ছবি: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

📷 স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

নিউজম্যান, ঢাকা

বাংলাদেশের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেন, “আমি জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার করা হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। এ ধরনের ঘটনা জাতীয় জীবনে ভবিষ্যতে যাতে আর দেখতে না হয়, সেজন্য যে সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি আমরা সেই পদক্ষেপগুলো নেব।”

জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার বনানী কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এ ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি ছিল এবং বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার একটি লক্ষ্য ছিল। সেটা তাদেরই থাকতে পারে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না, যারা একটি দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে এদেরকে দেখতে চায়।”

দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “পিলখানায় সংঘটিত সেনা হত্যাকাণ্ডের বিচার চলমান। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলার অবকাশ নেই। তবে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিরোধী তৎপরতা বিদ্যমান ছিল—নাগরিক হিসেবে এই বিষয়টি আমাদের উপলব্ধিতে থাকা জরুরি বলে আমি মনে করি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের পর নানারকম মিথ্যা কিংবা অপতথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। তবে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের কাছে পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ এখন বোধগম্য।” সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, “সশস্ত্র বাহিনী একটি স্বাধীন দেশের সম্মান, বীরত্ব এবং গৌরবের প্রতীক। ভবিষ্যতে আর কেউ যাতে সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে না পারে, আজ পুনরায় সেই শপথে বলীয়ান হতে হবে।”

তদন্তের অগ্রগতি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল এবং সেই কমিশনের রিপোর্ট ইতোমধ্যে বিএনপি সরকারের সামনে এসেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই রিপোর্ট বাস্তবায়নের তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী বলেন, “পিলখানার হত্যাকাণ্ড নিয়ে বর্তমান সরকার নতুন কোনো তদন্ত কমিশন করবে না, যেহেতু দক্ষ উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল। ওই কমিশনের রিপোর্টের ৭০টির মতো সুপারিশমালা এসেছে। এর মধ্যে অনেকগুলো বাস্তবায়নাধীন। আর যেগুলো বিচারাধীন, তার মধ্যে কিছু মামলার আপিল পর্যায়ে রয়েছে, কিছু আপিলেট ডিভিশনে রয়েছে—এই জুডিশিয়াল প্রসেসটা সমাপ্ত করা হবে। আর অন্যান্য যে সমস্ত সুপারিশ রয়েছে সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।”

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন ৩০ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিডিআর) সদর দপ্তরে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ১১ মাস ধরে তদন্ত করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল।

প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেছিলেন, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কমিশন প্রধান আ ল ম ফজলুর রহমান জানিয়েছিলেন, তাঁরা এ ঘটনার আদ্যোপান্ত বের করতে সক্ষম হয়েছেন। তদন্তে উঠে এসেছে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত ছিল, কারা আলামত নষ্ট করেছে এবং কেন সেনাবাহিনী সামরিক পদক্ষেপ নিল না কিংবা কেন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের নাম উল্লেখ করেন। এছাড়া শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবরের নামও প্রতিবেদনে এসেছে।

তবে প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না করায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেছেন। পিলখানায় হত্যার শিকার কর্নেল কুদরত ইলাহীর সন্তান আইনজীবী সাকিব রহমান রাওয়া ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “কমিশন খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, কিছু কিছু নাম, যেগুলো তাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা এই মুহূর্তে সেগুলোই প্রকাশ করতে পারবেন না। সেটার যৌক্তিকতাটা আমরা কিছুটা বুঝি। তবে আমার মনে হয় না যে এটাকে অজুহাত দেখিয়ে অনেক দিন ধরে সেই নাম প্রকাশ হবে না। সেটা কোনোভাবে আমরা মেনে নেব না।”

তিনি বলেন, “যত দ্রুত সম্ভব সব ব্যক্তি—সামরিক ও বেসামরিক সবার বিরুদ্ধে যেন অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারি করা হয় এবং তারা যেন অ্যারেস্ট হয়। যদি রিপোর্টটা পাবলিক না হয়, আমরা আশঙ্কা করি, যেসব মানুষের নাম এসেছে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।” অবশ্য কমিশন প্রধান জেনারেল ফজলুর রহমান আশ্বস্ত করেছিলেন যে, প্রতিবেদনটি ‘ক্ল্যাসিফায়েড’ নয় এবং এটি পরবর্তীতে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার সকালে বনানীর সামরিক কবরস্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। বাণীতে তিনি উল্লেখ করেন, “আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় শহীদ সেনা দিবস। ২০০৯ সালের এই দিনে বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় সেনা হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল। হত্যাযজ্ঞে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন শহীদ হয়েছিল।”

“২০০৯ সালের পর দিনটি যথাযোগ্য গুরুত্বসহকারে পালন করা হয়নি। ২০২৪ সালে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হওয়ার পর থেকে দিনটি ‘শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। আজকের এই বিশেষ দিনে আমরা সেনা হত্যাযজ্ঞে শহীদদের মাগফিরাত কামনা করছি। তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করছি,” যোগ করেন নতুন এই রাষ্ট্রপ্রধান।

এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস), বিবিসি বাংলা এবং দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত সংবাদের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান