আগেও বিভিন্ন লেখায় বলেছিলাম এই ঘটনা। ২০১৮ সালে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মোট তিনবার তা হালনাগাদের আবেদন করেছিলাম। তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) নানা আইনকানুনের দোহাই দিয়ে আমার কার্ডটি আপডেট করেনি। আমি জানি, একই আচরণ আরো অনেকের সাথে হয়েছে; বিশেষত রাজনৈতিকভাবে বিরোধী মতালম্বীদের বিরুদ্ধে।

শুধু সাংবাদিক নয়, বহু গণমাধ্যমেরও টুঁটি চেপে ধরার মতো ঘটনাও ঘটেছে। দৈনিক দিনকাল, দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক সংগ্রাম, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ বা অনলাইন গণমাধ্যম শীর্ষনিউজ এবং এসব প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের সাথে কী হয়েছিল, সচেতন পাঠকরা তা অবগত আছেন বলেই বিশ্বাস করি। মনে আছে, ২০১৪ সালের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে ঘুম ভেঙেছিল আমার দেশ পত্রিকার বরিশাল ব্যুরো প্রধান জি এম বাবর আলীর আত্মহত্যার খবরে।

পিআইডি কার্ড আপডেট না থাকায় ব্যক্তিগতভাবে আমার পেশাগত ঝক্কি একটু বেড়েছিল বৈকি। বিভিন্ন সময় সংবাদের প্রয়োজনে বিভিন্ন সরকারি দফতরে ঢুকতে সমস্যা হয়েছে। তবে এখন মনে হয়, পিআইডি আমার উপকারই করেছে। মাঠেঘাটে বেশি দৌড়ানোর সুযোগ পেয়েছি। নয়তো আমার সাংবাদিকতা হয়তো সংসদ সচিবালয়সহ অন্যান্য দফতরেই আটকে থাকতো। এসব বলছি, কারণ এরপরও বহু আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের ঘটনা একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আমি সমর্থন করতে পারছি না।

আপনারা অনেকে জানেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এখন (৩ নভেম্বর) পর্যন্ত মোট ৪৯ জন সাংবাদিকের কার্ড বাতিল করেছে পিআইডি। তাদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন নিশ্চয়, যারা নিজেদের পরিচয় ও দক্ষতা সংবাদ বিষয়ক কর্মকাণ্ড নয়, রাজনৈতিক কাজেই ব্যবহার করেছেন। আবার এমন সাংবাদিকদের নামও তালিকায় দেখেছি, যারা আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতাকর্মী হলেও পেশাদারিত্ব অটুট রাখার চেষ্টায় ছিলেন সবসময়।

সর্বশেষ সরকার পতনের আগে ও পরে বারবার বলেছি, নেতিবাচকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কালে নিজেদের নেতিবাচক হয়ে ওঠা ঠেকানোর যুদ্ধ জারি রাখা সবচেয়ে জরুরি। কারণ বদলে দেওয়া আর বদলা নেওয়া এক নয়। গত ৫ আগস্টের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যতোবার কোনো হত্যা মামলা হওয়ার ঘটনা শুনেছি, ততোবার আমার সাঈদ খানকে মনে পড়েছে। জুলাইয়ে আন্দোলনের মধ্যেই মেট্রোরেল স্টেশনে ভাঙচুরের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বিএনপিপন্থী এই সাংবাদিক নেতাকে।

একটি অভ্যুুত্থানোত্তর সংস্কারপন্থী সরকারের প্রশাসনও যদি সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতা দমনের এসব অপকৌশলকে ঝেঁটিয়ে বিদায় না করতে পারে, তবে কতোটা আর আশাবাদী হবে আমার মতো সাধারণ সংবাদকর্মীরা। সমাজের কোনো কোনো অংশ থেকে সংবাদমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতার ওপর নানাভাবে আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে সম্পাদক পরিষদের সর্বশেষ (৪ নভেম্বর) বিবৃতিতে। তবুও জিইয়ে রাখি প্রত্যাশা। কারণ আমি সাংবাদিকতা শুরুর পর বাংলাদেশের কোনো সরকার প্রধানের প্রেস সচিবকে কখনো এভাবে বলতে দেখিনি যে, “সাংবাদিকের ‘অতি মুগ্ধতা’ ফ্যাসিজম ডেকে আনে।”

আওয়ামী লীগ আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ১৭ মাস কারাবন্দী ছিলেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) আওয়ামীবিরোধী অংশের প্রয়াত সভাপতি রুহুল আমিন গাজী। তিনিও মৃত্যুর মাসখানেক আগে আগস্টের শেষ সপ্তাহে জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় এক সমাবেশে বলেছিলেন, “কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। আমরা এটা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি।” তিনি উল্লেখ করেন, “হত্যা মামলা করতে হলে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে। শুধু শুধু একজনের নামে হত্যা মামলা করা আমরা ঠিক মনে করছি না।” যার যেটুকু অপরাধ তার শুধু সেটুকুই শাস্তি হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছিলেন প্রয়াত এই সাংবাদিক নেতা।

নিশ্চিভাবে দুনিয়াজুড়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক আনুগত্যশীল সাংবাদিকতা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদচর্চার অন্যতম শত্রু। তবে ক্ষমতা বা পুঁজির চাপিয়ে দেওয়া সেই পরিস্থিতিও সামলে নেওয়া যায়, যদি সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত প্রবণতা ঠিক থাকে। মানে আমাদের মনগুলো যদি রাজনৈতিক অভিলাষ মুক্ত থাকে। ভুলভাল ভাবছি, নাকি ঠিকই আছি?

চলবে..