📷 সংগৃহীত আলোকচিত্র অবলম্বনে সম্পাদকীয় অলংকরণ

শরীফ খিয়াম আহমেদ, ঢাকা

৩১ অক্টোবর ২০২৬। দিনটি ছিল বই প্রকাশের কারণে প্রাণ হারানো বিশ্বের বিরল প্রকাশকদের একজন ফয়সল আরেফিন দীপনের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী। অথচ বাংলাদেশের কোনো গণমাধ্যমে এদিন রাত নয়টা পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও তাঁর স্মরণে করা মাত্র চারটি ‘পাবলিক পোস্ট’ এই প্রতিবেদকের নজরে এসেছে।

একজন প্রকাশক, একজন বইপ্রেমী মানুষ, একজন হত্যার শিকার নাগরিক—এত দ্রুত কি বিস্মৃতির আড়ালে চলে যেতে পারেন? তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও প্রকাশনা জগতের এই নীরবতার কারণ কী? এটা সামষ্টিক বেখেয়াল, নাকি ভয়? আমরা কি সত্যিই তাঁকে ভুলে যাচ্ছি?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের একমাত্র ছেলে ছিলেন দীপন। জন্ম ১৯৭২ সালের ১২ জুলাই। উদয়ন স্কুল, ঢাকা কলেজ, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ। ১৯৯২ সালে মাত্র পাঁচটি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জাগৃতি।

প্রথম বছরের মাইলফলক ছিল ড. নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’। এরপর আট শতাধিক বই প্রকাশ করেছেন তিনি। মুহম্মদ জাফর ইকবাল থেকে সৈয়দ শামসুল হক, বদরুদ্দীন উমর থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী; এবং সবচেয়ে আলোচিত, বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিক অভিজিৎ ছিলেন দীপনের বাল্যবন্ধু। আদালত স্পষ্ট বলেছে, অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশের জন্যই জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম। নিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর খুন হন ফয়সল আরেফিন দীপন।

সেদিন বিকেলে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার ১৩১ নম্বর কক্ষে জাগৃতির অফিসে ঢুকে দীপনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে দরজায় তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে, একই কায়দায় লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর আহমেদুর রশীদ টুটুল, ব্লগার তারেক রহিম ও রণদীপম বসুর ওপর হামলা হয়। টুটুলরা প্রাণে বেঁচে যান, দীপন বাঁচেননি। তাঁর এবারের মৃত্যুবার্ষিকীটি ছিল আরও ভিন্ন।

যে বাবা ছেলের হত্যার পরও শুভবুদ্ধির উদয়ের আশা করেছিলেন, তিনিও আর এই পৃথিবীতে নেই। চলতি বছরের ৫ জুলাই দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ৮৫ বছর বয়সে মারা যান। ছেলের অমন মৃত্যুর পর তিনি বলেছিলেন, “আমি কোনো বিচার চাই না। চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক।” ঠিক ১১ বছর পর সেই শুভবুদ্ধির উদয় কতটা হলো, বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো আজকের নীরবতাই হয়তো তার প্রমাণ।

“কেউ আর দীপনকে স্মরণ করছে না। এই বছর বাবা নেই বলে আরও বেশি বিস্মৃতি,” আলাপকালে বলছিলেন রাজিয়া রহমান জলি। তিনি শুধু দীপনের স্ত্রী নন, শৈশবের বন্ধু, কৈশোরের প্রেয়সী। আরও বললেন, “দীপন হত্যার বিচার হলো না ১১ বছরেও, সেটাই আমাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

দীপন হত্যার ঘটনায় ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আটজনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়। ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমানের দেওয়া সেই রায়ে লেখা ছিল, “যারা বই প্রকাশের দায়ে মানুষ হত্যা করতে পারে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু” এবং “আসামিরা কোনো সহানুভূতি পেতে পারে না।”

সেদিন এজলাসে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা ছয় আসামি ছিল। রায় শুনেও তারা হাসছিল, একে অপরকে আলিঙ্গন করছিল। আর কাঠগড়ার অন্য পাশে ছিলেন দীপনের স্ত্রী রাজিয়া রহমান জলি। সেদিন তিনি পরে ফেসবুকে লিখেছিলেন, “প্রত্যাশিত বা অপ্রত্যাশিত কোনো রায়েই আমাদের দীপন কবর থেকে উঠে আসবে না।” এই কথার বাস্তবতা আজও অমোঘ।

মামলার প্রধান দুই আসামি চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ও আকরাম হোসেন শুরু থেকেই পলাতক। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণ থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরও দুই আসামি মঈনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেলকে সহযোগীরা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

বর্তমানে পলাতক চার আসামির মধ্যে সৈয়দ জিয়াউল হককে হত্যার নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল পুলিশ। শুধু দীপন হত্যা নয়, লেখক অভিজিৎ রায়, এলজিবিটি অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয় হত্যা মামলাতেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। সম্প্রতি তাঁকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের পহেলা আগস্ট বিডিনিউজ এক প্রতিবেদনে জানায়, জিয়া বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সক্রিয়।

তার সাবেক একদল সেনা-সহকর্মী তাঁকে মামলা ও দণ্ড থেকে মুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা এক ডজনের বেশি মামলা প্রত্যাহার এবং তিনটি মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের জন্য সরকারি দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একই দিনের প্রতিবেদনে হাইকোর্টে জিয়ার পক্ষে নতুন আইনজীবী নিয়োগের আবেদন করা হয়েছে বলেও নিশ্চিত করা হয়।

রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশীদ আলম গণমাধ্যম দুটিকে বলেছেন, তারা ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সহযোগিতা চেয়েছেন। তাঁর দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জিয়াকে মামলার আসামি করা এবং দণ্ড দেওয়ার বিষয়গুলো ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

অর্থাৎ দীপন হত্যার ঘটনায় আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পাঁচ বছরের বেশি সময় পরও যে প্রধান অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হননি, তাঁর দণ্ড ও মামলা থেকে মুক্তির উদ্যোগ এখন সংবাদে আসছে। এটি শুধু দীপন হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া নয়, দেশে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ। আর এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দীপনকে স্মরণ করার প্রশ্নটি কেবল একটি মৃত্যুবার্ষিকী পালনের বিষয় নয়। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বই প্রকাশের অধিকার এবং ভিন্নমত প্রকাশের নিরাপত্তার প্রশ্নও।

যে সমাজে একজন প্রকাশক বই প্রকাশের কারণে হত্যার শিকার হন, সেখানে তাঁর স্মৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়। লেখক, প্রকাশক, পাঠক, গণমাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক পরিসরেরও দায় রয়েছে। নিশ্চয়ই সাবধানতা আর নীরবতা এক বিষয় নয়। ভয় বা অস্বস্তির কারণে যদি আমরা বই, প্রকাশনা ও মুক্তচিন্তার ওপর হামলার ঘটনাগুলো নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিই, তাহলে সেই নীরবতা শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা করে? এটা সর্বজনবিদিত, প্রকাশনা শিল্পে এখনো এক ধরনের আত্ম-সেন্সরশিপ কাজ করে। কোন বই প্রকাশ করলে কী হবে—এই ভয়।

গণমাধ্যমে প্রতিদিনের রাজনীতির ভিড়ে পুরোনো বিচারহীনতার গল্প হারিয়ে যায়। যে বিস্মৃতি একসময় রাষ্ট্রীয়ভাবে তৈরি করা হয়, একসময় আমরা নিজেরাই বেছে নিই। দীপনের মৃত্যুর ১১ বছর পর গণমাধ্যমের নীরবতা তাই অস্বস্তিকর। এই নীরবতার কারণ কি তাঁকে ভুলে যাওয়া, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি ও তাৎপর্যকে গুরুত্বহীন হয়ে পড়তে দেওয়া? দীপন একজন প্রকাশক। তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন প্রকাশককে স্মরণ করা নয়; বই প্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকারের প্রশ্নটিকেও সামনে নিয়ে আসা।

এগারো বছর পর প্রশ্নটি তাই শুধু—আমরা দীপনকে মনে রেখেছি কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শকে আমরা টিকিয়ে রাখতে চাই কি না। দীপনকে স্মরণ করার একটি সহজ উপায় হতে পারে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জাগৃতি প্রকাশনীর বই কেনা ও পড়া। আগামী জানুয়ারির বইমেলায় তাদের স্টল খুঁজে সেখানে যাওয়া—এটিও হতে পারে তাঁর প্রতি পাঠকদের একটি বাস্তব শ্রদ্ধা। কারণ দীপনকে মনে রাখা মানে জাগৃতিকে মনে রাখা। যে স্বাধীন চিন্তার পরিসরের জন্য তিনি কাজ করেছেন, সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা।

মন্তব্য করুন

Designed with WordPress