![]() |
| তৃপ্তি শাহানা |
৩০ এপ্রিল ২০১৪।
বিকেলের দিকে ফেসবুকে ঢুকতেই চোখ আটকে যায় কার জানি শেয়ার করা মিডিয়া বার্তার একটি সংবাদে। যাতে জানানো হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে
স্ট্যাটাস দেয়ায় চাকরি হারিয়েছেন এশিয়ান টিভির যুগ্ম বার্তা সম্পাদক তৃপ্তি
শাহানা। নড়েচরে বসলাম। পুরো প্রতিবেদনটি পরে জানলাম, গত ২৬ এপ্রিল ফেসবুকে
একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তৃপ্তি। তিনি লিখেছিলেন, ‘মিডিয়ার অবস্থা কি? কি
চলছে টিভি চ্যানেলগুলোতে? কি করছেন মালিক পক্ষ? প্রতি মাসের বেতন পরের
মাসের শেষে দিচ্ছেন। কোনো মাসে আবার দিচ্ছেন অর্ধেক। অফিসে পিক বন্ধ। রাত
১২:৩০ -তে ড্রপ দেয়া হয়; তা’ও যেদিন চেয়ারম্যান বা এমডির পারিবারিক
অনুষ্ঠান থাকে সেদিন ড্রপের নিশ্চয়তা থাকে না। কারণ গাড়ি সবগুলোই ব্যস্ত
থাকে তাদের কাজে। মালিকপক্ষের কোনো প্রোগ্রাম থাকলে তার নিউজ আবার দিতে হবে
মাষ্ট।’ তৃপ্তি আরো লিখেছিলেন, ‘কাজ করতে এসেছি বলে তো নিজেকে বিক্রি করে
দেই নাই। মালিক পক্ষ যদি ভেবে থাকেন কিছু টাকা দিয়ে আমাদের কিনে নিয়েছেন।
তবে মহা ভুল করছেন।’ মূলত এই স্ট্যাটাসটি মেনে নিতে পারেনি এশিয়ানের মালিক
পক্ষ। তাই তাকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
খবরটি পড়ে
কেন জানি তৃপ্তিকে খুব আপন মনে হচ্ছিলো। তিনি আমার গত জন্মের সহোদরা যেন। তাকে খুব বলতে
ইচ্ছে করছিলো- বোন, তুমি বেক্সিমকো ফার্মার এরিয়া ম্যানেজার হও বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট
টিভির জেলা প্রতিনিধি, সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে পারবে কি?
সর্বত্র একই অবস্থা বিরাজমান। প্রতিষ্ঠান, বা তারও নেপথ্যের শক্তি – মানে
মালিক, শ্রমিকের সবটুকুই কেড়ে নিতে চায়। এমনকি মত প্রকাশের স্বাধীনতাটাও।
মজুরীর বিনিময়ে তারা শুধু শ্রম না, পুরো সত্ত্বাই চান। সে তুমি সাংবাদিক
হলেও। ওনারা মূলত কেন সাংবাদিক পোষেন তা’ও নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়। কারা
আজকাল টিভি-পত্রিকায় বিনিয়োগ করেন, কেন করেন- এসব’তো মূর্খেও জানে।
অবস্থাদৃস্টে যা মনে হচ্ছে তা বলতেই আজ লিখতে বসা। আমার ধারণা, মুক্ত সাংবাদিকতা শক্তিশালী না হলে প্রতিষ্ঠানে
কর্মরত সাংবাদিকরাও নিরাপদ হবেন না। মানে, স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশই সব সাংবাদিকের সামাজিক, নৈতিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে; টিকিয়ে রাখতে পারে বস্তুনিষ্ঠ – শুদ্ধ সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতার নামে কোনো গোষ্ঠীর হয়ে তথ্য ত্রাস, বিভ্রান্তি বা প্রপাগান্ডা তৈরী যে অপ-সাংবাদিকতা; তা কিন্তু সাধারণ মানুষও বোঝে। যে কারণে গণআস্থা হারাচ্ছে বাজারী সংবাদমাধ্যমগুলো, সর্বোপরী পুরো সাংবাদিক সমাজ। এ সংকট বা সমস্যাটি কিন্তু বৈশ্বিক। যার মূলে রয়েছে জার্নালিজম আর ক্যাপিটালিজম’র সাংঘর্ষিক সহাবস্থান। এই দুটি ইজম ক্রমাগত পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। যদিও মুক্তবাজার অর্থনীতির এ যুগে পুঁজিদাসের সংখ্যাই বেশী, তাই সে’ই পেরে ওঠে। তার সাথে আপোস করে সাংবাদিকতাকে কতটা শুদ্ধ বা বস্তুনিষ্ঠ রাখার সুযোগ আছে, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতেই পারে। আমিও খুঁজেছি, আর বুঝেছি – এ নিয়ে ভেবে লাভ নেই। কারণ সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে আপোস নয়, যুদ্ধই করতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশের অসংখ্য সাংবাদিক শুদ্ধ সাংবাদিকতাচর্চা শক্তিশালী করার এ যুদ্ধে সক্রিয় হয়েছেন। কেউ মূলধারা বাজারী মিডিয়ায় থেকে, কেউ স্বাধীনভাবে। মুক্ত সাংবাদিকতাচর্চার প্রয়োজনীয়তাটা অন্তত টের পেয়েছেন অনেকে।
যারা নিবিড়ভাবে বিষয়গুলো খেয়াল করছেন তারা জানেন, আজ পুঁজি
ও প্রযুক্তি সংবাদকে পণ্য করে তুলেছে পুরো মাত্রায়, আর বিপন্ন করে তুলেছে
সাংবাদিকতা। এরই মধ্যে পুঁজিপুষ্ট মেইনস্ট্রীম মিডিয়ায় থেকেও অল্টারনেটিভ মিডিয়ায় পুঁজির ভিত কাঁপানো কথা বলা মানুষের সংখ্যা হাতেগোনার মতোই বলা যায়। এর ওপরে তৃপ্তির ওই ঘটনায় এ দেশীয় বাজার সাংবাদিতায় যে ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পরার কথা, তা’ও যে কেউ কেউ অতিক্রম করতে পারছেন – সেটাই আশার কথা।
![]() |
| সাইফ ইবনে রফিক |
***
তুমুলে। ফেসবুকে এ ইস্যুতে বেশ গণমাধ্যমকর্মিদের পক্ষেই সোচ্চার ছিলেন কবি ও
সাংবাদিক সাইফ ইবনে রফিক। হটাৎ তিনি স্ট্যাটাস দিলেন- “হাসপাতালে সাংবাদিক
প্রবেশ নিষিদ্ধকে আমি স্বাগত জানাই। রানা প্লাজায় উদ্ধারকর্মীরা একটা ফুটো
করার আগেই যদি কেউ টেলিভিশনের বুম ঢুকিয়ে দিয়ে আটকাপড়াদের জিজ্ঞাসা করে
থাকে, আপনার অনুভূতি কি? তাদের জন্য পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আমি লজ্জ্বিত।
যে কোনো দুর্ঘটনা মোকাবেলার আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড হইলো প্রথমে একটা
হলুদ টেপে ‘ডোন্ট ক্রস দ্যা লাইন’ দিয়ে জায়গাটা ঘিরে ফেলা। ব্যবস্থাপনার এই
ব্যর্থতার সুযোগেই প্রতিযোগী মিডিয়ার ক্যামেরা ঘটনাস্থলের ভিতরে ঢুকে পড়ে।
একই প্রতিযোগী মানসিকতার জন্যই বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সময় সাংবাদিকরা নিজের
অজান্তেই বিদ্রোহের মুখপাত্র হয়ে যান। আর হাসপাতালে সাংবাদিক কেন, ভিজিটিং
আওয়ার ছাড়া’তো রোগীর কোনো অ্যাটেডেন্টেরও ঢোকার কথা না। আবারও সেই
ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রসঙ্গ। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের
দুর্বলতার সুযোগে সেখানে সাংবাদিকরা ঢুকছে। জনগণের পক্ষে প্রশ্ন করার
সুযোগে ঢুকছে অপসাংবাদিকতাও। তবে সাংবাদিক না ঢোকার সুযোগে হাসপাতালের
ডাক্তাররা যেন প্রশ্নের ঊর্ধে না উঠে যান, এ বিষয়টাও নজরে আনা উচিত।
সিসিটিভি বসানো শুরু করে যে যে উপায়ে নজরদারি বাড়ানো যায়, হাসপাতাল
কর্তৃপক্ষের সেই দিকেও নজর দেয়া উচিত। আশা করি ডাক্তার বন্ধুরা এতে মাইন্ড
করবেন না। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স না থাকলে প্রফেশনালিজমের বিকাশ হয় না।”
ছোটোলোকদের জায়গা। এইটা আজকে বুঝলাম। এখানে নিজের অবস্থান নিয়ে ইনফেরিওরিটি
কমপ্লেক্সে ভোগা ও টাকা থাকলেই কেনা যায় মানসিকতার লোকদের সুচিকিৎসা হওয়া
দরকার।’
দ্রুত তারকা বানায়, কিন্তু সাংবাদিক বানায় খুব কম জনকেই।’ তাকে সহমত জানিয়ে
আরেক সাংবাদিক মন্তব্য করেন ‘প্রিন্টমিডিয়ার অনেক বড় ভাই টিভিতে ঢুকে
হারিয়ে গেলেন। খুব মিস করি এমন অনেকের লেখা।’
সাংবাদিকতায় বিরল। এর মধ্যে প্রথম স্ট্যাটাসটি অবশ্য তৃপ্তি ট্রাজেডিরও আগের।
***
![]() |
| মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী |
২৬ মে ২০১৪।
চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা
সরোয়ার ফারুকী এক স্ট্যাটাসে বলেন, আমাদের মেনস্ট্রিম মিডিয়াগুলার সত্য গোপনীকরণ /
মিথ্যাচার / ধান্দা ফিকির দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। মেইন সুইচে হাত দিতে
পারলে আপনি উনাদের দিয়ে যে কোন কিছু লিখিয়ে নিতে পারবেন। সেটা এমনকি দেশের
জন্য আত্মঘাতী হলেও। এদের উপর ভর করেই দুষ্ট লোকেরা এবং বড় বড়
ইমপেরিআলিস্টরা তাদের দরকার মতো জনমত বানায়। এইসব নিয়ে চমস্কি সহ মহান
কুতুবেরা বিস্তর লিখেছেন। আমি আশা নিয়ে তাকিয়ে আছি বিকল্প
সাংবাদিকতার দিকে। ফেসবুক, ব্লগ সহ যতো রকম মাধ্যম আছে এইসব কাজে লাগিয়ে
আমরা যদি আমাদের নাগরিক সাংবাদিকতার মান বাড়াতে পারি তাহলে রক্ষা। কেবল
“আওয়ামী-বিএনপি পারস্পরিক নিধন প্রকল্প” হিসাবে এর ব্যবহার সীমিত রাখলে
আমরা কেবল “থাকিবো বাঙালি হয়ে, মানুষ হইবো না।”
ভারতীয় ছবি
আমদানি, কর কাঠামো, রিলিজ পদ্ধতি, দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব কি, কিভাবে
পরিবেশন আর প্রদর্শন নেটওয়ার্ক-ও একসময় হাতছাড়া হবে, সাফটা চুক্তি বা যৌথ
প্রযোজনাকে কিভাবে হাতিয়ার বানানো হচ্ছে, কিভাবে করলে সত্যিকারের
ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতা সম্ভব, ভারতে আমাদের ছবি চালানো আদৌ যাচ্ছে কিনা,
বাংলাদেশে বিদেশী ছবি কত পার্সেন্ট স্ক্রিনিং করা যায়, এটা মনিটরিং করবে
কে- এই সব বিষয়ে “ফেসবুকেই” বিস্তারিত লেখার কথাও জানান জনপ্রিয় এই নির্মাতা।
***
জাহিদ রুমান : বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সাংবাদিকতা প্রবর্তিত হয়েছে রাজনীতিবিদদের হাতে। রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে গণমাধ্যম ব্যবহৃত হয়েছে। এরপরে রাজনৈতিক সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পক্ষে কথা বলা হয়েছে। এখন চলছে কর্পোরেট মালিকানার যুগ। ‘কর্পোরেট মালিকানা’র সঙ্গে ‘বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা’র যে দ্বন্দ্ব তার ফলাফল কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
আরেফিন সিদ্দিক : কর্পোরেট মালিকানার বিষয়টি এখন সময়ের সাথে সাথে বিস্তৃতি লাভ করছে। গণমাধ্যমে বিনিয়োগ এখন একটি বড় ধরনের বিনিয়োগের পর্যায়ে চলে গেছে। বড় বিনিয়োগের কারণেই কর্পোরেট মালিকানার বিষয়টি এসেছে। এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন যে, কর্পোরেট মালিকানার সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ সাংবদিকতার যে দ্বন্দ্ব কীভাবে তার নিরসন করা যায়। এটা খুবই স্বাভাবিক, একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কাজ করবে। কিন্তু আমি মনে করি কর্পোরেট মালিকানায় থাকা সত্ত্বেও গণমাধ্যমের একটি গ্রহণযোগ্য বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা যায়। যদি কর্পোরেট কর্তৃপক্ষ যদি অন্ততপক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেন যে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্র সেখানে সম্পাদক, সাংবাদিকরা কাজ করবেন তাদের ওপর আর কোনো কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ আনা যাবে না। যেমন আমি সবসময় বলব সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে আনা ঠিক না। বস্তুনিষ্ঠতা ও সাংবাদিকতার বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন। প্রতিদিন একটি পত্রিকা এবং তার সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠতার পরীক্ষা দিতে হয়ে এবং এই পরীক্ষায় তাদের পাশ করে আসতে হয়।
***
সম্পদ পাহারা বা স্বার্থ রক্ষায় সাংবাদিক পোষার প্রবণতা বিকশিত হওয়ার পর থেকে গণমাধ্যমের সংখ্যা ও প্রযুক্তিগত মান ক্রমাগত বাড়ছে। পুঁজিবাদী গণমাধ্যমগুলোর সুবাদে সাংবাদিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নও হচ্ছে বেশ। তবে সাংবাদিকতার মান ক্রমাগত কমছে। কমছে গণমানুষের আস্থাও। গণমাধ্যমগুলো মূলত পুঁজিবাদী প্রচারযন্ত্রের মতোই কাজ করছে। পুঁজিবাদ বা বাজারের হাত থেকে সাংবাদিকতাকে রক্ষায় মুক্ত সাংবাদিকতাচর্চা শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি আর গঠনমূলক আলাপেরও সময় এসে গেছে। ‘খাঁটি’ শিক্ষিত সাংবাদিকরা, মানে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে মাস্টার্স-পিএইচডিধারীরা এ ব্যাপারে আরো সোচ্চার হবেন আশাকরি। তারাও যখন এর স্বপক্ষে কলম ধরবেন, কথা বলবেন; তখন মুক্ত বুদ্ধিচর্চায়ও নবমাত্রা যুক্ত হবে নিশ্চয়ই।
‘অনেকেই বলছেন এখন তথ্য ব্যবসার যুগ। সাংবাদিকতা ম্রিয়মান। বিষয়টা সাংবাদিকদের অনেকেই বুঝতে পারলেও তারা কিছুই করতে পারছেন না। নতুন পত্রিকা বেরুচ্ছে, নতুন টিভি কেন্দ্র চালু হচ্ছে – সাংবাদিকতার মানসে নয়, শুধু মুনাফার লক্ষ্যে। মুনাফা আর্থিক এবং ব্যবসায়িক ও প্রভাব বিস্তার। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে ব্যবসায়িক সুবিধা গ্রহণ বা নিজের সুবিধা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করা এখন মিডিয়া মালিকের প্রধান উদ্দেশ্য। এটাকে তাই বলা হচ্ছে তথ্য ব্যবসা। এতে পাঠকও বিভ্রান্ত হচ্ছেন।’ লেখক ও সাংবাদিক চিন্ময় মুৎসুদ্দীরের ‘তথ্য ব্যবসা কতটা সাংবাদিকতা’ প্রবন্ধে উঠে এসেছে এই কথাগুলো।
![]() |
| চিন্ময় মুৎসুদ্দী |
***
![]() |
| তৌফিক ইমরোজ খালিদী |
***
০৬ জুন ২০১৪।
ফেসবুক ও ব্লগের সুবাদেই চোখে পরে আরেকটি সংবাদ। শিরোনাম –‘৪০ সংবাদকর্মীকে ছাঁটাই করলেন অভিনেত্রী জয়া’
। পুরো ঘটনাটি পড়ার পর মেজাজটাই বিগড়ে গেলো। জয়ার প্রতি করুণা হলো
খানিকটা। প্রথম জীবনে তিনি সাংবাদিকই ছিলেন। এরপর টিভি অভিনেত্রী থেকে
ফিল্ম স্টার। শুনেছি ইদানীং নাকি তিনি তরুণ নির্মাতাদের ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজও
শেখান। সে বিষয়টি অবশ্য এখানে অপ্রাসঙ্গিক। অন্য মেকানিজমের ব্যাপার। তবে
সংবাদকর্মিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন একটি প্রতিবেদন বাজারী সাংবাদিকতার
পুরুষতান্ত্রিক প্রবণতার নমুনা হয়ে ঝুলছে দেখে আঁতকে উঠলাম। মানে ওই ঘটনায়
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এটিএন টাইমস ডটকম’র পরিচালনা পর্ষদে সৈয়দ রুহুল হক,
সৈয়দ সামিউল হক আর চন্দন সিনহাও রয়েছেন। কিন্তু সর্বত্র শিরোনাম হলেন শুধু
জয়া আহসান।
আরো কতটা পরিপক্ক হলে আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো এ প্রবণতাটুকু অন্তত এড়াতে পারবে জানি না। বিশেষত অনলাইন পত্রিকা বা পোর্টালগুলো তাদের ‘হিট’ বাড়ানোর জন্য যে ধরণের সংবাদ প্রচার করছে তা অনলাইন সাংবাদিকতাকে চটি সাংবাদিকতার মত একটি উপমা উপহার দিয়েছে। এ জাতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের একদিনের সর্বশেষ
সংবাদগুলোর শিরোনামগুলো তুলে ধরছি –
* বেড়াতে এসে হোটেলরুমে নববধূ গণধর্ষণের শিকার
* ২ মেয়েকে ভারতের পতিতালয়ে বিক্রি করেছে মা !
* ফেসবুকে গৃহবধূর অশ্লীল ছবি পোষ্ট, প্রযুক্তি আইনে মামলা
* শারীরিক সম্পর্ক ও প্রেমের বলি!
* ইলেকট্রনিক মিটার ক্রয়ে লুটপাট ডেসকোর দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র
* বিয়ের ২৪ ঘণ্টা পর স্ত্রীকে যৌনপল্লিতে বিক্রি!
* বরগুনায় আরেক পরিমল-পান্না মাস্টারের উত্থান !
* পুত্রবধূকে পর পর দুই রাত ধর্ষণ!
* বৃদ্ধের লালসার শিকার ৩য় শ্রেণীর ছাত্রী গর্ভবতী!
![]() |
| তারিখ : ৬ অক্টোবর ২০১৩ |
কোথায় গিয়ে ঠেকলে সাংবাদিকরা এ জাতীয় সংবাদ অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকে তা কি
ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন আছে? শুধু স্ক্রীনসটটি রেখে যাচ্ছি – নমুনা হিসাবে।
***
পরিবেশন করে না। সাম্প্রতিক উদাহরণের জন্য যমুনা টিভির অনুষ্ঠান
‘ইনভেস্টিগেশন ৩৬০ ডিগ্রি’-ই সামনে রয়েছে। সমাজজীবনের নানা ধরনের অন্যায়,
কুশাসন, কুপথের নানান কুকীর্তি অনুসন্ধান রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে তুলে ধরার
এই অনুষ্ঠানটি প্রতি শুক্রবার রাত নয়টা ২০ মিনিটে যমুনা টেলিভিশনে প্রচারিত
হয়। সিনিয়র সাংবাদিক সুপন রায়ের উপস্থাপনা ও পরিকল্পনায় অনুষ্ঠানটিতে
প্রচারিত বিভিন্ন আলোচিত ইস্যুর মধ্যে অন্যতম ছিলো ‘লাইট, ক্যামেরা,
এ্যাকশন’ শিরোনামের একটি পর্ব।
ওগুলো দেখার পর একবার মনে হয়েছিলো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার দিন বোধহয় একেবারেই শেষ। নইলে সুপন রায়ের মত একজন সিনিয়র সাংবাদিকের মনিটরিংয়েও এমন চটকদার সংবাদ বের হয়! এই রিপোর্টটি দেখার পর প্রিয় ওই সাংবাদিকের কাছে খুব জিজ্ঞাসা ইচ্ছে হয়েছিলো – আপনাকেও কি সর্বস্ব খোয়াতে হয়নি? যমুনার প্রত্যেক সাংবাদিকের সবটুকু সময় ও চিন্তাই কি কিনে নেয়নি নুরুল ইসলাম বাবুল। প্রতিনিয়ত কি সে তার ‘সম্বাদিকদের’ সর্বস্ব লোটে না? এ নিয়ে কোথায় প্রতিবেদন প্রকাশ করবে কে?
***
এক গণমাধ্যম কর্মির আত্মহত্যার খবর পেয়ে। এরপর থেকে কি কি জানি ভাবার
চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শোকাচ্ছন্ন মস্তিষ্ক কেন যেন মোটেই কাজ করেনি। প্রয়াত বাবর
ভাই, মানে বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিক জি এম বাবর আলীর সাথে শেষ দেখা হয়েছিলো বরিশালের
সদর রোডের হাবিব ভবনে- তার অফিসে। মানে বন্ধ হয়ে যাওয়া আমার দেশ পত্রিকার স্থানীয় কার্যালয়ে। কবে- তা ঠিক মনে নেই। তবে
মনে আছে তার স্বভাব সুলভ রসিকতা আর দিল খোলা হাসি। তার স্নেহও এ প্রান
ছুঁয়েছিলো নিশ্চিত। নইলে কেনই বা আজও তার কথা মনে পড়লে কিছুই ভালো লাগে না।
![]() |
| আত্মহত্যার দু’দিন আগে ফেসবুকে নিজের এই পুরানো ছবিটি আপলোড করেছিলেন বাবর আলী |
বাজার সাংবাদিকতার নোংরামিই কি কেড়ে নেয়নি তাকে? তার এই অপমৃত্যুর পর আমার দেশ’র এক সহকর্মি লিখেছিলেন, ‘অপমান, ক্ষোভ আর অর্থ ও পরিচয় সংকটের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তিনি চলে গেলেন।’











এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান