’ এবং অ্যাকুরিয়াম বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। নিজের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে রাজীব যে কাহিনীচিত্রটি তৈরী করতে চেয়েছিল সেটার নাম ছিল ‘নক্ষত্রের পতন’। মৃত্যুর মাত্র তিন সপ্তাহের আগে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার ফিল্মমেকার পরিচয়টাকে জায়েজ করতে চাই।” তানভীর চৌধুরী ও সে নিজে মিলে চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়া ব্যক্তিগত আলাপে আমাকেসহ আরো অনেক বন্ধুর সাথে তিনি সর্বশেষ যে লেখাটি শেয়ার করেছিলেন, সেটির নাম ‘ট্যাগ’। দুটি মৃতদেহে লাগানে ট্যাগ যার মূল চরিত্র। গল্পটি নিয়ে আলোচনাকালে তিনি বলছিলেন, নুরুল আলম আতিক এবং মনোজ প্রামাণিক বিভিটির এক প্রকল্পের আওতায় অনেকগুলো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করাবেন। সেখানে জমা দেওয়ার জন্য তিনি এটা লিখেছেন।

রাজীব আশরাফ অভিনয়ও করেছেন নাটক-টেলিছবিতে। এর মধ্যে আছে আশুতোষ সুজনের ‘টিনের তলোয়ার’, অমিতাভ রেজার রচনা ও আবিদ মল্লিক পরিচালিত ‘কিশোর ছবি আঁকতে পারে, মনোয়ার কবিরের রচনা ও অনিমেষ আইচের ‘হলুদ’, নূরুল আলম আতিকের ‘মজিদের টেলিভিশন, অমিতাভ রেজার পরিচালনায় ‘একটা ফোন করা যাবে প্লিজ’ উল্লেখ যোগ্য। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, ২০২০ সালে বৈভব থেকে প্রকাশিত হয়েছিল রাজীবের একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ধরেছি রহস্যাবৃত মহাকাল। যদিও পঞ্চম সহোদর রাশেদ ইমাম রিঙ্কুর আত্মহননের পর নিজের আগের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলায় বহু লেখা-ছবি-ভিডিও হারিয়ে ফেলেছিলেন রাজীব; তবে আমরা তাঁর পুরানো বন্ধুরা জানি, তিনি কী পরিমাণ হাতে লিখতেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা ওই একটি গ্রন্থে রাজীবের মোট লেখার ১০ শতাংশও আসেনি। তাঁর অপ্রকাশিত লেখাগুলো প্রকাশে পরিবার ও বন্ধুরা সক্রিয় হবেন, সেই প্রত্যাশার আলোটা জ্বলে উঠতে উঠতে নিভে গেছে। যার কিছুটা দায় নিশ্চয়ই আমার উপরও বর্তায়। তাঁকে কবরে শুইয়ে এসে “আমাদের জলচর নক্ষত্রের পতন” শিরোনামে যে লেখাটি শুরু করেছিলাম, তা আজও অসমাপ্ত। অথচ আজ (১ সেপ্টেম্বর ২০২৫) রাজীব আশরাফের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। বছর চারেক আগে সেপ্টেম্বরে শেষ সপ্তাহে আমাদের অন্তু, অর্থাৎ অনন্ত মুনীর আহমেদের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মনে হয়েছিল: “বন্ধুর মৃত্যুর খবরে/মরে যাই, মনে হয়/ঢুকে গেছি কবরে।” আরেক সেপ্টেম্বরের প্রথম দিনে সেই একই অনুভূতি ফিরিয়ে এনেছিল রাজীব। এর ২০২২ সালে মে মাসে চলে গিয়েছিলেন সাইফুল ইসলাম পান্না। তাঁর আগে ২০২০ সালের জুনে গালিব হুসাইন তাপস।

রাজীবের শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে অন্তু, পান্না, তাপস ছাড়াও তীব্রভাবে মনে পড়ছিল শাহবাগের আড্ডা থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো। সাথে থাকা সাংস্কৃতিককর্মী অমিত হাসান রুদ্রকে বলেছিলাম, “তারা কেউ যদি শিল্প-সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত না-ও থাকতেন, তবু তাদের সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার জন্য নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতাম। কারণ তারা প্রত্যেকেই ভালো মনের মানুষ ছিলেন।” রাজীবের লাশের সামনে দাঁড়ানো প্রবর রিপনের মুখে একই কথা শুনলাম। তাঁরও ভাষ্য, “খেয়াল করলে দেখবে, ভালো মানুষগুলোই মরে যাচ্ছে।”

অসমাপ্ত সেই লেখার কিয়দাংশ, বিশেষ করে রাজীবের সময়রেখা ও কর্মকাণ্ডের কিছু তথ্য এখানে টুকে রাখলাম। কোনো ভুলভ্রান্তি চোখে পড়লে দয়া করে জানাবেন; যাতে শুধরে নিতে পারি।

মন্তব্য করুন

হলি আর্টিজান স্মরণের দিনেই মাজারে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় আল্টিমেটাম!

ওরসে বাউল গানেও আপত্তি রূপগঞ্জের ওলামাদের, ‘জঙ্গি’ ট্যাগিংয়ের অভিযোগ।

Designed with WordPress

Discover more from One-man Newsroom বাংলা

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading