বিশ্বের সবথেকে বড় লিখিত সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাম ভারত। কিন্তু এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন) নামক এক রাষ্ট্রীয় প্রকল্প প্রমাণ করে দিল ভারতবর্ষের গণতন্ত্র কতটা ঠুনকো। শুধু তাই নয়, এই ব্যবস্থা এটাও প্রমাণ করে দিল এই সংবিধান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের পায়ে নিছক এক ফুটবল। যেটাকে নিয়ে রাষ্ট্র নিজের মতো করে খেলতে পারে। যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিই মানুষ, যেখানে মানুষের নামেই সংবিধান গৃহীত হয়েছিল, সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্রের সব থেকে বড় উৎসব নির্বাচন হতে চলেছে। যে মানুষগুলো ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, সেই মানুষগুলিই হঠাৎ করে এসআইআর নামক রাষ্ট্রীয় ছোবলে ভোটার তালিকার বাইরে। আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তারা আর ভোট দিতে পারবে না। অথচ তাদের করের টাকাতেই এই ভোট প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে।
আরএসএসের মতাদর্শ যে ফ্যাসিস্ট সেটা ইতিমধ্যেই সবাই জানে। তারা হিটলারের নাৎসি পার্টির মতাদর্শের সঙ্গে সহমত পোষণ করে। বর্তমানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের যে উগ্র জাতীয়তাবাদী আদর্শ জায়নবাদ সেটার সঙ্গেও একত্ববোধ করে আরএসএস। কিন্তু আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি পরিচালিত ভারত রাষ্ট্র এখন কার্যত যে একটা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে সে বিষয়ে আর কোনোও সন্দেহ নেই। বর্তমানে ভারতবাসী ভারত রাষ্ট্র পরিচালিত “ইলেক্টোরাল ফ্যাসিজমের“ (সচেতন ভাবেই এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করছি) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারই নগ্ন রূপ এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি পশ্চিমবঙ্গে। প্রায় ৯১ লক্ষের ওপর বেশি মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলে নির্বাচন হতে চলেছে। এর মধ্যে ৬০ লক্ষের ওপর মানুষকে “লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি“ নামক ধাঁধার মধ্যে ফেলে তাদের ভোটাধিকার থাকবে কি না সেটা দেখার জন্য বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়। তারা যেন “ক্রিমিনাল”। অথচ তারা জানে না তাদের কী দোষ? তারা কেন ডিলিটেড হচ্ছে সেটাও তাদের জানানো হয়নি। যে মানুষটা জানেই না কেন তার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো অথচ তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিচারাধীন প্রক্রিয়ার পরেও ২৭ লক্ষ ওপর মানুষ ডিলিটেড। তাদের বিচার হবে আবার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। ভারতের ইতিহাসে কোনোদিন এইভাবে ভোটার তালিকা তৈরি হয়নি, যেটা এবার দেখা যাচ্ছে।
এই এসআইআর অমানবিক, অবৈধ ও অসংবিধানিক। কেন অসংবিধানিক বলছি? ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা শুরু হচ্ছে “উই দ্য পিপল….” বলে। জনতার নামেই সংবিধান গৃহীত হয়েছিল। আর প্রস্তাবনা অনুযায়ী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উৎস হলো জনগণ। তাই যখন এক বিশাল সংখ্যক মানুষকে বাদ দিয়ে ভোট হয় তখন নিঃসন্দেহে এটা ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনার পরিপন্থী। প্রস্তাবনায় ঐক্য ও অখণ্ডতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই এসআইআর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়েছে। যেখানে মূলত মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার এটা একটা চক্রান্ত। এবং এটা করে সমাজের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করারও এটা একটা চক্রান্ত। বিশেষ করে শাসক দল বিজেপি এসআইআর-কে কেন্দ্র করে যে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে তাতে তারা বলেছে, এতে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি ধরা পড়বে। কেন্দ্রের শাসকদল এটাও প্রচার করছে এসআইআর-এর মধ্য দিয়ে যাদের নাম ডিলিটেড হবে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ফলে ঐক্য ও অখণ্ডতা নয়, এই এসআইআর সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে, এটাও ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনার পরিপন্থী।
প্রস্তাবনায় সমতার কথা বলা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মুসলমান, নমশূদ্র মানুষকে টার্গেট করে ভোটার তালিকা থেকে যেখানে বাদ দেওয়া হয় সেখানে সমতা আসে না। সমতার কথা বলা হয়েছে ভারতীয় সংবিধানের অন্যতম মৌলিক অধিকার ১৪ নম্বর ধারাতে। ফলে এই এসআইআর ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকারকেও খর্ব করে। ভারতীয় সংবিধানের ৩২৬ নম্বর ধারাতে পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছে, সার্বজনীন ভোটাধিকার। অর্থাৎ প্রতিটি ভারতীয় নাগরিক যেন ভোটাধিকার পায়। ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে যেসব মানুষগুলো ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল তাদের হঠাৎ করেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া মানে ভারতীয় সংবিধানের ৩২৬ ধারাকে মান্যতা না দেওয়া। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটাই অসংবিধানিক। নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে অসংবিধানিক কাজ করছে ভারতের শাসকদল বিজেপি। দুঃখের বিষয় হলো যে সুপ্রিম কোর্টকে বলা হয় “গার্ডিয়ান অফ দ্য কনস্টিটিউশন” সেই সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকাও ইতিবাচক নয়। সুপ্রিম কোর্ট লক্ষ্য করেছে অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে, তড়িঘড়ি করে এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করেছে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন। সেখানে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু যেখানে এসআইআর সম্পূর্ণ না করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিচারাধীন রেখে ভোট ঘোষণা করে দিল নির্বাচন কমিশন, সেখানে হস্তক্ষেপ করেনি সুপ্রিম কোর্ট। যেখানে আইন বলছে, নতুন ভোটার তালিকা সম্পূর্ণ না হওয়া অবধি, পুরনো ভোটার তালিকা অনুযায়ী ভোট করাতে হয়। এই পদক্ষেপ না নিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে এটাও বলতে দেখা গেছে, এবার ভোট দিতে না পারলে যে পরে আর ভোটার তালিকায় নাম উঠবে না এমনটা নয়। প্রশ্ন ওঠে যে মানুষটা ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছে সে কেন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবে না? সুপ্রিম কোর্টের এই ভূমিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রবল সমালোচনা হয়েছে।
কেন এটাকে “ইলেক্টোরাল ফ্যাসিজম” বলছি? যেকোনো ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের একটা অন্যতম গুণ হলো কর্তৃত্ববাদী চরিত্র (অথরিটেটিভ)। সমস্ত বিরোধী দল এবং বিরুদ্ধ স্বরকে দমন করা তাদের চরিত্রের মধ্যে পড়ে। উগ্র জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ। এবং সেই জায়গা থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ এবং ঘৃণা ছড়ানো। এবং এই কাজ করতে সমস্ত সাংবিধানিক সংস্থাগুলোকে জোর করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা। এই জায়গায় বর্তমান ভারত রাষ্ট্র সবকটিই ঠিকমতো করে চলেছে। ২০১৪ সালের পর থেকেই দলিত, আদিবাসী, মুসলমান, এবং বামপন্থী মতাদর্শের মানুষদের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ একটা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। খাদ্যের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, সসম্মানে বাঁচার অধিকার, আদিবাসীদের জল, জঙ্গলের অধিকার সমস্ত কিছুই আস্তে আস্তে কেড়ে নিচ্ছে ভারত রাষ্ট্র। এখন বিরাট অংশের মানুষকে ভোটের অধিকার থেকেও বঞ্চিত করছে ভারত রাষ্ট্র। যে ভোটকে বলা হয় গণতন্ত্রের বড় উৎসব, ভারতবর্ষের একটা বিরাট অংশের মানুষকে সেই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। মূলত দলিত, আদিবাসী এবং মুসলমানদের এই ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। যারা মূলত বিজেপি বিরোধী ভোটার তাদেরই ভোট কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে নিজেদের পক্ষের ভুয়া ভোটারকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, ইতিমধ্যেই বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সেটা প্রেস কনফারেন্স করে বহু জায়গায় দেখিয়েছেন। ইভিএম ট্যাম্পারিং-এর ঘটনাও নতুন কিছু নয়। এখন এসআইআর নামক এক ভয়ঙ্কর খেলার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বিরোধী ভোটারের নাম বাদ দিয়ে অনন্তকালের জন্য ক্ষমতায় থাকতে চাইছে বিজেপি। ইতিমধ্যেই বিহারে এই ঘটনা ঘটিয়ে তারা পুনরায় ক্ষমতায় এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে কোনোদিনও তারা ক্ষমতায় আসতে পারেনি। তারা জানে সঠিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাই এসআইআর-এর মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে এবং নিজেদের পক্ষের অনেক ভুয়া ভোটারকে তালিকায় ঢুকিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জিততে চাইছে তারা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় তারা নির্বাচন কমিশন, আদালতসহ সমস্ত সাংবিধানিক সংস্থাকে ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থে। যেখানে সাংবিধানিক সংস্থাগুলি সার্বজনীন ভোটাধিকারের স্বার্থে আর নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে না। এটাকেই “ইলেক্টোরাল ফ্যাসিজম” বলতে চাইছি। এইরকম প্রায় একই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন হিটলারও। ১৯৩৮-৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি জার্মানি সুডেটেনল্যান্ড দখল করে পুরো চেকোস্লোভাকিয়া ভেঙে ফেলে। বহুদলীয় গণতন্ত্র বাতিল, বিরোধী দল নিষিদ্ধ, ইহুদি, কমিউনিস্ট, রোমা প্রভৃতি গোষ্ঠীকে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
এসআইআর-এর মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার একটা চক্রান্ত বিজেপি করছে। কিন্তু মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এই প্রক্রিয়া নতুন কিছু নয়। বিরোধীদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বছরের পর বছর ক্ষমতায় থাকার ব্লু প্রিন্ট ২০১৪ সালের আগেই তৈরি করেছিল গেরুয়া বাহিনী। এ ব্যাপারে হায়দরাবাদ-ভিত্তিক কোম্পানি রে-ল্যাবস (RayLabs)-এর সিইও এবং “মিসিং ভোটার অ্যাপ”-এর প্রতিষ্ঠাতা খালিদ সাইফুল্লাহ একটি সমীক্ষা করেছিলেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন যে গোটা ভারতের মোট ভোটারের প্রায় ১৫% এবং মুসলিম ভোটারের প্রায় ২৫% ভোটার তালিকায় নেই। এর ফলে প্রায় ১২.৭ কোটি ভোটার, যার মধ্যে প্রায় ৩ কোটি মুসলিম, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। ৩৮ বছর বয়সী সফটওয়্যার স্পেশালিস্ট খালিদ সাইফুল্লাহর মতে, দেশের প্রায় ১১ কোটি যোগ্য মুসলিম ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। তাঁর সমীক্ষায় আরও জানা যায়, প্রায় ২০ কোটি দলিত ভোটারের মধ্যে ৪ কোটি ভোটারও তালিকায় নেই। নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইসলামিক কালচারাল সেন্টার-এ অনুষ্ঠিত ২০১৯ সালের তৃতীয় ন্যাশনাল লিডারশিপ সামিট-এ তিনি এই বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ই তিনি প্রথম লক্ষ্য করেন যে লক্ষ লক্ষ মুসলিম ভোটারের নাম তালিকায় নেই, ফলে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। তিনি বিশেষভাবে গুজরাটে এই সমস্যার বিশ্লেষণ করেন, যেখানে ১৬টি বিধানসভা কেন্দ্রে মুসলিম ভোটারদের বড় অংশের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল—যেখানে বিজেপি খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ফর্ম সেভেন (Form 7)-এর অপব্যবহার করে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়। তাঁর বিশ্লেষণে ৮০০টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ১.৬ কোটি “মিসিং ভোটার” পরিবার চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লক্ষ মুসলিম। কর্নাটকের নির্বাচনে এই অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ১২ লক্ষ নতুন ভোটার তালিকাভুক্ত করা হয়। আগে সেখানে প্রায় ১৮ লক্ষ মুসলিম ভোটারের নাম তালিকায় ছিল না।
তিনি বলেন, এই সমস্যার তিনটি প্রধান কারণ— রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র (বিশেষত ফর্ম সেভেন-এর অপব্যবহার), মুসলিম ও দলিতদের সামাজিক দুর্বলতা এবং শিক্ষিত মানুষের উদাসীনতা। রাজ্যগুলিতে কীভাবে মুসলমানদের ভোট বাদ দেওয়া হয়েছে সাইফুল্লাহর বক্তব্যে সেটাও উঠে এসেছিল। উত্তরপ্রদেশে যদি কোনো মুসলিম পরিবারের চারজন ভোটার থাকে, তাহলে সম্ভবত একজনের নাম তালিকায় থাকবে না। তামিলনাড়ুতেও একই অবস্থা—প্রতি চারজন মুসলিমের মধ্যে একজনের নাম অনুপস্থিত। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে কেন বছরের পর বছর গেরুয়া বাহিনীরা জিতে আসছে। এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের যে নগ্নরূপ সেটা আরএসএস বিজেপির পূর্ব পরিকল্পনারই একটা অংশ। তারা জানে পশ্চিমবঙ্গে জিততে গেলে এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোট ম্যানিপুলেশন-কে নিখুঁতভাবে করতে হবে। এ ব্যাপারে তারা ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন ও ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ভোট ম্যাপিং নিখুঁতভাবে করেছে। কোন আসনে কত ভোটের ব্যবধানে জয় পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে সেটাকে মাথায় রেখেই ওরা এসআইআর-এর মাধ্যমে বিরোধী ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দিতে চাইছে।
এসআইআর কেন ভারত রাষ্ট্রের একটা ফ্যাসিবাদী এজেন্ডা? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে বিখ্যাত ইতালিয়ান দার্শনিক উমবের্ত ইকোর ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বোঝা খুবই জরুরি। লক্ষণীয় বেনিতো মুসোলিনির হাত ধরে ইতালিতে যে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিল সেই বিষয়টি কে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন ইকো। তিনি তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ আুর-ফ্যাসিবাদ (Ur-Fascism) (আদি ফ্যাসিবাদ)-এ ফ্যাসিবাদকে কোনো একক স্থির মতবাদ হিসেবে নয় বরং একটা “রিকারিং টেন্ডেন্সি” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে ফ্যাসিবাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নরূপে ফিরে আসতে পারে। এই প্রবন্ধে তিনি ফ্যাসিবাদের ১৪টি চরিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে ৪টি চরিত্র ভারতবর্ষের বর্তমান শাসকের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। ফ্যাসিবাদী শাসক সব সময়ই বহুত্ববাদের বিরোধিতা করে, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন ভাষার বহুত্ববাদকে তারা ভয় পায়। যেটাকে ইকো বলেছেন “ফেয়ার অফ ডিফারেন্স”। এই এসআইআর প্রক্রিয়া আসলে মুসলমান, আদিবাসী, দলিতদের ডি-ভোটার করে বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে চায়। ফ্যাসিবাদের অন্যতম আরেকটি চরিত্র হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে বার্তা দেওয়া যে আপনার সমস্ত না পাওয়ার জন্য দায়ী নিম্নবর্গের মানুষ। এটাকে ইকো বলেছেন “অ্যাপিল টু ফ্রাস্ট্রেটেড মিডল ক্লাস”। ভারতের শাসক দল বিজেপি সহ বিভিন্ন মন্ত্রীদের বলতে শোনা যায় বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমান ও রোহিঙ্গাতে ভরে গেছে পশ্চিমবঙ্গ। এবং তাদের জন্যই পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্তরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এইভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে তারা মধ্যবিত্তদের বিরাট অংশকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে মুসলমানরা যুগ যুগ ধরে ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সন্তান তাদের প্রতি একটা ঘৃণা ও বিদ্বেষ তৈরি করেছে। তারা এটাও বুঝিয়েছে যে আসলে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাতে ভরে গেছে, তাই এসআইআর করে তাদের দেশ থেকে তাড়ানো হবে। এর ফলে তারা সমাজে একটা বিভাজন তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে। যারা দুর্বল শ্রেণী তাদের প্রতি ঘৃণা তৈরি করাও ফ্যাসিবাদের অন্যতম লক্ষণ। যেটাকে ইকো বলেছেন “কনটেম্পট ফর দ্য উইক”। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর মধ্য দিয়ে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া ও দুর্বল মুসলমান, দলিত, আদিবাসীদের ব্যাপকভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এবং এটার মধ্য দিয়ে তারা এক প্রকারের ঘৃণাও ছড়িয়েছে, ওরা ভারতের নাগরিক নয়। তাই ওদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়াটা বাঞ্ছনীয়। বিজেপি সরকার কার্যত সব মানুষকে জনগণ বলে মনে করে না। তারা একটি বিশেষ শ্রেণীকে তাদের জনগণ বলে মনে করে। আর তাদের কথা ভেবেই সমস্ত রাজনৈতিক এজেন্ডা তৈরি করে বর্তমান ভারত রাষ্ট্র। ফ্যাসিবাদের এই চরিত্রকে ইকো বলেছেন “সিলেক্টিভ পপুলিজম”। এবং এর প্রতিফলন পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেছে। এসআইআর-এর বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সেই ভাবে পথে নামতে দেখা যায়নি।
দুঃখের বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএমের মতো বামপন্থী দলও এসআইআর বাতিলের কথা বলেনি। তারা ভালো এসআইআর-এর কথা বলেছে। যে এসআইআর প্রক্রিয়াটাই কার্যত অবৈধ, অমানবিক, অসংবিধানিক এবং ফ্যাসিস্ট সরাসরি সেটা বাতিল করার সাহস তারা দেখাতে পারেনি একটাই কারণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের দ্বারা বিরোধিতা করতে চায় না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। সে আন্দোলন করতে গিয়ে দেখেছি, রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল, সিপিএমের মতো বামপন্থী দল সরাসরি এসআইআর-এর বিরোধিতা না করার ফলে, পশ্চিমবঙ্গে আন্দোলনটি সেইভাবে দানা বাঁধেনি। বরং তারা মানুষের আন্দোলনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষকে তারা এটা বুঝিয়েছে, “চিন্তা করার কোনো দরকার নেই, সকলের নাম ঠিক ভোটার তালিকায় উঠে যাবে”। পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষ যেহেতু এইসব রাজনৈতিক দলগুলি দ্বারা প্রভাবিত, ফলে তারা চাইলেও সংগঠিত ভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। মালদা জেলায় এসআইআর বিরোধী যে গণ আন্দোলন শুরু হয়েছিল বামপন্থী দল সে আন্দোলনের পাশে দাঁড়ায়নি।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের সেই আন্দোলনকে দাঙ্গা বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। আন্দোলনকে দমাতে গণ আন্দোলনের কর্মীদের অযৌক্তিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এবং সেই আন্দোলনের গায়ে সাম্প্রদায়িক তকমাও দেওয়া হয়েছে। যেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সিপিএমের মতো বামপন্থী দল সে আন্দোলনকে সমর্থন তো জানায়নি, বরং তারা মনে করেছে এইভাবে আন্দোলন করা উচিত হয়নি। ফলে এতে মনে হয় ভারত রাষ্ট্র যে আদর্শগত উদ্দেশ্য এসআইআর শুরু করেছে তার বিরোধিতা সেভাবে না করে তৃণমূল সিপিএমের মতো দল পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের “আইডিওলজিক্যাল অ্যাপারেটাস” হিসেবে কাজ করছে। গোটা এসআইআর প্রক্রিয়ায় এখনো পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোট দিতে না পারার যন্ত্রণায় ভুগছেন। তারা ভাবছেন এবার তাদের হয়তো ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে। এর দায় শুধু বিজেপি, কেন্দ্রীয় সরকার, নির্বাচন কমিশন, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নয়, এর দায় তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিএমের মতো দলকেও নিতে হবে। যদিও পশ্চিমবঙ্গে পুরোটাই নিরাশার চিত্র নয়। পার্ক সার্কাস ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চ, যাদবপুর এসআইআর বিরোধী ঐক্য উদ্যোগ সহ বিভিন্ন সংগঠন ও গণসংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ ও জেলায় জেলায় গণ-আন্দোলনের কর্মীরা এসআইআর নামক এই ফ্যাসিস্ট এজেন্ডার বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। জনতার আন্দোলনই কেন্দ্রীয় সরকারের ফ্যাসিস্ট এজেন্ডার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
লেখক: গবেষক, সাংবাদিক ও গণআন্দোলনকর্মী




Leave a Reply