ঢাকার শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতির (রহ.) মাজারে বার্ষিক ওরস পালনে বাধার প্রতিবাদে নাগরিক সমাজের মানববন্ধন। ১০ জানুয়ারি, ২০২৬।

ঢাকার শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতির (রহ.) মাজারে বার্ষিক ওরস পালনে বাধার প্রতিবাদে নাগরিক সমাজের মানববন্ধন। ১০ জানুয়ারি, ২০২৬।

📷 ওয়ানম্যান নিউজরুম

নিউজম্যান, ঢাকা

চলতি বছরের শুরুতে, জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকার হাইকোর্ট মাজারে ঘটেছিল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ‘অলি-এ-বাংলা’ হযরত শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.)-এর বার্ষিক ওরস চলাকালীন পুলিশি হস্তক্ষেপে ভক্তদের যেভাবে মাজার থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তা বাংলাদেশের ধর্মীয় ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে মনে করেন সুফিবাদের অনুসারীরা।

তিন দিনব্যাপী ওরসের প্রথম দিনেই সন্ধ্যার পর পুলিশ মাজার চত্বর খালি করার নির্দেশ দেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট এলাকার স্পর্শকাতর নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তৎকালীন ডিএমপি কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, ভক্তদের ভিড়ে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ব্যক্তি বা মাদকসেবীদের আনাগোনা ঠেকাতেই তারা কঠোর অবস্থানে ছিলেন।

মাজারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে ভক্তদের সরিয়ে দেওয়ার এই সংবাদটি বাংলাদেশের মূলধারার বেশিরভাগ গণমাধ্যম এড়িয়ে গিয়েছিল। তবে থেমে থাকেনি নাগরিক সমাজ। ঢাকায় ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ নামের একটি সংগঠন এবং চট্টগ্রামের ‘মুসলিম সংস্কৃতি আন্দোলন’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। চট্টগ্রামে কাওয়ালি ও খতমে গাউসিয়ার মাধ্যমে তারা মাজারের সংস্কৃতি রক্ষার দাবি তোলে।

ঢাকায় প্রতিবাদ সংগঠিত করা লেখক ও সংগঠক মহাথেরো মুহাম্মদ এই ঘটনাকে কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন না। তাঁর মতে, এটি ছিল একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির শোডাউন। তিনি মনে করেন, তথাকথিত ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের’ দোহাই দিয়ে যে বিশৃঙ্খলাগুলো দেখা যায়, সেগুলো আসলে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত কোনো ‘মব’ নয়, বরং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা।

মহাথেরোর ভাষায়, বাংলাদেশে যারা মাজার ভাঙচুর বা ওরসে বাধা দেয়, তারা মূলত একটি বিশেষ ভাবধারা (ওহাবি বা মানহাজি) সমাজে চাপিয়ে দিতে চায়। তারা চায় মানুষের পোশাক-আশাক এবং ইবাদতের ধরন নিয়ন্ত্রণ করতে। যেখানে সুফি ঘরানার মানুষরা ঐতিহাসিকভাবেই সহনশীল, সেখানে এই সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো আধ্যাত্মিক চর্চার জায়গাগুলোকে সংকুচিত করে ফেলছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ও দরবার ভাঙার যে হিড়িক পড়েছিল, মহাথেরো মুহাম্মদ সেই প্রেক্ষাপটটিও টেনেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, কীভাবে বিশেষ রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন বা নেতাদের উস্কানিতে মাজারে হামলা চালানো হয়েছে। হাইকোর্ট মাজারের সেই ঘটনাটি ছিল মূলত এই বড় মাপের অস্থিরতারই একটি প্রাথমিক ধাপ বা মহড়া।

মহাথেরো মুহাম্মদের মতে, শরফুদ্দীনের ভক্ত বা ‘পাগলরা’ যদি অসহিষ্ণু হতো, তবে ভিন্নমতাবলম্বীদের মতবাদ এ দেশে কখনোই বিস্তার লাভ করতে পারত না। আজকের বাংলাদেশে সুফি ঐতিহ্যের ওপর এই বারবার আঘাত মূলত হাজার বছরের বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির ওপরই এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

হলি আর্টিজান স্মরণের দিনেই মাজারে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় আল্টিমেটাম!

ওরসে বাউল গানেও আপত্তি রূপগঞ্জের ওলামাদের, ‘জঙ্গি’ ট্যাগিংয়ের অভিযোগ।

Designed with WordPress

Discover more from One-man Newsroom বাংলা

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading