ঈদের সকালে, দেশ যখন নতুন পোশাক, সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া খাবার আর নিভৃত প্রার্থনার চিরচেনা আচারে থিতু হবে, আলেয়া বেগম তখন বেছে নেবেন এক ভিন্ন পথ। তিনি যাত্রা করবেন কারাগারের পানে। তাঁর এই যাত্রার নেপথ্যে রয়েছে দানা বেঁধে ওঠা এক প্রতিবাদের জোয়ার—ঠিক যেমনটি দেখা গিয়েছিল ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সেই 'বিচার গান' এর আসরে, যেখানে সুরের মূর্ছনায় কারাবন্দী বাউল নেতার মুক্তির দাবি জানানো হয়েছিল।

ঈদের সকালে, দেশ যখন নতুন পোশাক, সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া খাবার আর নিভৃত প্রার্থনার চিরচেনা আচারে থিতু হবে, আলেয়া বেগম তখন বেছে নেবেন এক ভিন্ন পথ। তিনি যাত্রা করবেন কারাগারের পানে। তাঁর এই যাত্রার নেপথ্যে রয়েছে দানা বেঁধে ওঠা এক প্রতিবাদের জোয়ার—ঠিক যেমনটি দেখা গিয়েছিল ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সেই ‘বিচার গান’ এর আসরে, যেখানে সুরের মূর্ছনায় কারাবন্দী বাউল নেতার মুক্তির দাবি জানানো হয়েছিল।

📷 শরীফ খিয়াম আহমেদ/ওয়ানম্যান নিউজরুম

শরীফ খিয়াম আহমেদ, ঢাকা

সংগীতের মাধ্যমে লোকজ আধ্যাত্মিকতা চর্চাকারী বাংলাদেশি বাউল সাধকদের প্রধান নেতা, অর্থাৎ বাংলাদেশ বাউল সমিতির সভাপতি এবার কারাগারে ঈদ কাটাবেন। দেশের ইতিহাসে এমন কি আগে কখনো হয়েছে, না এবারই প্রথম? স্থানীয় বাউল সমাজে ‘মহারাজ’ হিসেবে পরিচিত লোকসংগীতশিল্পী আবুল সরকারের বন্দিত্বে আজ এই প্রশ্নের মুখোমুখি বাংলাদেশ।

গত নভেম্বরে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা মানিকগঞ্জে এক পালাগানের আসরে ‘ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তিমূলক মন্তব্য’ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আবুল সরকার। চার মাসেও তাঁর মুক্তির কোনো পথ খুঁজে পায়নি পরিবার। ওয়ানম্যান নিউজরুমকে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বিকেলে মুঠোফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর স্ত্রী আলেয়া বেগম জানান, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাঁর স্বামীর জামিনের আবেদন নাকচ করেছে উচ্চ আদালত। বিচারিক আদালত মামলাটির পরবর্তী শুনানির তারিখ কবে, সেটাও জানে না পরিবার।

মানিকগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এ এফ এম নূরতাজ আলম বাহার বুধবার (১৮ মার্চ) সকালে ওয়ানম্যান নিউজরুমকে বলেন, “এই মামলাটা একদমই জামিন পাওয়ার মতো। যে ধারায় এই মামলা রুজু করা হয়েছে, সে ধারার সর্বোচ্চ সাজা দুই বছরের কারাদণ্ড। এমন মামলার জামিন ম্যাজিস্ট্রেটরাই দিতে পারেন।” তিনি বলেন, “এই মামলার বিচারও হবে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে। সেখানে এক-দেড় মাস পরপরই শুনানির তারিখ নির্ধারিত থাকে। যখন ম্যাজিস্ট্রেট জামিন দেন না, তখন ক্ষুব্ধ হয়ে জজ কোর্টে আবেদন করা যায়, সেটা তাঁরা করেছিলেন।”

“মানিকগঞ্জের জজ আদালতে এখন পর্যন্ত মোট দুইবার তাঁর জামিন আবেদনের শুনানি হয়েছে। দুবারই জেলা জজ জামিন নামঞ্জুর করেছেন,” উল্লেখ করে নূরতাজ আলম বাহার বলেন, “তিনি (আবুল সরকার) আল্লাহর বিরুদ্ধে কথা বলাতে বিষয়ট খুবই স্পর্শকাতর হয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্য স্থানীয় মুসলিমদের ধর্মীয় ‘সেন্টিমেন্টে’ আঘাত হেনেছে। এক্ষেত্রে তাঁকে জামিন দিলে স্থানীয় ল অ্যান্ড অর্ডার একটু ‘অ্যাবনরমাল’ হবে।”

“মূলত এই কারণেই, মানে পরিস্থিতি বিবেচনা করে জেলা জজ তাঁর জামিন দেননি। তবে এটা আসলেই জামিন দেওয়ার মতো,” যোগ করে জামিনের বিরোধিতাকারী এই আইন কর্মকর্তা আরও জানান, জামিন হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতো। বিক্ষুব্ধ লোকজনের বিক্ষোভের মুখে আবুল সরকার মারধরেরও শিকার হতে পারতেন। বিচারক এটাও বিবেচনা করেছেন।

মানিকগঞ্জের আদালত চত্বরসহ সংলগ্ন এলাকায় আবুল সরকারের ভক্তদের ওপর হামলার ঘটনাও স্মরণ করেন এই আইন কর্মকর্তা। পিপি বাহার বলেন, “জেলা জজের আদেশের বিরুদ্ধে তাঁরা হাইকোর্টে গিয়েছিলেন বলে শুনেছি। হাইকোর্টও যদি তাঁদের জামিন নামঞ্জুর করে দেয়, তবে তাঁরা আবার এখানকার সংশ্লিষ্ট আদালতে জামিন চাইতে পারবেন। এখনও চাননি।”

“জামিনটা মাননীয় হাইকোর্ট দিয়ে দিলে এখানে কেউ জানত না, তিনিও চুপচাপ বেরিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু কেন দেয়নি, সেটা তো আসলে বিচারপতিদের বিবেচনা,” যোগ করেন তিনি।

আলেয়া বেগম বলেন, “অনেক, অনেক হতাশা কাজ করতেছে। এখন, মানে আমরা তো আসলে কোন দিক, কোন কূলকিনারা পাইতেছি না। এটার কোন সুরাহার জন্য কার কাছে যাব, কে বলবে যে হবে, বা মুক্তি পাবে, মানে এ রকম কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।”

“যারা আমাদেরকে পছন্দ করে না, যারা নাকি ওনাকে আটক করেছে, অভিযোগ দিচ্ছে, হাইকোর্টে তারা খুব ‘অবজেকশন’ দিল। অবজেকশন দিয়ে বলল, যে ওনাকে জামিনের কোনো জামিনের ব্যবস্থা করাই যাবে না। এভাবে বলে দিব। এখন আইনে যদি এরকম না হয় তাহলে আমাদের কিছু বলার নাই। আমরা তো এখানে অসহায়,” যোগ করেন তিনি।

রুদ্ধ হচ্ছে আয়ের পথ, বাড়ছে বিপদ

বিচ্ছেদ, পালাগান, জারিগান ও আধ্যাত্মিক গানের জন্য বিখ্যাত ‘বাউল মাতা’ হিসেবে পরিচিত এই আলেয়া বেগম গত পাঁচ দশকে সহস্রাধিক গান লিখেছেন। এই লোকসংগীত শিল্পী এখন রাজপথে সংগ্রাম করছেন তাঁর স্বামীর কারামুক্তির দাবিতে।

এই সংগ্রামও ডেকে এনেছে নতুন বিপদ। তাঁর প্রতিবাদী বক্তব্যের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে সব আয়ের পথ। যে কারণে শুধু আবুল সরকার ও আলেয়া বেগমের পরিবার নয়, তাদের সহশিল্পীদের পরিবারগুলোও এক চরম দুঃসহ ঈদ কাটাবে এবার।

“গান তো নিয়মিত করতেছিলাম। কিন্তু উনি (আবুল সরকার) অ্যারেস্ট হওয়ার পরে গান একেবারেই কমে গেছে,” উল্লেখ করে আলেয়া বেগম বলেন, “আমাকে দাওয়াত করলে ওনারা (উগ্রপন্থীরা) ওখানে (আয়োজকদের) জানাইয়া দেয় যে আলেয়াকে ‘বায়না’ করলে আমরা গান করতে দেব না, প্যান্ডেল ভাইঙ্গা দিব।”

মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানানোর কারণেই এমনটা করা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, “আসলে যারা এগুলো করল, তারা এটা ভালো করল না। হিংস্রতায় ভরা মন-মানসিকতা যাদের, তারা তো মানবতা কাকে বলে জানে না। সৌহার্দ্যবোধ কী, সেটা তো তাদের অনুভূতিতে নাই।”

“ধনে দুর্বল হয়ে গেলে তো জন এমনিতেও চলে যায়; তাই না?” এমনটা উল্লেখ করে আলেয়া বেগম ওয়ানম্যান নিউজরুমকে বলেন, “মানে আমার যদি ইনকাম না থাকে, তাহলে আমি আমার পাশে কে থাকবে? কিন্তু আমার ১০-১২টা পোলাপান (সহশিল্পী), তারা এই উসিলায় সংসার চালায়। খাওয়া-দাওয়া করে। এখন আমি বসে গেলাম। আমারও কোনো ইনকাম নাই, ওদের কোনো ইনকাম নাই।”

তাঁর সহশিল্পীরা, বিশেষত যন্ত্রশিল্পীরা অন্য কোনো কণ্ঠশিল্পীর সাথে বাজান না। যে কারণে তারা এখন মহাকষ্টের মধ্যে আছেন। এছাড়া তাদের যে সহশিল্পী ও ভক্তরা মারধরের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকের পরিবারকেও এখন আলেয়া বেগমই দেখভাল করছেন।

“মানে দুই-তিনটা ছেলে বেশি অসুস্থ এবং ওরা খেটে খাওয়া মানুষ। রোজ আনে রোজ খায়। ওদের পুরা সংসারের খরচ আমাকে দিতে হইছে। ওদের চিকিৎসার খরচাপাতিও সবকিছু আমাকে দিতে হইছে। কারণ আমাদের জন্য ওরা আসছিল, আমাদের ভক্ত ছেলেপেলে। আর ওরা তো অভাবী গরিব মানুষ। গরিব বলতে, ওরা খেটে খায়। ওরা শারীরিকভাবে অনেকে বেশি অসুস্থ হয়ে গেছে। এখনো অসুস্থ আছে,” বলছিলেন আলেয়া বেগম।

“যে ফাঁসির আসামি, তাকেও তো একটু জেরা করা হয়। তার কাছেও কারণ দর্শানোর জন্য বিচারপতি কিছু তো জানতে চায়। কিন্তু উনি যে কষ্ট পাইতেছেন। একটা বেহুদা মামলায়, বেহুদা চার মাস হয়ে গেল। মানুষটা কষ্ট পাইতেছেন। কোনো আদালতের বিচার উনার মুখের একটা বাণী বলারও সুযোগ দিল না, উনার চেহারাটাও দেখল না, যে উনার কী পরিস্থিতি। কী মানুষ, সে কী হয়ে গেছে,“ মুঠোফোনে বলছিলেন আলেয়া।

ঈদের দিন তিনি কারাগারে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। এমনটা উল্লেখ করে ওয়ানম্যান নিউজরুমের প্রশ্নের জবাবে বাউল মাতা বলেন, “ঈদের দিনে তিনি দেশের সব ভক্তদের সাথে দেখা করতেন। আত্মীয়-স্বজন তাদের সাথে দেখা করতেন, তাদের সাথে সময় কাটাইতেন। তারপর মিরপুর মাজারে সব যারা আছে, পাগল, দরবেশ, ফকির, তারা তো উনাকে খুব ভালোবাসে, উনিও তাদের ভালোবাসে। সেখানে যাইতেন। তারপরে এখানকার স্থানীয় যারা আছেন, সবার সাথেই একসাথে আমরা ঈদ কাটাইতাম।”

“ঘরে আর কতক্ষণ। আমরা তো মানুষের মধ্যেই সারাক্ষণ থাকি, চলাফেরা করি। আমরা তো ঘরের মানুষ না। আমরা তো রাস্তার মানুষ, বাইরের মানুষ; তাই না? মানুষ ছাড়া তো আমাদের জীবন বাঁচে না,” বলেন আলেয়া।

কারাবন্দী বাউল নেতা আবুল সরকারের  মুক্তির দাবিতে ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এক প্রতিবাদী সংগীত আসর ও ‘বিচার গান’ অধিবেশনে গান পরিবেশন করছেন তাঁর এক শিষ্য।

কারাবন্দী বাউল নেতা আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এক প্রতিবাদী সংগীত আসর ও ‘বিচার গান’ অধিবেশনে গান পরিবেশন করছেন তাঁর এক শিষ্য।

📷 শরীফ খিয়াম আহমেদ/ওয়ানম্যান নিউজরুম

নেপথ্যে মাজার বনাম উগ্রবাদের লড়াই

বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে দেশজুড়ে ইসলাম রক্ষার নামে লোকজ আধ্যাত্মিকতা চর্চার ওপর যে ধারাবাহিক পীড়ন চলছিল, তার প্রতিবাদে যারা সোচ্চার ছিলেন, বাউলদের নেতা আবুল সরকার ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। এটাকেই তিনি কারাবন্দী থাকার মূল কারণ বলে মনে করে তাঁর পরিবার।

ওয়ানম্যান নিউজরুমকে আলেয়া বেগম বলেন, “যদি মানুষের কল্যাণে ওলি-আউলিয়ার গুণগান, আল্লাহর রাসুলের মহব্বত—এটা করতে গেলে তার ওপর জালিমের জুলুম তো আসেই। যারা জালিম তারা তো জুলুম করবেই। আর আমরা মজলুম। আমরা তো চিরদিনের কাঙাল, অসহায়। আমরা তো কাউকে আঘাত করতে পারব না। সেই বিধান নাই আমাদের জীবনাচরণে। কাউকে আমরা কষ্ট দিতে পারব না।”

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ২৪ নভেম্বর এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, “আমরা ওলি-আউলিয়া এবং মাজারের প্রচারক। তো যেখানে ওলি-আউলিয়া ও মাজার ভেঙে ফেলে তারা, আর আমরা তার প্রচারক; অতএব এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এই ব্যাপারেই তাদের একটা প্রতিপক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বী এবং শত্রু হয়ে গিয়েছি। মূলত এটাই কারণ। তারা ভাঙে আর আমরা ওলি-আউলিয়ার গুরু এবং কেরামতিপূর্ণ আশ্চর্য যে ঘটনাগুলি, সেগুলো আমরা তুলে ধরি।”

“ওনার বইতে শত শত গান রয়েছে শুধু আল্লাহর শানে,” উল্লেখ করে নিজের স্বামী সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “সে একজন সত্যিকারের সহজ-সরল মনের একজন মানুষ। আমি আমার বাউল মন থেকে তাকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দেখেছি যে তার ভেতর একটা সুন্দর মানবতা। সেই মানুষটাকে তারা—একমাত্র মাজারের পক্ষে আমরা কথা বলে থাকি, ওলি-আউলিয়ার গুণগান করে থাকি—সেই কারণটা তুলে ধরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

প্রায় চার মাস পর ওয়ানম্যান নিউজরুমকে আলেয়া বেগম বললেন, “আসলে কী, আমরা বলি যে বড় গাছের ওপরেই কিন্তু ঝড়টা বেশি আসে। উনি যেভাবে সক্রিয় ছিলেন, মানে ঘুমাবেন না; সকাল ভোরে বের হয়ে যাইতে হবে, প্রতিবাদ জানাইতে হবে। মাজার ভাঙচুর হইতেছে, পাগলদেরকে মারতেছে, বিভিন্ন জায়গায় উগ্রপন্থীরা পীর-ফকিরের দরবারে ঢুকে ভক্তদের কষ্ট দিতেছে, মানুষদেরকে মারতেছে, মাজার ভেঙে আবার লুটপাট করতেছে—এসব ঘটনায় সবার আগে উনি এগিয়ে যেতেন। যাতে এই ঘটনাগুলো সবাই শুনতে পায়, যেন দেখতে পায়, বুঝতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতেন।”

বিভিন্ন প্রতিবাদী আয়োজনে আবুল সরকারের সক্রিয়তার কথা উল্লেখ করে আলেয়া বলেন, “এখানে মাজারবিরোধী একটা দল তো অনেক আগে থেকেই আছে। তাদের কাছে মনে হইছে যে এই মাথাটা হইলো সবচেয়ে বড়। উনি সবার আগে প্রতিবাদ জানাতে চলে আসে। এই মাথাটাকে যদি কোনো পয়েন্টে দুর্বল করে দেওয়া যায়, তাহলে আমরা সাকসেস, মানে সফল। হয়তো এভাবেই চিন্তাভাবনা করেছে তারা।”

📷 ওয়ানম্যান নিউজরুম কোলাজ

আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ২১ নভেম্বরের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়া লেখক, শিল্পী ও ভাস্কর গোঁসাই পাহলভীও ওয়ানম্যান নিউজরুমকে প্রায় একই কথা বলেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, “যেহেতু তিনি একটা সংগঠনের সভাপতি, মাথাটাকে যদি ধরা যায়, পেছনের লোকগুলো ভয় পাবে। ওরা (উগ্রপন্থীরা) একটা ন্যারেটিভে আনতে চাচ্ছে এই দেশটাকে।”

“যেহেতু আবুল সরকার সেই প্যারাডাইমটাকে ভেঙে দেয়, সে যেহেতু কোশ্চেন করে এবং সে নিজে যেহেতু একটা স্কুলের ধারক, ফলে ওরা এইখানে একটা থ্রেট দিছে আসলে,” যোগ করেন তিনি।

“২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে (হাসিনা পতনের) যে মুভমেন্টটা হলো, এই মুভমেন্ট কিন্তু একটা সাংস্কৃতিক মুভমেন্টও ছিল। আমরা সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় কিন্তু এই (ছাত্র) হত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় গেছিলাম,” উল্লেখ করে গোঁসাই পাহলভী বলেন, “এবং ৫ আগস্টের পরে কী হলো—যখন আমরা দেখলাম যে মাজারগুলো ভাঙা শুরু হলো, পীর-ফকির-দরবেশদের আশ্রমগুলোকে ভাঙা শুরু হলো। এর মানে কী? এরা ভাঙছে এই কারণে যে, এই যে ডিফারেন্ট ডিফারেন্ট থট, এই যে ডিফারেন্ট ডিফারেন্ট স্কুল, এই যে আলাদা আলাদা চিন্তা করার যে প্রক্রিয়া, এই প্রক্রিয়াটা তারা পছন্দ করছে না। তারা চাচ্ছে একটা ভাষ্য থাকবে দেশে। ধর্মের (ইসলাম) একটা মাত্র ভাষ্য থাকবে।”

জ্যেষ্ঠ কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার ২৪ নভেম্বরের সমাবেশে বলেছিলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এই গোষ্ঠী ইসলামের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে চায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদায় আঘাত করছে।

গত অক্টোবরে ঢাকার মিরপুরের হযরত শাহ আলী বোগদাদীর (রহ.) মাজারে সেখানকার পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তে আক্রান্ত এক শতবর্ষী বটবৃক্ষ ও মাজারের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ রক্ষা এবং দেশজুড়ে সাধক, ফকির, পাগল ও বাউল পীড়নের প্রতিবাদ জানাতে যারা বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন, তাদের একজন ছিলেন আবুল সরকার।

সেই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে আবুল সরকারকে মাজারবিরোধীদের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিতে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। সেদিন আবুল সরকার বলেছিলেন, “এই ঘটনায় ম্যানেজার, এমনকি জেলা প্রশাসক জড়িত হলে, তাঁকেও ছাড় দেওয়া হবে না। তারা এখন এই গাছ কাটা ধরছে, এরপর মাজার ভাঙবে।” বাংলার সাধকদের সঙ্গে বৃক্ষের সম্পর্ক অনেক নিবিড় দাবি করে তিনি বলেন, এর আগে ‘সিন্নিগাছ’ হিসেবে পরিচিত রওজা সংলগ্ন বটগাছের গোড়ায় মোমবাতি ও আগরবাতি প্রজ্জ্বলন নিষিদ্ধ করেছে বর্তমান মাজার কমিটি।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, যে গাছের জন্ম হযরত শাহ আলী বোগদাদীর (রহ.) ব্যবহৃত লাঠি থেকে—বহু ভক্ত-আশেকান সেই গাছের নিচে মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালিয়ে মানত করতেন। মাজার কর্তৃপক্ষ বিকল্প হিসেবে গাছের পাশে একটি বড় থালায় মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা রাখলেও এটাকে হাজার বছর ধরে চলে আসা আধ্যাত্মিক চর্চার ওপর আঘাত বলেই মনে করছেন ভক্তরা।

মাজারের মসজিদের ইমামরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে আবুল সরকার বলেছিলেন, “তারা যে পাত্রে খাবার খায়, সেটিই ফুটো করছে। তারা নিয়মিত আয়োজন করে বয়ান করে মোমবাতি জ্বালানো, আগরবাতি নিষেধ, মানত নিষেধ, অথচ মাজারের ফান্ড থেকেই তারা বেতন নেয়। এদের প্রত্যেককে এখান থেকে তাড়াতে হবে।”

“যারা মাজারবিরোধী লোক, তারা মাজারে থাকতে পারবে না। যারা মাজারের পক্ষের লোক, তারাই শুধু মাজার পরিচালনা করবে,” বলেছিলেন আবুল সরকার।

আধ্যাত্মিক আলাপ যখন অপরাধ

আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর সহশিল্পী ও ভক্তদের মারধরের শিকার হওয়াসহ তাঁদের বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভের একাধিক ভিডিও সংগ্রহ করেছে ওয়ানম্যান নিউজরুম। সেগুলোতে দেখা গেছে, আবুল সরকারের ফাঁসির পাশাপাশি বাউলদের জবাই করে হত্যা এবং তাঁদের সব আখড়া ধ্বংসের হুমকি জানিয়েও মিছিল-সমাবেশ হয়েছে মানিকগঞ্জে।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেসহ একাধিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০ নভেম্বর আবুল সরকারকে যখন আদালতে হাজির করা হয়, তখন মানিকগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে ‘আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল চলছিল। এ সময় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মুফতি আবদুল্লাহ আল ফিরোজসহ কয়েকজন বক্তব্য দেন।

২৩ নভেম্বর সকালেও জেলা শহরে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে ‘মানিকগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে থাকা একদল ব্যক্তি। একই সময়ে আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করেন তাঁর ভক্তরা।

সেদিন ‘মানিকগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে থাকা ব্যক্তিদের হামলায় আবুল সরকারের তিন ভক্ত-অনুরাগী আহত হন। আহত ভক্তরা হলেন—জেলার শিবালয়ের শাকরাইল গ্রামের আবদুল আলীম (২৫), সিঙ্গাইরের তালেবপুর গ্রামের আরিফুল ইসলাম (২৯) ও হরিরামপুরের কামারঘোনা গ্রামের জহিরুল ইসলাম (৩২)। আহত অন্যজন হলেন সদর উপজেলার বরঙ্গাখোলা গ্রামের আবদুল আলীম (২৭)।

মামলার অন্যতম বাদী ঘিওরবন্দর মসজিদের ইমাম মুফতি মো. আবদুল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন, “তারাও আমাদের ওপর হামলা করেছে। এতে মাওলানা আব্দুল আলীম নামের এক মাদরাসা শিক্ষকসহ দুইজন গুরুতর আহত হয়েছেন।” তবে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবদুল্লাহ আল মামুন সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, “মাদরাসা শিক্ষক আহত হওয়ার যে খবর ছড়িয়ে পড়েছে সেটা ঠিক নয়। উনি আসলে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়েছিলেন। তাঁকে কেউ আঘাত করেনি।”

আবুল সরকারের শিষ্য সুজন সরকার ওয়ানম্যান নিউজরুমকে বলেন, গত ১৯ নভেম্বর দিবাগত রাতে মাদারীপুরের একটি গানের আসর থেকে আবুল সরকারকে রাজৈর থানার পুলিশের সহায়তায় তুলে আনে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরদিন, অর্থাৎ ২০ নভেম্বর দুপুরে জেলার ঘিওর থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ‘ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তিমূলক মন্তব্য’ করার অভিযোগ আনা হয়।

ঘিওর বন্দর মসজিদের ইমাম মুফতি মো. আবদুল্লাহসহ পাঁচজন তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৫৩, ২৯৫-এ এবং ২৯৮ ধারায় মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে স্থানীয় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক এই বাউলকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তখন মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মোছাম্মদ ইয়াছমিন খাতুনও সাংবাদিকদের বলেছেন, “আবুল সরকারকে আটক করে প্রথমে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। পরে তাকে ঘিওর থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সন্ধ্যার দিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতের বিচারক তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন।”

শুনানির সময় আদালত চত্বরে বাউলবিরোধী মুসল্লিরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। সেখানকার ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করছেন যে, দীর্ঘদিন থেকে আবুল সরকার নিজেকে ‘পীর’ পরিচয় দিয়ে কোরআনের আয়াত ভুলভাবে উচ্চারণ ও ব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করেন।

তাঁর সাম্প্রতিক ‘দোষ’ সম্পর্কে এক বক্তা বলছিলেন, “আবুল সরকার বলেছেন, তিনি নাকি আল্লাহর গোয়া (পশ্চাৎদেশ) ও মাথা খুঁজে পাচ্ছেন না।” এরই সূত্র ধরে ঘটনার গভীরে ঢোকার চেষ্টা করেছে ওয়ানম্যান নিউজরুম।

গত ৪ নভেম্বর রাতে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জাবরা এলাকায় ‘খালা পাগলীর মেলা’ নামে অনুষ্ঠিত এক লোকজ পার্বণে পালাগান আয়োজন করা হয়েছিল; যা মূলত এক প্রকারের কথোপকথনমূলক লোকগীতি, যেখানে এক বা একাধিক বয়াতি (বাউল গানের গায়ক) দোহারদের (সহশিল্পী) সহযোগে গান পরিবেশন করেন। এই গান কাহিনীমূলক হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে গায়েনরা বিভিন্ন চরিত্র রূপদান করেন।

পরিবেশিত আলাদা আলাদা গল্পকেই বলা হয় পাট বা পালা। তেমনই একটি পাট ‘জীব ও পরম’। আধ্যাত্মিক এই পালায় ‘জীব’ (মানুষ) এবং ‘পরম’ (স্রষ্টা বা পরমাত্মা) মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। দুই শিল্পী এখানে পালা করে মানুষ ও পরমাত্মা সেজে গভীর দার্শনিক তত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিকতার বিষয়গুলো সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন। এক্ষেত্রে যে মানুষ সাজে, তাঁকে মানবসমাজের অজ্ঞতা প্রকাশের জন্য স্রষ্টা বরাবর এমন সব প্রশ্ন করতে হয়, যা একশ্রেণির মুসল্লির দৃষ্টিতে ইসলামবিরোধী।

৪ নভেম্বর রাতের পালায় মহারাজ আবুল সরকার ‘জীব’ এবং ফকির আবুল সরকার ‘পরম’-এর ভূমিকায় ছিলেন। এ সময় ফকিরের কাছে প্রশ্ন করতে গিয়ে মহারাজ বলেছিলেন, “তিনি নাকি আল্লাহর গোয়া (পশ্চাৎদেশ) ও মাথা খুঁজে পাচ্ছেন না।” এটা মূলত আল্লাহর সামনে মানুষের চিন্তার ক্ষুদ্রতাই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর সহশিল্পীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, পালার অন্যান্য অংশ বাদ দিয়ে শুধু এই কথাটি ভিডিও আকারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরি করা হয়। যারই ধারাবাহিকতায় তাঁকে গ্রেপ্তারের ঘটনা।

তবে এই পালার পর যে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, সেটাও ধারণা করেছিলেন সাধক আবুল সরকার। সেদিনের ভিডিওতে দেখা গেছে, স্টেজে বসা আরেক বাউলশিল্পীকে দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, “একটা কথা মনে হলো রিতা দেওয়ানকে দেখে। রিতা দেওয়ানও এই জীব আর পরম পালা করেছিলেন। জীবের জায়গা থেকে রিতা সরকার সেদিন যে কথাগুলো বলেছিল, শাহ আলম সরকার ছিলেন পরমের ভূমিকায়। তাতে রিতা দেওয়ানের নামে হুলিয়া (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) জারি হয়েছিল, অনেকগুলো মামলা হয়েছিল, আপনারা জানেন তো?”

এ সময় রিতা দেওয়ান বলেন, “আটটা মামলা হয়েছিল।” রিতা দেওয়ানকে ২০১৯ সালের ওই পালাগানের ভিডিওর কারণে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেওয়ার অভিযোগে জামিন পাওয়ার আগে পর্যন্ত পালিয়ে থাকতে হয়েছিল। আবুল সরকার আরও বলেছিলেন, “আজ সেই জীবের পাল্লা আমাকে দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধেও যে কয়টা মামলা হবে তা আমি জানি না। হতেই পারে। তবে একটা কথা বলি, গান-বাজনার বিরুদ্ধে কোরআন সমর্থিত কোনো দলিল নাই।”

বাউল আবুল সরকারের পালাগান নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার বলেন, ‘তিনি কোনো ভুল করেননি। বরং যারা তাঁকে অভিযুক্ত করেছেন, তাদের সাংস্কৃতিক জ্ঞানই দুর্বল।’ তিনি আরও জানান, আবুল সরকারের নাটকীয় পরিবেশনার ভেতর ধর্মীয় তত্ত্ব ব্যাখ্যার ঐতিহ্যগত ধারা রয়েছে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাঁর ভাষ্য ছিল, একটি লুটেরা ও মাফিয়া চক্র নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং দম্ভের সঙ্গে মাজারে হামলা ও বাউলদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে।

📷 শরীফ খিয়াম আহমেদ/ওয়ানম্যান নিউজরুম

বাউলের রাজনৈতিক সমীকরণ

বর্তমানে দেশের শাসনভার বিএনপির হাতে। যে গানের আসরে অংশ নেওয়ার জন্য আবুল সরকার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, সেখানে “বিএনপির লোকেরা গানের বিরুদ্ধে কথা বলে না দাবি করে”, সেখানকার বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতার পক্ষে ভোট চেয়ে তিনি বলেছিলেন, “কারণ যদি এরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে না পারে, যারা দুই শতাধিক মাজার ভেঙে ফেলেছে, নির্বাচনে যদি তারা ক্ষমতায় যায় তবে আমাদের বাড়িঘরসহ ভাঙা শুরু করবে, খালি মাজার না।”

“তারা এখন একটু থেমেছে। কারণ সামনে নির্বাচন। একটু গ্যাপ দেই। নাইলে এখনো মাজার ভাঙতে থাকলে কিন্তু ভোট পামু না। তাই এখন তারা একটু থেমেছে, বিশ্রাম নিচ্ছে,” ডানপন্থী দলগুলোকে ইঙ্গিত করে এমনও বলেছিলেন তিনি। তাঁর একাধিক শিষ্য ওয়ানম্যান নিউজরুমকে বলেন, “এগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার কারণেই তিনি আশঙ্কা করছিলেন তাঁকে জেলে যেতে হবে।”

মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সেই আফরোজা খানম রিতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সাত নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত। ১১ দলীয় জোট সমর্থিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদ নূর লক্ষাধিক ভোটে হারিয়ে স্বাধীনতার পর ওই আসনের একমাত্র নারী সংসদ সদস্য হয়েছেন মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এই চেয়ারম্যান। বর্তমানে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী।

তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে কি না জানতে চাইলে আলেয়া বেগম বলেন, “আসলে কী, মাত্র তো মন্ত্রী হইলেন, দল ক্ষমতায় আসল; তো উনাদের তো একটা গোছগাছের বিষয় আছে। আমি তো উনাদের কাউকে কোনো প্রকারের প্যারা দেই নাই। প্যারা দেই নাই এই জন্য—কারণ দেশ নিয়ে তাদের একটা চিন্তাভাবনা আছে।”

“যেমন রিতা আপা, সে মানিকগঞ্জের মানুষ কীভাবে ভালো থাকবে, কী অভাব, কী চাহিদা—এই নিয়ত তে সে মানে চেষ্টা করতেছে। এখানে আমি যাইয়া যদি ওনাকে বাড়তি একটা প্যারা দেই, তাহলে এটা মানে, আমার কাছে মনে হয় যেন তার কষ্টই লাগবে। কারণ সে মনে প্রাণে চাইতেছে যে উনি (আবুল সরকার) বের হোক। কিন্তু সবকিছু তো সিস্টেমের মাধ্যমেই করতে হবে।”

“আর আমার তো আল্লাহ আছে,” উল্লেখ করে আলেয়া বেগমন বলেন, “মানে আমরা যতই কথাবার্তা বলি, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তো কোনো কিছুই না। আল্লাহর ইশারা যখন হবে তখন সে (আবুল সরকার) চলে আসবে।”

কাঠগড়ায় প্রফেসর ইউনূসের সরকার

আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের পর জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ‘উগ্র ডানপন্থী মুসলিমদের’ আসকারা দেওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো হয়। প্রকাশ্যে নিজেদের বিব্রত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন সরকারের উপদেষ্টারাও।

“সরকারে যোগ দেওয়ার পর গত চারটা দিন ছিল আমার জন্য সবচেয়ে অস্বস্তির। অনেকেই আমাকে বলেছেন, আমি চুপ করে আছি কেন? আমি বলেছি, আমাদের কাজ তো কাজটা করা। সরকারে বসে বিবৃতি দেওয়া না,” ২৪ নভেম্বর ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন এই সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

“কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ফর দ্য রেকর্ড কয়েকটা প্রসঙ্গে কথা বলি,” উল্লেখ করে ফারুকী লিখেছেন, ”আবুল সরকারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এটা জানা মাত্রই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করি। তখন সেখান থেকে আমাকে একটা ভিডিও ক্লিপ পাঠানো হয় এবং পরিস্থিতির উত্তাপ এবং ঝুঁকির দিকগুলো ব্যাখ্যা করা হয়। আমি বুঝতে পারি একটা সংকটের দিকে যাচ্ছে পুরা ব্যাপারটা।”

“যেকোনো ফৌজদারি অপরাধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। আমি আমার পক্ষ থেকে যা যা করার বা বলার তা তা করছি এবং বলছি। এর বেশি এখানে লেখাও আমার পক্ষে সংগত কারণে সম্ভব না,” যোগ করেছিলেন ক্ষমতায় থাকা এই চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা।

আগের দিন (২৩ নভেম্বর) ওই সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, ”মজলুম জালিম হচ্ছে, ফ্যাসিবাদবিরোধীরা ফ্যাসিবাদী হচ্ছে। পুরা পরিস্থিতি হতাশা ও ক্ষুব্ধতার।”

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত মাহফুজের ভাষ্য, “জুলুমকে ইনসাফ দিয়ে, সহিংসতাকে দরদ দিয়ে প্রতিস্থাপন না করে যারা নতুন মাত্রার জুলুম ও সহিংসতা করে বেড়াচ্ছেন, তারা ফ্যাসিবাদের পুনর্জাগরণের জন্য দায়ী থাকবেন। সমাজে-রাষ্ট্রে চিন্তা ও আচারের বৈচিত্র্যকে বাধাগ্রস্ত করলে ফ্যাসিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হবে।”

“তাসাউফপন্থী, ফকির, বাউলসহ সব ভিন্নমতাবলম্বীর ওপর সব ধরনের জুলুম বন্ধ হোক,” যোগ করেন বিগত সরকারের আলোচিত এই উপদেষ্টা।

একই দিন যৌথ বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, উচ্চ আদালতের আইনজীবী, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিকসহ দেশের ২৫৮ বিশিষ্ট নাগরিক বলেন, ”গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আমরা লক্ষ করছি, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। একটি বিশেষ গোষ্ঠী যেন ইসলাম ধর্মের ‘সোল-এজেন্ট’ হিসেবে আবির্ভূত হয়ে দেশব্যাপী শুদ্ধি-অভিযানে নেমেছে।”

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “দুই শতাধিক মাজার ভাঙা, অসংখ্য ব্যক্তিকে মুরতাদ-কাফের-শাতিম ঘোষণা, কবর থেকে তুলে লাশ পোড়ানো, রাস্তার জটাধারী বাউল-ফকিরদের ধরে ধরে চুল কেটে দেওয়া, নারীদের চলাচল ও পোশাক নিয়ে হেনস্তা করা, নাচগান-নাটকের অনুষ্ঠান এমনকি খেলাধুলা ও মেলার মতো আয়োজন পণ্ড করার মধ্য দিয়ে ভিন্নমত ও ভিন্ন-আচারের মানুষদের নির্মূল করাই যেন তাদের লক্ষ্য।”

”জুলাই-আন্দোলনের মূল স্পিরিট ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠন—অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অঙ্গীকারেও যে অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছিল,” উল্লেখ করে বিবৃতিদাতারা বলেছেন, “কিন্তু বাহ্যত দেখা গেল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ মব-সন্ত্রাস বা দঙ্গলবাজি বন্ধে কোনো কার্যকর ভূমিকা তো গ্রহণ করছেনই না, বরং তারা শুরু থেকেই নীরবতা অবলম্বনের মাধ্যমে একে প্রশ্রয় দেওয়া, এমনকি ‘প্রেশারগ্রুপ’ ইত্যাদি নাম দিয়ে ঘটনাকে হালকা করার চেষ্টা করছেন এবং ভুক্তভোগী বা হামলার শিকার হওয়া ব্যক্তিদেরই ভুয়া মামলায় আটক করছেন। এরই ধারাবাহিকতার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ বাউল আবুল সরকার মহারাজ।”

“জুলাই অভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর পরে এসেও অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, সরকার নিজ অবস্থান সুদৃঢ় রাখার কৌশল হিসেবেই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। এমন পরিস্থিতি নতুন বন্দোবস্তের প্রতি গণতন্ত্রমনা মানুষদের যেমন বীতশ্রদ্ধ করে তুলছে তেমনি পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করছে,” যোগ করেন তাঁরা।

📷 শরীফ খিয়াম আহমেদ/ওয়ানম্যান নিউজরুম

সংকটের মূলে সুসংগঠিত রাজনীতি

লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক মহাথেরো মুহাম্মদ ওয়ানম্যান নিউজরুমকে বলেছিলেন, “যদি আমরা আসলে গভীরভাবে লক্ষ্য করি তাহলে আমরা দেখব যে, বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতির ভিত্তিতে মানুষের ওপর আঘাত, মানুষকে মেরে ফেলা—কুৎসার কারণে বা মিথ্যা কারণে, মানুষের ঘরবাড়িতে লুটপাট, হত্যা, সাম্প্রদায়িক হামলা—এই যে ব্যাপারগুলো ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে ঘটে, এগুলো কিন্তু বাংলাদেশের তরিকাপন্থী বা সুন্নি মুসলমানরা করে না।”

“তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, এই পুরো আক্রমণটা, এই মবটা একটা সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি; এবং এটা চিরকালই তাই ছিল। তো আপনার এই যে সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি, যে শক্তিটা হচ্ছে ওহাবি ভাবধারা বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেমন—মেয়েদের এভাবে থাকা লাগবে, মাজারে মোমবাতি জ্বালানো যাবে না, মিলাদ পড়ানো যাবে না ইত্যাদি।”

মহাথেরো মুহাম্মদ বলেন, “ওহাবি যে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, তার ফলে মাজারে গিয়ে ভক্তরা নিজের মতো করে প্রেম প্রকাশ করতে পারবে না। এই নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীটি বাংলাদেশে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীটার সাথে নানা ধরনের রাজনৈতিক দল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জড়িত।”

‘অলি-এ-বাংলা’ উপাধি পাওয়া আউলিয়া হযরত শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.), যাঁর রওজা হাইকোর্ট মাজার হিসেবে পরিচিত। চলতি বছর তাঁর দরবারের বার্ষিক ওরস হতে না দেওয়া বা ভক্তদের মারধরের ঘটনাটি নিয়ে ১০ জানুয়ারি মহাথেরো মুহাম্মদের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল ওয়ানম্যান নিউজের।

তিনি বলেন, “যেমন আমরা দেখলাম (২০২৪ সালের) ৫ আগস্টের পরে মামুনুল হক (খেলাফত মজলিস ও হেফাজতে ইসলামের নেতা) বললেন যে, সব মাজার ভেঙে দাও, সব দরবার ভেঙে দাও, সব খানকা ভেঙে দাও। তারপর আমরা জানি যে নুরাল পাগলের লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। দেখা গেছে বিভিন্ন এলাকায় ‘ডাকসুর বিজয়ী জুলাই চ্যাম্পিয়ন’ সমর্থিত বাহিনী পাগলদের ওপর হামলা করল। এর পেছনে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী আছে। যারা নানা সময়ে নানামাত্রিকভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করছে।”

“আমরা আসলে যেটিকে ‘মব’ বলে আসছি, ধর্মীয় অনুভূতির আঘাতের বিপরীতে মব, কিংবা পুলিশ অনেক সময়ে যুক্তি দিচ্ছে যে তারা বাউল আবুল সরকারকে বাইরে নিরাপত্তা দিতে পারছে না বলেই তাঁকে জেলে রাখা লাগছে। এই টোটাল ধর্মীয় অনুভূতির মবটা আদতে মব না,” উল্লেখ করে মহাথেরো মুহাম্মদ বলেন, “এটি হয়েছে ”একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যারা জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে নিজেদের একটি পলিটিক্যাল শোডাউন করছে।”

তিনি আরও বলেন, “আপনি ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কে ওদের সাথে যেতে পারবেন না। ওরা ধর্মশাস্ত্রের গভীর বিতর্কে আসবেও না এবং সেটা প্রয়োজন মনে করে না। ওদের যেটা আছে সেটা হচ্ছে—বাংলাদেশে ওরা যেকোনো সময় ডাক দিলে কওমি মাদরাসাগুলো খালি করে পোলাপাইন চলে আসে। জামায়াতে ইসলামীর একটি ব্যাপক পলিটিক্যাল পাওয়ার আছে। এর পরে আহলে হাদিসের যে মানহাজি গ্রুপ, তাদের একটি ব্যাপক শক্তির জায়গা আছে। তারা তাদের যে আকিদা ও চিন্তাধারা, সেটি বাংলাদেশের অন্য সব মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়।”

“ওরা সুসংগঠিত, সবারই রাজনৈতিক পার্টি আছে। এই পার্টিগুলোর নেতারা—যেমন উদাহরণ দিলাম মামুনুল হক—এই ভাঙচুরগুলোকে সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন ৫ আগস্টের পরে। হারুন এজহার মুফতিরও (হেফাজতের আরেক নেতা) এতে হাত আছে,” দাবি করে মহাথেরো বলেন, “আমার কথা হলো, মুফতি হারুন এজহার বলেন বা মামুনুল হক বলেন বা জামায়াতে ইসলামী বলেন—তাঁরা তাঁদের মতো করে প্র্যাকটিস করবেন। এটি নিয়ে শরফুদ্দীনের পাগলদের কোনো আপত্তি এদেশের ইতিহাসে কোনোদিন ছিল না। শরফুদ্দীনের পাগলদের যদি আপত্তি থাকত, তাহলে তো উনাদের মতবাদ প্রচার হওয়ার কোনো সুযোগই এদেশে ছিল না।”

“অর্থাৎ শরফুদ্দীনের পাগলরা যদি উনাদের মতবাদ প্রচারের শুরুতে বাধা দিত, উনারা আজ যা করছেন তেমনটা যদি উনাদের সাথেও করা হতো, তবে উনাদের মতবাদ বিস্তারই লাভ করত না,” যোগ করেন তিনি।

ঢাকার শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতির (রহ.) মাজারে বার্ষিক ওরস পালনে বাধার প্রতিবাদে নাগরিক সমাজের মানববন্ধন। ১০ জানুয়ারি, ২০২৬।

📷 শরীফ খিয়াম আহমেদ/ওয়ানম্যান নিউজরুম

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান