সচিবালয়ের সাংবাদিক প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, সব ‘প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড’ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।

নতুনভাবে কার্ড ইস্যু করার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো থেকে আবেদন গ্রহণ করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের তিন কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে আজ (২৮ ডিসেম্বর) সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুকে ইংরেজিতে রেখা এক পোস্টে জানিয়েছেন, “ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার (কি পয়েন্ট ইন্সটলেশন) নিরাপত্তা ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সরকার দ্রুতই বিদ্যমান প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডগুলো পর্যালোচনা করবে এবং নতুন অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ইস্যুর জন্য সবগুলো স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ আউটলেটগুলোকে নতুনভাবে আবেদনের আমন্ত্রণ জানাবে তথ্য অধিদপ্তর৷

মধ্যবর্তী সময়ের প্রেস ইভেন্টগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সাংবাদিকদের অস্থায়ী কার্ড দেবে। “সাংবাদিকদের এই অসুবিধার জন্য সরকার দুঃখিত,” উল্লেখ করে প্রেস সচিব তাদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

আগের রাতে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) মো. খোদা বখস চৌধুরী সাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, “সাংবাদিকদের অনুকূলে ইস্যুকৃত অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দ্বারা সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এতদ্বারা বাতিল করা হলো।”

সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সচিবালয়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ জারি করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার ‘প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড’ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আন্দাজ করছি।

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার সবিস্তারে যা লিখেছেন তা হুবুহু পাঠকদের জন্য টুকে রাখলাম এখানে:

কিছু লোক সরকারকে কঠোর হতে বলে আবার সামান্যতম কঠোর হলে গেল গেল রব তোলে। এই দ্বিচারিতা বন্ধ হওয়া জরুরি। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা নিয়ে যথারীতি এই দ্বিচারিতা আবার শুরু হয়েছে। প্রবেশাধিকার সীমিত করার এই সিদ্ধান্তটি খুবই সাময়িক।

একটা বিষয় এখানে পরিষ্কার করা দরকার, কোনো সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাতিল করা হয়নি। কেবল সচিবালয়ের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে। তা-ও খুবই অল্প সময়ের জন্য। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অস্থায়ী পাশ ইস্যু করা হবে।

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শীঘ্রই বিদ্যমান সব প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডই পর্যালোচনা করা হবে এবং নতুন অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড ইস্যু করার জন্য সমস্ত স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের কাছে আবেদন চাওয়া হবে।

এটা এখন ওপেন সিক্রেট, বাংলাদেশ সচিবালয়কে দালালদের হাটবাজার বানিয়ে ফেলা হয়েছিলো। সরকারের সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তে দালাল ছাড়া কারো শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা মনে করি, এটা সাংবাদিকদের কাজ আরো সহজ করবে। এখন সাময়িক অসুবিধা হলেও চূড়ান্ত বিচারে এটা সবাইকে সহযোগিতা করবে। এজন্যই সবার সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।

সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডে রাষ্ট্রের একটা বিপর্যয় হয়েছে এটা মানতে কারো দ্বিধা থাকার কথা নয়। এজন্য উচ্চ পর্যায়ের কমিটিও করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক, সেনাবাহিনীর বিষ্ফোরক বিশেষজ্ঞ দিয়ে একসাথে কোনো ঘটনার তদন্ত করা হয়নি।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী বলেই এই ধরনের কমিটি করা হয়েছে। সাংবাদিকদের দূরে রেখে তদন্ত কাজ চালানো হবে বলে যারা আবোল তাবোল বকছেন এরা মারাত্মক ভুলে আছেন। আমাদের বিশ্বাস, সাংবাদিকরাও বিষয়টি উপলব্ধি করবেন এবং চলমান পরিস্থিতিতে সরকারকে সহযোগতিা করবেন।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন দফায় ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়। আমরা, পেশাদার সাংবাদিকরা, এ ঘটনায় ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছি। যার প্রেক্ষিতে বাতিল হওয়া কার্ড পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।

কোনো সাংবাদিক যদি তাঁর কার্ড বাতিলের বিষয়টি ‘ন্যায়সংগত’ মনে না করেন, তবে লিখিতভাবে কর্র্তৃপক্ষকে জানাতে পারবেন বলে চলতি মাসেই এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল। এমন সময়ের রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ মন্ত্রণালয়গুলোর একটি আবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সব অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড পুনর্বিবেচনার সরকারি সিদ্ধান্ত কেন অযৌক্তিক নয় তা ব্যাখ্যা করেছেন ড. ইউনূসের সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ।

ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, “প্রিয় পেশাদার সাংবাদিক বন্ধুরা উদ্বিগ্ন হবেন না। আপনার কাছে যে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটি আছে সেরকম শত শত কার্ড আছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতে।”

ফয়েজের মতে, “পতিত আওয়ামী লীগ পেশাদার সাংবাদিকদের কার্ড না দিয়ে ও বাতিল করে হয়রানি করলেও বিভিন্ন ভুয়া নিউজ পোর্টাল/ পত্রিকার নামে তাদের নেতাকর্মীদের নামে শতশত কার্ড ইস্যু করেছে। এই কার্ডগুলো একটা একটা করে যাচাই বাছাই করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। আবার সচিবালয়ে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তড়িৎ পদক্ষেপ নেয়া ছাড়াও কোন উপায় নেই।“

তিনিও উল্লেখ করেছেন, “খুব শিগগিরই পেশাদার সাংবাদিকরা তাদের প্রতিষ্ঠানের চাহিদার ভিত্তিতে পাবেন নতুন অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। তবে এরমধ্যে নিশ্চয়ই সাংবাদিকতা থেমে থাকবে না, সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ থেমে থাকবে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে সাময়িক পাস নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন সাংবাদিকরা।”

আগেও বিভিন্ন লেখায় বলেছি, ২০১৮ সালে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মোট তিনবার তা হালনাগাদের আবেদন করেছিলাম। পিআইডি নানা আইনকানুনের দোহাই দিয়ে আমার কার্ডটি আপডেট করেনি। জানি, একই আচরণ আরো অনেকের সাথে হয়েছে; বিশেষত রাজনৈতিকভাবে বিরোধী মতালম্বী হিসেবে চিহ্নিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে।

শুধু সাংবাদিক নয়, বহু গণমাধ্যমেরও টুঁটি চেপে ধরার মতো ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। ২০১৪ সালের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে ঘুম ভেঙেছিল আমার দেশ পত্রিকার বরিশাল ব্যুরো প্রধান জি এম বাবর আলীর আত্মহত্যার খবরে।

সবদিক বিবেচনা করে, ২০২১ সালেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আর কখনো প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড হালনাগাদের আবেদন করবো না। ২০২৪ সালের শেষ সপ্তাহে আজ বসে সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছি।

চলবে..

Designed with WordPress

Discover more from One-man Newsroom বাংলা

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading