বিশ্বাসের বৈচিত্র: ১ম পর্ব

শরীফ খিয়াম আহমেদ

আল্লাহ, তাঁর বাণী, কিংবা দ্বীনকে কোনো মানুষ, বা যে কারো পক্ষে অবমাননা করা সম্ভব, এবং সেটা ঠেকাতে তিনি নিজেরই সৃষ্টির মুখাপেক্ষী—এমনটা যারা বিশ্বাস করেন; তাদের কর্মকাণ্ড দেখে কবে জানি মনটা গেয়ে উঠেছিল, “ওহে ধর্মপ্রাণ যদি আত্মজ্ঞান/অসহিষ্ণু করে বাড়ায় অহং/জানবেন আজাজিল স্বয়ং/একইপথে হয়েছে শয়তান।” কারণ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বারবার বলেছেন, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, বরং সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী।

সূরা আল-ইখলাসের দুই নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আল্লাহ হচ্ছেন সামাদ,” অর্থাৎ “আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।” সূরা ফাতিরের ১৫ নম্বর আয়াতে লেখা রয়েছে, “ওহে মানবজাতি! তোমরা তো আল্লাহ্‌র মুখাপেক্ষী, আর আল্লাহ্‌, তিনি স্বয়ংসমৃদ্ধ, পরম প্রশংসিত।” অর্থাৎ তিনি কারো প্রশংসারও মুখাপেক্ষী নন। “নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না কোন উদ্ধত অহংকারীদেরকে,” ২৩ নম্বর আয়াতে এমন বাক্য থাকা সূরা হাদিদের ২৪ নম্বর আয়াতের শেষাংশেও বলা হচ্ছে, “নিশ্চয় আল্লাহ্ অভাবমুক্ত, চির প্রশংসিত।” সর্বজ্ঞানী মহাপ্রাণ অনুসারীদের এই বিষয়ে বারবার বলেছেন। একই সূরার প্রথম আয়াতে বলা রয়েছে, “আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” সূরা ইবরাহীমের ১৯ নম্বর আয়াতের শেষ বাক্যে বলা হয়েছে, “তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে নিশ্চি‎হ্ন করতে পারেন এবং অস্তিত্বে আনতে পারেন নতুন সৃষ্টি।”

তবুও যারা মনে করেন, মানুষের পক্ষে আল্লাহকে অবমাননা করা সম্ভব, তারা কি নেহাতই জন্মসূত্রে মুসলমান; যারা কখনো কোরআন বোঝার তাগিদই অনুভব করেনি? “তিনি পবিত্ৰ, মহিমান্বিত এবং তারা যা বলে তা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে,” এমনই লেখা রয়েছে সূরা বনী-ইসরাঈলের ৪৩ নম্বর আয়াতে। অর্থাৎ তাঁর মহিমা মানবীয় বৈশিষ্টের ঊর্ধ্বে। সূরা আল-আন’আমের ১০৩ নম্বর আয়াতে এমনও বলা হয়েছে যে, “দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না, কিন্তু দৃষ্টিসমূহ তাঁর আয়ত্বে আছে এবং তিনিই সূক্ষদর্শী; সম্যক পরিজ্ঞাত।”

বাঙালী মুসলিম হিসেবেই ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা কমানো যে কোনো মতবাদের বিরোধীতা করি। কারণ সহনশীলতা আল্লাহর গুন, শয়তানের নয়। প্রত্যেক পাঠকই মনে রাখবেন, এই ধর্মগ্রন্থ শুধু আলেম-ওলামাদের পাঠের জন্য দেওয়া হয়নি। এটা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য পাঠ্য। এখানে আপনার জন্য যে বার্তা রয়েছে সেটা পেতে হলে আপনাকে এটা পড়তেই হবে। নয়তো বন্ধুর কাছে কোনো বইয়ের গল্প শোনার মতো হয়ে যাবে বিষয়টা। আবার মনে করেন, আপনারা তিন বন্ধু একইসঙ্গে বসে সেই গল্পটাই শুনলেন। তখনও আপনাদের প্রত্যেকের তৃপ্তি ও প্রাপ্তি কি একই রকম হবে? মানুষের অজ্ঞানতা সম্পর্কে আল্লাহ পুরোপুরি অবগত। তিনি জানেন, কোন আয়াতটি কে কী অর্থ করবেন। নিজের দ্বীনকে পূর্ণকারী এই মহাগ্রন্থের সূরা আয-যুমারের ২৭ ও ২৮ নম্বরে আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আমি এ কোরআনে মানুষের জন্যে সব দৃষ্টান্তই বর্ণনা করেছি, যাতে তারা অনুধাবন করে; আরবী ভাষায় এ কোরআন বক্রতামুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে।” সূরা আন-নিসার ১৭৩ নম্বর আয়াতের একটি বাক্যে তিনি বলছেন, “কিন্তু যারা উন্নাসিকতা প্রদর্শন করে ও অহঙ্কার করে, তাদেরকে তিনি মর্মন্তুদ শাস্তি প্রদান করবেন।”

সূরা আল-মায়েদার সাত নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন; যার কিছু আয়াত সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, এগুলি কিতাবের মূল অংশ; যার অন্যগুলি রূপক; যাদের মনে বক্রতা আছে, তারা ফিতনা (বিশৃংখলা) সৃষ্টি ও ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে যা রূপক তার অনুসরণ করে। বস্তুতঃ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলে, আমরা এগুলোতে ঈমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে; এবং জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা ছাড়া আর কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।” একই সূরার ৬৪ নম্বর আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, “তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা তাদের অনেকের ধর্মদ্রোহিতা ও অবিশ্বাসই বৃদ্ধি করবে। তাদের মধ্যে আমি কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করেছি। যতবার তারা যুদ্ধের অগ্নি প্রজ্বলিত করে, ততবার আল্লাহ তা নির্বাপিত করেন এবং তারা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়। বস্তুতঃ আল্লাহ ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্তদেরকে ভালবাসেন না।”

২০২৫ সালের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ভিন্ন ধর্মাচারের প্রতি অবজ্ঞা ও অসম্মান প্রকাশের আজাদীকে আপনি বাকস্বাধীনতা ভাবতেই পারেন। আবার আপনার পাশেরই কেউ এটাকে কুশিক্ষা বা অজ্ঞানতার ভেবে নিতে পারে। কারণ প্রতিটি মত আমাদের ধারণা মাত্র। যাতে লেখা থাকে আমরা কী শিখেছি, বা জীবনের পাঠশালায় কে কেমন ছাত্র। প্রতিটি মানুষ নিজ বোধ অনুযায়ী তা বুঝে নেয়। এক্ষেত্রে সবাই একভাবে ভাববেন না, সেটাই স্বাভাবিক। ব্যক্তিভেদে মনে নানা দ্বন্দ্ব তৈরী হবে, কোথাও ধন্দ। তবে অভিমত ও অসূয়া সর্বত্রই আলাদা; যেমন কোনোভাবেই এক নন ধার্মিক ও ধর্মান্ধ। দয়াময়, আমাদের ক্ষমা করুন। আপনিই সেই পরম করুণাময়, যিনি বারবার ক্ষমা করেন।

এসব নিয়ে ভাবতে গেলেই মনে পড়ে কোরআনের দীর্ঘতম সূরা বাকারার শুরুর দিকের পাঁচটি আয়াত। “৮. মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা বলে ‘আমরা আল্লাহ্‌ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করি’। কিন্তু তারা (প্রকৃতপক্ষে) বিশ্বাস করে না। ৯. আল্লাহ্‌ ও বিশ্বাসীদের তারা প্রতারিত করতে চায়, কিন্তু (এর দ্বারা) তারা শুধুমাত্র নিজেদের প্রতারিত করে অথচ তারা (তা) বুঝতে পারে না। ১০. তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি; এবং আল্লাহ্‌ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন; তারা (ভোগ করবে) নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাবাদী। ১১. আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, তারা বলে, ‘আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।’ ১২. সাবধান! এরাই ফাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা বুঝে না।”

কোরআনের আলোকে সমকালকে বোঝার চেষ্টা করতেই দেখি বহু আয়াতে এটা স্পষ্ট যে, মানুষের কথা, কটুক্তি, ব্যঙ্গ, অশ্রদ্ধা, অবিশ্বাস, বা বিদ্রোহ কখনোই আল্লাহর ক্ষতি বা তাঁকে অপমান করতে পারে না। এমনকি সমগ্র মানবজাতি অবিশ্বাসী হলেও আল্লাহর মহিমা তাতে একটুও কমে না। সূরা আলে-ইমরানের ১৭৬ নম্বর আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে, “যারা কুফরীতে দ্রুতগামী, তাদের আচরণ যেন আপনাকে দুঃখ না দেয়। তারা কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” সূরা আন’আমের ১০৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে, “তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের প্রার্থনা করে, তাদেরকে তোমরা গালি দেবে না। কেননা, তারা বৈরীভাবে অজ্ঞানতাবশতঃ আল্লাহকেও গালি দেবে।” সূরা ফুস্‌সিলাতের ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “যে সৎ কাজ করে সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। আর আপনার রব তার বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুমকারী নন।” এছাড়াও সূরা আল-ইনসানের ২৪ নম্বর আয়াতে লেখা রয়েছে, “তাহলে তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং তাদের মধ্যে থেকে কোন পাপিষ্ঠ বা অস্বীকারকারীর আনুগত্য করো না।”

যে ঘটনার প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় বসে এই লেখাটি আমাকে লিখতে হচ্ছে, তার সূত্রপাত হয়েছিল মাসের প্রথম সপ্তাহে মানিকগঞ্জের একটি পালাগানের আসরে। সেদিন যা হয়েছিল, সেই আলাপে একটু পরই আসছি। আগে টুকে রাখি তৃতীয় সপ্তাহে কী হয়েছে। মাদারীপুরের একটি গানের আসর থেকে বাংলাদেশ বাউল সমিতির সভাপতি আবুল সরকারকে রাজৈর থানার পুলিশের সহায়তা তুলে আনে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। পরে জেলার ঘিওর থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ‘ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহকে নিয়ে কটুক্তিমূলক মন্তব্য’করার অভিযোগ আনা হয়। সেই অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখিয়ে স্থানীয় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তখন আদালত প্রাঙ্গণে মানিকগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তাওহিদী জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিলেন মুসল্লিরা। মহারাজ উপাধি পাওয়া এই বাউল আবুল সরকারের যে বক্তব্য ধরে মামলা হয়েছে, তার ক্লিপ এবং এই বিক্ষোভের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কিছু মানুষ মুক্তি দাবি করলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় আবুল সরকারের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ঝড় ওঠে।

সব বাউলকে হত্যা, এবং তাদের চামড়া ও আখড়া তুলে নেওয়ার দাবিতে সোচ্চার হওয়া কট্টর মুসলিমরা এরপর আবুল সরকারের মুক্তি দাবি জানানো, অর্থাৎ তাঁর পক্ষে রাজপথে নানা মানুষদের মারধর শুরু করেন। প্রকাশ্যে বাউল জবাই করার হুমকী দেওয়া শ্লোগানে মুখর মিছিলও দেখেছে বিভিন্ন জেলা। এরই মধ্যে আবুল সরকারের পক্ষে কথা বলার দায়ে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারকেও প্রকাশ্যে হত্যার হুমকী দিয়েছেন মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী নামের একজন ইসলামি স্কলার। আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে ফরহাদ বলেছিলেন, “তিনি কোনো ভুল করেননি। বরং যারা তাকে অভিযুক্ত করেছেন, তাদের সাংস্কৃতিক জ্ঞানই দুর্বল।”

গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছিলেন তিনি। মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে, অর্থাৎ গত ১৫ মাস ধরে দেশজুড়ে ইসলাম রক্ষার নামে লোকজ আধ্যাত্মিকতাচর্চার উপরে যে ধারাবাহিক পীড়ন চলছে, চলতি মাসে তা পুনরায় আলোচনায় এনেছে বাংলাদেশ বাউল সমিতির সভাপতি আবুল সরকারকে কারাবন্দী করার ঘটনা। যা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, গত জানুয়ারিতে প্রকাশ্য জনসভায় কী করে ‘কতলের’পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নর।

সবাইকে শুধু ‘দাওয়াত’ করে পথে আনা যাবে না মন্তব্য করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নর সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী বলেছিলেন, “দাওয়াত দিয়া সব মানুষ হেদায়েত হবে… (আরবিতে কোরআনের আয়াত উল্লেখ করে) তাহলে কেসাসের কথা, খুনের পরিবর্তে খুন- আল্লাহ কেন এই আয়াত নাজিল করল। আল্লাহ জানেন তার কিছু বান্দা আছে এরা চতুস্পদ জানোয়ারের চেয়ে, গরুর দলের চেয়ে খারাপ। এগুলারে পিডান লাগবে, কতল করা লাগবে, এগুলারে মাইর ছাড়া কোনো উপায় নাই। এগুলা দাওয়াতে ফেরবে না।” ইসলামী আন্দোলনের এই প্রেসিডিয়াম সদস্য আরো বলেন, “যে সমস্ত ইসলামপন্থিরা বলে দাওয়াত দিয়া সব হেদায়েত হবে, এটা সম্পর্ণ কোরআন-হাদিস বিরোধী কথা। আপনাকে প্রয়োজনে মারতে হবে। আপনাকে লড়তে হবে প্রয়োজনে।”

পুনরায় মূল আলোচনায় ফিরি। কোরআন শুধু মুসলিমদের নয়, সব কিতাব অনুসারী, তথা ধর্ম ও মতের মানুষকে তাদের কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেয়, এবং সুখবর। সূরা বাকারার ৬২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট বলছেন, “যারা ঈমান আনে (এই কোরআনে), এবং যারা ইহুদীদের (ধর্মগ্রন্থ) অনুসরণ করে, এবং খ্রিস্টান, এবং সাবিয়ান, যারাই ঈমান আনে আল্লাহ্‌র (একত্বে), শেষ (বিচার) দিবসে এবং সৎ কাজ করে, তাদের জন্য পুরষ্কার আছে তাদের প্রভুর নিকট। তাদের কোন ভয় নাই তারা দুঃখিতও হবে না।”একই সূরার ১৯১ নম্বর আয়াতের বরাত দিয়ে মতাদর্শিক হত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করেন অনেক ডানপন্থী মুসল্লি। যেখানে বলা আছে, “আর যেখানে পাও, তাদেরকে হত্যা কর এবং যেখান থেকে তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে, তোমরাও সেখান থেকে তাদেরকে বহিষ্কার কর। ফিতনা হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর।” এখানে তারা ফিতনার অর্থ করে ধর্মদ্রোহিতা, অরাজকতা নয়। যদিও ঠিক আগের আয়াতেই বলা হয়েছে, “আল্লাহর ওয়াস্তে লড়াই কর তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।”পরের আয়াতে আল্লাহ আরো বলেন, “আর মাসজিদুল হারামের (কা’বা শরীফের) নিকট তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো না; যতক্ষণ না তারা সেখানে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে। যদি তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তবে তোমরা তাদের হত্যা কর।”

অর্থাৎ আল্লাহ মূলত আত্মরক্ষামূলক হত্যা সমর্থন করছেন; অন্তত আমার কাছে তেমনটাই মনে হয়েছে। কারণ বিদ্যমান বিশ্বাসের বৈচিত্র্যও আল্লাহর ইচ্ছাকৃত। সূরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে তিনি বলছেন, ”হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার।” কোরআন অনুযায়ী, ধর্ম বা মত চাপিয়ে দেওয়াও ইসলাম বিরুদ্ধ প্রবণতা। সূরা ইউনুসের ৯৯ ও ১০০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর যদি তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তাহলে বিশ্বের সকল লোকই বিশ্বাস করত; তাহলে তুমি কি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের উপর জবরদস্তি করবে? অথচ আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারও ঈমান আনা সম্ভব নয়; আর আল্লাহ নির্বোধ লোকদের উপর (কুফরির) অপবিত্রতা স্থাপন করে দেন।”

সূরা হুদের ১১৮ ও ১১৯ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, “তোমার প্রভু যদি ইচ্ছা করতেন তবে তিনি সমগ্র মনুষ্য সম্প্রদায়কে একই জাতিতে পরিণত করতে পারতেন। কিন্তু তারা মতভেদ থেকে বিরত থাকবে না। তোমার পালনকর্তা যাদের ওপর রহমত করেছেন তারা বাদে সবাই চিরদিন মতভেদ করতেই থাকবে এবং আল্লাহ এজন্যই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এই নির্দেশ জারি হয়েছে – অবশ্যই আমি জাহান্নামকে জ্বিন ও মানুষ দ্বারা একযোগে পূর্ণ করব।” আবার সূরা আন-নাহালের ১৬ নম্বর আয়াতেও উল্লেখ রয়েছে, “যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তাহলে তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। আর তোমরা যা করো, সে বিষয়ে অবশ্যই তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।”

হাদিস অনুযায়ী, “ইসলাম সহজ ধর্ম, কঠোরতা বরদাস্ত করে না,” উল্লেখকারী রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলে গিয়েছেন, “নিশ্চয়ই এই ধর্ম সহজ, আর যে কেউ এতে বাড়াবাড়ি করতে চায়, ধর্ম তাকে পরাভূত করবে।” বিদায় হজের ভাষণেও তিনি বলেছিলেন, “ধর্মে বাড়াবাড়ি করো না, কারণ এগুলো আগেকার জাতিগুলোকে ধ্বংস করেছে।” কোরআনে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে এসেছে। “হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলো না,” এমনটা বলে শুরু হওয়া সূরা নিসার ১৭১ আয়াতের শেষ বাক্যে বলা হয়েছে, “আসমানসূহে যা রয়েছে এবং যা রয়েছে যমীনে, তা আল্লাহরই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতেও উল্লেখ করা হয়েছে, “দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”

সূরা আল-হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “হে বিশ্বাসীগণ! একদল পুরুষ যেন অপর একদল পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হয়, তারা উপহাসকারী দল অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং একদল নারী যেন অপর একদল নারীকেও উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হয়, তারা উপহাসকারিণী দল অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।” আর তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না; কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাকে মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। যারা (এ ধরনের আচরণ হতে) নিবৃত্ত না হয় তারাই সীমালংঘনকারী।”

চলবে..

One response to “ফিতনার রাজনীতি: একটি পাঠ-অনুসন্ধান”

  1. […] পূর্ব প্রকাশের পর […]

Leave a Reply to ধর্মীয় উগ্রতা বনাম লোক-আধ্যাত্মিকতা – One-man Newsroom বাংলাCancel reply

Designed with WordPress

Discover more from One-man Newsroom বাংলা

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading