📷 সংস্কারের ইমাম

আবদুর রহমান ওরফে শামীম রেজা ওরফে কালান্দার বাবা শ্রী শামীম আল জাহাঙ্গীর আল সুরেশ্বরীকে (মাঝে) আরও দুজনের সঙ্গে লালনের আখড়াতে দেখা যাচ্ছে। ছবির মেটাডেটা অনুযায়ী এটি ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির ছবি। নিজের ‘সংস্কারের ইমাম’ নামের ফেসবুক প্রোফাইলে এটি প্রকাশ করেছিলেন শামীম।

শরীফ খিয়াম আহমেদঢাকা

বাংলাদেশে লোক-আধ্যাত্মিকতা, বিশেষত লোকজ ইসলামচর্চার প্রধান কেন্দ্র হচ্ছে মাজার; যার গোড়াপত্তন হয় মূলত পীর বা গুরুর ওফাতের পর। সাধারণত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর তাঁদের নিজেদের আস্তানায় সমাহিত করা হয়। সেটিই হয়ে ওঠে তাঁদের মাজার, যা দরবার, দরগাহ, আখড়া—এমন নানা নামে পরিচিতি পায়। এবার সেই মাজার সংস্কৃতির শিকড়ে আঘাত হানতে চাইছে উগ্রবাদী ইসলামি গোষ্ঠীগুলো। মাত্র ২৪ দিনের মধ্যে এই দেশে এমন দুটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ‘মব ভায়োলেন্স’-এর ভয়ে নিজ দরবারে দাফন করা যায়নি দুই সুফি সাধককে। এর মধ্যে একজনকে আবার পিটিয়ে ও কুপিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ এটা বলাই যায়, দক্ষিণ এশীয় এই মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশে লোকজ আধ্যাত্মিকতাচর্চা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ ঘটনাটি রোববার (১২ এপ্রিল) বিকেলের। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুরের আবদুর রহমান ওরফে শামীম রেজা ওরফে কালান্দার বাবা শ্রী শামীম আল জাহাঙ্গীর আল সুরেশ্বরীর মৃতদেহ তাঁর আখড়ার বদলে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করতে বাধ্য করা হয়। “প্রশাসন দরবার প্রাঙ্গণে সমাহিত করবার অনুমতি দেয় নাই। সুতরাং বাবা শামীম শাহকে এলাকার কবরস্থানে নিয়ে দাফন করা হয়। জয় জয় মবতান্ত্রিক বাংলাদেশ,” শামীমের গুরুভাই সুফিধারার কবি সৈয়দ তারিক এভাবে ফেসবুকে উল্লেখ করেছেন ঘটনাটি।

এর আগে বরিশাল নগরীর বটতলা পুলিশ ফাঁড়ির সামনে প্রায় ৩৮ বছরের পুরোনো ‘হাবিব শাহের দরবার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ৯০ বছর বয়সী হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব শাহ ১৭ মার্চ ভোরে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ভক্তরা যখন ১৮ মার্চ দুপুরে দরবার প্রাঙ্গণেই তাঁকে দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন একদল উগ্র লোক ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে সেখানে হামলা চালায়। তারা দরবারের ভেতরে থাকা হারমোনিয়াম, ঢোলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করে এবং সেখানে গান-বাজনা ও দাফনে বাধা দেয়। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে শেষ পর্যন্ত হাবিব শাহের মরদেহ কীর্তনখোলা নদীর তীরে চরকাউয়া এলাকায় দাফন করা হয়। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী এই ঘটনাকে ‘মব সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন।

এদিকে, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ফিলিপনগরের যে স্থানীয়দের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছি, তাদেরই একজনের পাঠানো স্ক্রিনশটে দেখলাম, যে মসজিদের ইমাম শামীমের জানাজা পড়িয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধেও মব-ভায়োলেন্সের ডাক দেওয়া হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম, সেই ইমাম বলছেন, এলাকাবাসী শামীমকে মুসলিম এবং তিনি ইমানদার অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন বলেই তিনি এই জানাজা পড়াতে রাজি হয়েছেন। একই ভিডিওতে দেখা গেছে, শামীমের পরিবারের সদস্যরা এলাকাবাসীর কাছে শামীমের আচরণের জন্য মাফ চাইছেন। পরে পুলিশ পাহারায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়, যে প্রথম দেশব্যাপী আলোচনায় এসেছিল নিজস্ব শেষকৃত্য রীতির জন্য।

এই শামীম সম্পর্কে আমার জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তখন, মানে ২০২১ সালে। সেই বছরের মে মাসে ঢোল-তবলা বাজিয়ে নেচে-গেয়ে এক কিশোরের মরদেহ দাফন করার ভিডিও ভাইরাল হওয়া থেকে ঘটনার সূত্রপাত। যার ধারাবাহিকতায় ২৯ জুন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বড় আইলচারা গ্রামের হাক্কানী দরবার শরিফের পক্ষ থেকে খালিদ হাসান সিপাই ধর্ম অবমাননাসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ এনে শামীমের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে ১৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে দৌলতপুর থানা। পরদিন রাতে তাঁকে নিজ আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তখন তাঁর একাধিক গুরুভাই, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ আরও কার কার সাথে জানি কথা বলেছিলাম। যদি স্মৃতিভ্রষ্ট না হই, তখন কোনো কারণে শামীমের শৈশবের বন্ধু ও প্রতিবেশী সেখানকার তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আ ক ম সারোয়ার জাহান বাদশা তাঁর ওপর রুষ্ট হয়েছিলেন। একই সঙ্গে তাঁকে ‘খেলাফত’ অর্থাৎ তরিকা প্রচারক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ইমান আল সুরেশ্বরীর প্রয়াণের পর তাঁর ওয়ারিশদের একাংশের বিরাগভাজনে পরিণত হয়েছিলেন। দফায় দফায় জামিনের আবেদন করে চার মাস পর জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন শামীম।

ঢাকা বিভাগের চাঁদপুরের স্থানীয় প্রশাসন শতবর্ষী লোকজ আয়োজন সোলেমান লেংটার মেলা বন্ধ করে দেওয়ার মাত্র ১০ দিন পর শনিবার (১১ এপ্রিল) খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগরের নিজ দরবারেই সেই শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে উগ্র মুসল্লিরা। স্থানীয়রাই এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত জানিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন। তিনি নিজেদের অক্ষমতাও স্বীকার করেছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, “বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশ কম ছিল। এ জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।” কারা কীভাবে একটি পুরোনো ভিডিওর খণ্ডাংশ নতুন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে শামীমের বিরুদ্ধে লোকজনকে খেপিয়ে তুলেছিল তা খতিয়ে দেখার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যখন সারাদেশে একের পর এক লোকজ আধ্যাত্মিকতাচর্চার কেন্দ্র আক্রান্ত হচ্ছে, তারই মধ্যে ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’ নামের এক সাধকের কবর ভেঙে তাঁর মরদেহ তুলে এনে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সুফি-সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’ জানিয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে, এবং এসব ঘটনার বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ১১টি। ফিলিপনগরের ঘটনাতেও ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো মামলা হয়নি। নিহতের স্বজনরা মামলা করতে আগ্রহী নন বলে বিবিসি বাংলার এক খবরে জানানো হয়েছে।

তিন দিকে ভারতবেষ্টিত একটি রাষ্ট্র, যেখান থেকে চীনও ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে; ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তেমনই একটি দেশের এই পরিবর্তনের দিকে দুনিয়ার অনেক দেশেরই চোখ আছে বলে আন্দাজ করি। তারা যেসব গণমাধ্যমের বরাতে এসব ঘটনা প্রাথমিকভাবে জানতে পারছে, সেগুলোর চরিত্রও কিছুটা উন্মোচিত করে দিয়েছে শামীম আল জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর ঘটনা। কেন কাঠগড়ায় সংবাদমাধ্যম?

নির্বিবাদী হিসেবে পরিচিত সুফি, বাউল, পাগলসহ নানা ঘরানার সাধু, সন্ত বা পীরদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসল্লিদের চড়াও হওয়া বাংলাদেশে নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে উঠেছে। চলমান এই সামাজিক পীড়ন যখন চরমে পৌঁছায়, অর্থাৎ কাউকে হত্যা করা হয়, কিংবা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় মাজার, অথবা কবর থেকে কারো মৃতদেহ তুলে তা পুড়িয়ে দেওয়া হয়, বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য কেউ গ্রেপ্তার হন; তখনই শুধু এসব ঘটনা সংবাদমাধ্যমে স্থান পায়। যেভাবে চলতি সপ্তাহে স্থান পেয়েছে নিজ আস্তানায় মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে আবদুর রহমান ওরফে শামীম রেজা ওরফে কালান্দার বাবা শ্রী শামীম আল জাহাঙ্গীর আল সুরেশ্বরীর মৃত্যুর ঘটনা।

অন্যান্য সময়ের মতো এবারও মৃদু প্রতিবাদ হচ্ছে, অনলাইনে স্ট্যাটাস, ফটোকার্ড; অফলাইনে মিছিল, বক্তৃতা, সবই হচ্ছে। কিন্তু এমনটা আগেও হয়েছে। আবারও দুদিন পর সবাই ভুলে যাবে, যেন সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তিন দিনের দিন আবার যদি কেউ আক্রান্ত হয়, আবারও প্রতিবাদ হবে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ব্যস, ওই পর্যন্তই।

দৃশ্যত সংখ্যাগরিষ্ঠকে তুষ্ট করার এক রাজনৈতিক ফাঁদ লোক-আধ্যাত্মিকতাচর্চার গলা চেপে ধরে আছে। সুযোগ পেলেই চাপ বাড়াচ্ছে। মূল আকাঙ্ক্ষা আসলে এক টিপে মেরে ফেলা। দশকের পর দশক ধরে হেইট ক্যাম্পেইন চালিয়ে যার গ্রাউন্ড তৈরি করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে অনেক পাঠক নিশ্চয়ই জেনেছেন, কুষ্টিয়ায় হত্যার শিকার হওয়া পীরের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোববার (১২ এপ্রিল) জানিয়েছে, নিহতের মুখমণ্ডলে ১৫ থেকে ১৮টি এলোপাথাড়ি কোপের দাগ দেখা গেছে। এ ছাড়া শরীরের অন্যান্য জায়গায় জখম রয়েছে। কোনো ধর্মপ্রাণ মানুষ কি এতটা হিংস্র হতে পারে? মূলত মুখমণ্ডলের আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি মারা গেছেন বলে দৈনিক প্রথম আলোকে জানিয়েছেন ওই চিকিৎসক।

আগের দিন এই প্রথম আলোসহ ঢাকার একাধিক গণমাধ্যমের অনলাইন ভার্সনের সংবাদে নিহত শামীমকে ‘কথিত পীর’ হিসেবে উল্লেখ করার কারণে সমালোচনার শিকার হয়েছিল। এ বিষয়ে অন্তত দুজনের ফেসবুক পোস্টের কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই।

বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের প্রতিষ্ঠাতা নির্ঝর আলম মুনওয়ার একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করে লিখেছেন, “বাংলাদেশের শীর্ষ চার গণমাধ্যম তাদের শিরোনামে ‘কথিত’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। এই শব্দটা শিরোনামে দিয়েই শুরুতেই পাঠকের মাঝে নিহত ব্যক্তিকে নিয়ে নেতিবাচক ফ্রেমিং করেছে গণমাধ্যমগুলো। এর ফলে সাধারণ মানুষ ইমোশনালি বায়াজড হয়। মনের অজান্তে বিশ্বাস করতে শুরু করে, খারাপ লোক ছিল, মেরে ফেলা ঠিকই আছে।”

নির্ঝর আরও লিখেছেন, “অথচ কেউ যদি সর্বোচ্চ খারাপও হয় তাকে মেরে ফেলা যায় না। তাকে আইনের আওতায় এনে সাজা দিতে হয়। গণমাধ্যমগুলো বুঝে হোক আর না বুঝে হোক এই হত্যাকে জায়েজ করতেছে সাধারণ মানুষের কাছে।”

একইভাবে স্ক্রিনশট শেয়ার করে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্টের এডিটর কদর উদ্দিন শিশির লিখেছেন, “ধরেন লোকটা কোনো পীর-ই না। একটা পুরা বাটপার (আমি জানি না এই লোক কেমন)। কিন্তু যখন সেই বাটপার লোকটা আইন বহির্ভূতভাবে সংঘটিত কোনো ঘটনার ভিকটিম হচ্ছে, তখন সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে তার পূর্বের অপরাধের প্রসঙ্গ সংবাদের শুরুতে না টেনে, সে যে বেআইনি ঘটনায় ভিকটিম হয়েছে সেটাকে হাইলাইট করা। হ্যাঁ, প্রসঙ্গক্রমে তার আগের অপরাধের বা বর্তমান ভিকটিম হওয়ার সাথে তার পূর্বের অপরাধের সম্পর্ক টানা যাবে। কিন্তু তা এমনভাবে হওয়া উচিত না যেন তার পূর্বের কোনো অপরাধ বর্তমানের ভিকটিমহুডকে জাস্টিফিকেশন দেয়।”

“এই যে প্রথম আলো, যমুনা টিভি, যুগান্তর থেকে শুরু করে সব বড় বড় মিডিয়া একটা লোকের খুন হওয়ার ঘটনার সাথে তার পীর হওয়ার বিষয়টাকে শিরোনামেই উদ্ধৃতি কমা বা ’কথিত’ শব্দের মধ্যে ঢুকিয়ে একটা ধারণা ছুঁড়ে দিলেন পাঠকের মনে যে, লোকটা মনে হয় আসলে পীর ছিল না। ভণ্ডটণ্ড ছিল কিছু মনে হয়! এই যে ধারণাটা পুঁতে দেওয়া হলো (নেগেটিভ ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে) তাতে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, যাহ ভণ্ডপীর হইলে পাবলিক তো ক্ষেপবোই! আর ক্ষেপলে তো মাইরটাইর দিবোই। আর মাইর দিলে মইরা যাওয়াটাও অস্বাভাবিক না!”

শিশির আরও লিখেছেন, “এই যে একটা লোকের হত্যার পরোক্ষ জাস্টিফিকেশন আমরা তৈরি করছি পাঠকের মনে, অবচেতনে—এইটা অপরাধ! এই কাজ আমরা অনেকে জেনে এবং না জেনে হাসিনার সময়ে করেছি। বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার ইত্যাদিকে এমনভাবে উদ্ধৃতি কমা বা কথিতের মধ্যে ঢুকিয়ে। এসব বন্ধ হোক।”

কিন্তু এসব কি আদৌ বন্ধ হবে? এই লেখাটা লিখতে বসার আগেও, মানে রোববার সন্ধ্যার পরও দেখছিলাম দৈনিক ইত্তেফাকের ফেসবুক পেজে একটি নতুন ডেস্ক রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানেও সেই একই ফ্রেমিং। লোক-আধ্যাত্মিকতার সংকটে কথিত ‘সংবাদমাধ্যম’ ওরফে পুঁজিপতিদের প্রচারমাধ্যমগুলো সাংবাদিকতার নামে যা করছে তা বিশ্লেষণ করেই দিস্তার পর দিস্তা লেখা যাবে। যেমন গত জানুয়ারির ঘটনাই ধরুন। ‘অলি-এ-বাংলা’ উপাধি পাওয়া আউলিয়া হযরত শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.), যার রওজা হাইকোর্ট মাজার হিসেবে পরিচিত। তাঁর দরবারের বার্ষিক ওরস হতে না দেওয়া বা ভক্তদের মারধরের ঘটনাটি এড়িয়ে গিয়েছে বাংলাদেশের মূলধারার সিংহভাগ সংবাদমাধ্যম।

পরবর্তীতে সম্প্রীতি যাত্রা নামের একটি নাগরিক সংগঠন এই ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন আয়োজন করেও খুব বেশি গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। তখনও এর কারণ বোঝার চেষ্টা করেছিলাম। “মাজার আক্রান্ত হলে গণমাধ্যম যা করছে,” শিরোনামে ওয়ানম্যান নিউজরুমের একটি ভিডিও আপনারা পাবেন ফেসবুক-ইউটিউবে।

যত দূর মনে পড়ে, ২০২১ সালেও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ বাংলাদেশের মালিকানাধীন গণমাধ্যম জাগো নিউজে ‘নেচে-গেয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে কিশোরের মরদেহ দাফন’ শিরোনামে প্রথম সংবাদটি করেছিল। পরপর তিনটি সংবাদ প্রকাশ করেছিল তারা। এরপর শামীমকে গ্রেপ্তারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন। কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে আলাপ করতে গিয়েও শামীমের বিরুদ্ধে নালিশ করছে, স্থানীয়রা আলেম-ওলামারা নিজেরাই এমন ভিডিও প্রচার করেছেন সোশ্যাল মিডিয়াতে।

নিজেকে ‘সংস্কারের ইমাম’ দাবি করা শামীমকে উগ্রবাদীরা পিটিয়ে মেরে ফেলার পরপরই ২০২১ সালে মামলা করা সেই খালিদ হাসান সিপাই ফেসবুকে লিখেছেন, “আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ২০২১ সালে ভণ্ডপীর শামীম রেজার বিরুদ্ধে হক্কানী দরবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। জেলও খাটেন। কিন্তু সঠিক বিচার হয়নি। আজকে কী ঘটলো? দায়ী কে?” আমিও সেটাই ভাবছি। দায়টা আসলে কার। কখনো এই দেশের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান কি এসব ঘটনার জন্য নিজের ব্যর্থতাকে দায়ী মনে করবেন?

Leave a Reply

Designed with WordPress

Discover more from One-man Newsroom বাংলা

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading