সোলেমান লেংটার মেলায় আসা গুরু-শিষ্যের আলাপের এই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করেছেন চলচ্চিত্রকার মাহবুব হোসেন।

সোলেমান লেংটার মেলায় আসা গুরু-শিষ্যের আলাপে দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করেছেন চলচ্চিত্রকার মাহবুব হোসেন।

শরীফ খিয়াম আহমেদ, ঢাকা

এবার ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা চাঁদপুরের শতবর্ষী লোকজ আয়োজন সোলেমান ল্যাংটার ওরশ ও মেলা বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

মতলব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জবীর হুসাইন সানীব বুধবার (১ এপ্রিল) রাতে বলেছেন, “মেলার কোনো অনুমতি না থাকায় দ্রুত কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে।”

তাঁর এই বক্তব্য উল্লেখ করে ঢাকার সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ লিখেছে, এর আগে রোববার মেলায় মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড হয় এমন অভিযোগ তুলে এসব বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়।

সুফি সাধক হজরত শাহ সোলেমান (রহ.) ওরফে সোলেমান লেংটার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের বেলতলী এলাকায় মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলে শুরু হয়েছিল ১০৭তম এই আয়োজন।

পুলিশ জানায়, মেলা উদ্বোধনের দিনই মাদককে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে মাজারের প্রধান খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়া জখম হন। পরে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ঢাকার আরেকটি গণমাধ্যম দৈনিক ইনকিলাবের খবরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনির বক্তব্য রয়েছে। তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসন থেকে মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তাই বৃহস্পতিবার থেকে মেলা বন্ধ হবে। বুধবার সন্ধ্যায় তা ঘোষণা করা হয়।”

স্থানীয়দের অভিযোগের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি লিখেছে, মেলায় মাদক কেনাবেচা, সেবন ও অশ্লীল নৃত্যের আসর বসানো হয়। এ মেলার কারণে যুবক ও কিশোরেরা বিপথগামী হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে এলাকার পরিবেশ। বুধবার দুপুরে মেলায় ঘুরে ইনকিলাব প্রতিনিধি হাজারো মানুষের ভিড় দেখেছেন।

তিনি লিখেছেন, “তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলছে মেলাটির নানা কার্যক্রম। বিভিন্ন জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। মাজারটির পশ্চিম দিকে পুকুরের পাড়, বাগান ও বেড়িবাঁধ এলাকায় মদ-গাঁজা সেবন ও বিক্রির জমজমাট আসর চলছে। বিভিন্ন জেলা থেকে মাদকসেবীরা সেখানে এসে আড্ডা দিচ্ছেন।”

“গাঁজার দোকান বসিয়ে চলছে গাঁজা সেবনের মহোৎসব। এই মেলায় সারাদেশ থেকে ছুটে আসে নেশাখোরেরা,” উল্লেখ করে জেলার স্থানীয় দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ লিখেছে, সোলেমান লেংটার মাজারের আশপাশে তাঁর অনুসারীদের অন্তত ১৮ থেকে ২০টি মাজার এবং দুই শতাধিক খানকা বা ভক্তদের আস্তানা রয়েছে। এসব স্থানে নারী-পুরুষ একসঙ্গে গান-বাজনার সঙ্গে নাচানাচিতে অংশ নিচ্ছেন। এ যেন অশ্লীলতাকেও হার মানায়।

এর আগে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলে ওরশ ও মেলার প্রথম দিনে মাজারের প্রধান খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়াকে কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। মেলায় মাদক সেবন ও জুয়ার খেলার পক্ষ-বিপক্ষের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ থেকে এই সহিংসতা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সুফি সাধক হজরত শাহ সোলেমান (রহ.) ১৩২৫ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে (১৯১৯ সালের মার্চ-এপ্রিল) মারা যান। এরপর থেকে প্রতি বছর এ এলাকায় চৈত্র মাসের ১৭ তারিখে মেলার আয়োজন করা হয়। সাত দিনের এই মেলায় লাখ লাখ লোকের সমাগম ঘটে বলে উল্লেখ করেছে গণমাধ্যমগুলো।

প্রশ্নবিদ্ধ অশ্লীলতার অভিযোগ

২০১৮ সাল থেকে লেংটার মাজারে যাতায়াত শুরু করা চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অ্যাক্টিভিস্ট মাহবুব হোসেন এবারের মেলায়ও গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় এবারের লোকসমাগম অনেক বেশি ছিল।

“শতবর্ষী একটি লোকজ মেলা এভাবে বন্ধ করে দেওয়ার মানে কী?” এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “সেখানে নারী-পুরুষের একসাথে নাচানাচি নিয়ে যে অশ্লীলতার অভিযোগ তোলা হয়, তা নেহাতই অজ্ঞতাপ্রসূত। লোকজ সুরে ও তালে স্রষ্টার সনে প্রেম নিবেদনে গাওয়া গানের সাথে যারা নাচেন, তাঁদের হালত বোঝার জন্য যতটুকু প্রজ্ঞা দরকার, সেটুকু যাদের নেই, তারাই শুধু এর মধ্যে স্থূল যৌনতা খুঁজে পাবেন।”

ওয়ানম্যান নিউজরুমের সাথে বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দুপুরে মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল মাহবুবের। “সেখানে যেসব সাংবাদিক যাচ্ছেন, তাঁদেরও একটা বড় অংশ অশ্লীলতা ও আধ্যাত্মিকতার পার্থক্য বুঝতে পারছেন না বলেই মনে হচ্ছে।”

সোলেমান লেংটার মেলায় মাহমুব হোসেন।

সোলেমান লেংটার মেলায় মাহমুব হোসেন।

লেংটার মাজারে মাহবুবের যাতায়াত শুরু হয়েছিল মূলত তিনি লোকজ আধ্যাত্মিকতাচর্চার সাথে লোকগানের সম্পর্ক নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণের সময়। তিনি বলেন, “প্রথমবার আমি আসলে ফোক গানের সাথে সাধারণ মানুষের অ্যাটাচমেন্ট দেখতেই গিয়েছিলাম সেখানে। আমাদের চোখের সামনেই আস্তে আস্তে গানবাজনা ও নাচানাচির উপর চাপ বাড়তে থাকে।”

“গত বছর গান-বাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। নারীরা আসতে পারবে না মাজারে, এমন মাইকিং হচ্ছিল। তখন অজস্র নারী শিল্পীর অসহায় চোখ দেখে আমি মুষড়ে পড়েছিলাম। এবারও মেলা বন্ধ হয়ে গেছে শোনার পর থেকে খুবই অসহায় লাগছে,” যোগ করেন এই চলচ্চিত্রকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সময়ে দেশজুড়েই মাজার, মেলা বা বাউল ও পাগলের আখড়া আক্রান্ত হচ্ছিল। এবার সবার প্রত্যাশা ছিল নির্বাচিত সরকার আসায় সেই পরিস্থিতি কেটে যাবে। কিন্তু আসলেই কাটছে কি? বর্তমান সরকারের আমলে বরিশাল ও সিলেটে সুফিবাদের চর্চা ও বাউলগানকে কেন্দ্র করে মব ভায়োলেন্স হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ বন্ধ হলো এই ল্যাংটার মেলা।

কী হয়েছিল বরিশাল ও সিলেটে?

বরিশাল নগরীর বটতলা পুলিশ ফাঁড়ির সামনে প্রায় ৩৮ বছরের পুরোনো ‘হাবিব শাহের দরবার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ৯০ বছর বয়সী হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব শাহ ১৭ মার্চ ভোরে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ভক্তরা যখন ১৮ মার্চ দুপুরে দরবার প্রাঙ্গণেই তাঁকে দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন একদল উগ্র লোক ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে সেখানে হামলা চালায়।

তারা দরবারের ভেতরে থাকা হারমোনিয়াম, ঢোলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করে এবং সেখানে গান-বাজনা ও দাফনে বাধা দেয়। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে শেষ পর্যন্ত হাবিব শাহের মরদেহ কীর্তনখোলা নদীর তীরে চরকাউয়া এলাকায় দাফন করা হয়। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী এই ঘটনাকে ‘মব সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন।

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে ২২ মার্চ রাতে ইব্রাহিম শাহের মাজারে বাউল গানের আসরে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতি বছরের মতো এবারও তিন দিনব্যাপী বাউল গান উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় রাতে হঠাৎ শতাধিক লোক ‘নারায়ে তকবির’ স্লোগান দিয়ে মঞ্চে হামলা চালায়।

হামলাকারীরা মঞ্চে উঠে বাউল শিল্পীদের বাদ্যযন্ত্র, সাউন্ড সিস্টেম এবং দর্শকদের বসার চেয়ার ভাঙচুর করে। এর ফলে অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায় এবং ভক্ত ও শিল্পীরা প্রাণভয়ে পালিয়ে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারীরা মিছিল করতে করতে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করছে।

পরবর্তীতে মাজারের খাদেম অভিযোগ করেন যে, ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে হামলাকারীরা পাশের একটি মসজিদের জানালার কাঁচও ভাঙচুর করেছিল। স্থানীয় পুলিশ জানায়, লাউডস্পিকারে গান বাজানোর কারণে স্থানীয়দের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার অজুহাতে এই হামলা হয়েছে। তবে কোনো পক্ষ অভিযোগ না করায় বিষয়টি ‘স্থানীয়ভাবে মীমাংসা’ করা হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ বাউল সমিতির সভাপতি ও পালাগানের মহারাজ হিসেবে পরিচিত লোকগানের শিল্পী আবুল সরকার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বর থেকে বিনা বিচারে কারাবন্দী অবস্থায় আছেন।

‘ওয়ানম্যান নিউজরুম’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তাঁর এই গ্রেপ্তার কেবল একজন ব্যক্তির মুক্তি হরণ নয়, বরং বাউল ও লোকজ দর্শনের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আবুল সরকারের ভক্ত ও অনুসারীদের মতে, রূপক অর্থে আধ্যাত্মিক ভাবধারা প্রকাশের বিষয়টিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি সাজানো হয়েছে।

বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেখানে মাজার ও বাউল গান প্রায়শই মব ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছে, সেখানে আবুল সরকারের দীর্ঘ কারাবাস বাউল সাধকদের জন্য এক চরম নিরাপত্তাহীনতার বার্তা দিচ্ছে বলেও ওয়ানম্যান নিউজরুমকে বলেছেন একাধিক আধ্যাত্মিকতাচর্চাকারী শিল্পী।

মন্তব্য করুন

Designed with WordPress

Discover more from One-man Newsroom বাংলা

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading