📷 ওয়ানম্যান নিউজরুম কোলাজ
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ন্যাশভিলের একটি বাড়িতে একাট্টা হয়েছেন সেখানে বসবাসরত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ছয় নাগরিক; যাদের মধ্যে একজন শিক্ষক, বাকিরা চিকিৎসক। অর্থনীতি পড়ানো লোকটি কোনো রাখঢাক ছাড়াই পাঁচ ডাক্তারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমি নিজেকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ঘোষণা দিলাম। কেউ ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গে যোগ দিতে পারেন। যাঁরা বাংলাদেশের সঙ্গে হাত মেলাবেন না, তাঁরা আমার চোখে পাকিস্তানি, বাংলাদেশের শত্রু।”
পরবর্তীতে শান্তিতে নোবেলজয়ী সেই শিক্ষকের নাম মুহাম্মদ ইউনূস। বর্তমানে যিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। নিজের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে একাত্তরের কর্মকাণ্ড সবিস্তার লিখেছেন ‘ক্ষুদ্রঋণের জনক’ হিসেবে বিশ্বখ্যাতি পাওয়া এই অর্থনীতিবিদ।
শেখ হাসিনার শাসনামলে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইনে সন্নিবেশিত সংজ্ঞানুযায়ী মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন একজন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’। তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের হালনাগাদ করা সংজ্ঞাসহ অধ্যাদেশ প্রকাশের পর তিনি আর এখন যোদ্ধা নন। অর্থাৎ, ২০২৫ সালের ৩ জুন বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারপ্রধান ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হয়ে গিয়েছিলেন।
২০০২ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোটের শাসনামলে প্রণীত এই আইনটি ২০২২ সালে সংশোধনের উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার।
জনরোষে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনার নেতৃত্বাধীন সংসদে পাস হওয়া সেই সংশোধনীতে “যে সকল বাংলাদেশি পেশাজীবী মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশেষ অবদান রাখিয়াছিলেন এবং যে সকল বাংলাদেশি নাগরিক বিশ্বজনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন”—তাদের “বীর মুক্তিযোদ্ধা” হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হয়েছিল। নতুন আইন অনুযায়ী এমন মানুষদের স্রেফ ‘সহযোগী’ বলার সুযোগ রয়েছে।
কী রটে আর কী বটে?
জামুকা আইনের নতুন সংজ্ঞানুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, বা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানের মতো সংগঠকরা আর মুক্তিযোদ্ধা নন বলে সংবাদ পরিবেশন করেছিল দৈনিক প্রথম আলো, সমকালসহ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মূলধারার গণমাধ্যম।
খবরটি ‘ভিত্তিহীন’ উল্লেখ করে ওইসব সংবাদমাধ্যমকে দুঃখ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছিল সরকার। ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ৪ জুন সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেছিলেন, “যেসব সংবাদমাধ্যম ভুল-বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করেছেন, আমরা আশা করব তারা তাদের ভুলত্রুটি সংশোধন করবেন।”
“যেখানে তারা ভুল সংবাদটি ছাপিয়েছেন, ঠিক একই জায়গায় সংশোধনী প্রকাশ করে পাঠকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করবেন। যাদেরকে তারা এই ভুল সংবাদ দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন, তাদের কাছেও দুঃখ প্রকাশ করবেন,” যোগ করে তিনি বলেছিলেন, “ইতিমধ্যেই সরকার থেকে যে প্রজ্ঞাপনটি ইস্যু করা হয়েছে, সেটি শেয়ার করা হয়েছে। এটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে নিজেরাই বুঝতে পারবেন, এই খবরটি ভিত্তিহীন।”
“বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে উদার। সমালোচনাকে আমরা স্বাগত জানাই,” উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা আরও বলেছিলেন, “যারাই এখন থেকে ভুল সংবাদ প্রকাশ করবেন বা প্রচার করবেন, সরকার তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
গণমাধ্যমগুলোর ভাষ্যানুযায়ী, শেখ মুজিব, তাজউদ্দীনসহ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী চার শতাধিক রাজনীতিবিদের (এমএনএ/এমপিএ) মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে। যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এসব সংগঠকের পরিচয় মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। চাউর হওয়ার পর থেকে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ ছিল এই সংবাদ। তুমুল বিতর্কে মেতেছিলেন বাংলাদেশিরা। কিন্তু আসলেই কি শেখ মুজিবের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে?
সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজমের ভাষ্য ছিল, “সশস্ত্রভাবে রণাঙ্গনে যারা যুদ্ধ করেছেন এবং এই যুদ্ধ যারা পরিচালনা করেছেন, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা।” উপদেষ্টা দাবি করেছিলেন, এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে কাউকে বাতিল করা হয়নি। শুধু সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। যিনি যে সুবিধা পাচ্ছেন, তিনি সেই সুবিধা পাবেন। তবে যাঁরা সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন, তাঁরাই শুধু ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হবেন। অন্যরা ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ বিবেচিত হবেন।
উপদেষ্টা আরও বলেছিলেন, “মুজিবনগর সরকারের যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। তবে তালিকা যাচাই–বাছাই করতে গিয়ে দেখা যায়, মুজিবনগর সরকারের কিছু কর্মচারী বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। এখন থেকে তাঁরা হবেন মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী।”
ক্ষয় রোধ না ক্ষত বৃদ্ধি?
ভিন্নমতালম্বী মুক্তিযোদ্ধাদের অবমূল্যায়ন আর সমগোত্রীয়দের অতিমূল্যায়ন বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। দেশটির জন্মযুদ্ধের বিশালতাকে ক্ষয় বা সীমায়িত করার এই প্রক্রিয়া একদম শুরু থেকে চলমান, স্বাধীনতা সংগ্রামের সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধারা যার সূচনা করেছিলেন। প্রায় সবগুলো নির্বাচিত ও অনির্বাচিত সরকারের বিবিধ নীতি এবং আন্তরিক স্বজনপ্রীতি ক্ষত-বিক্ষত করেছে মুক্তিযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী সেই ইতিহাস।
অমীমাংসিত রয়ে গেছে বহু ঐতিহাসিক বিতর্ক, যার দায় আজও বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা—মানে যারা এখানকার সাধারণ মানুষ। এমনটা ভাবা ভুল হবে নাকি সঠিক, তা বিবেচনার ভার পাঠকের। দয়া করে যে যার সুবিধানুযায়ী ভেবে নিন। আপনার ভাবনার অনুষঙ্গ হিসেবে আমি শুধু কিছু প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, বারবার যেগুলো উঁকি দিচ্ছে আমার মনেও। যেমন, জনযুদ্ধের গণযোদ্ধাদের ‘সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার কি সেই ক্ষয়টা রোধ করতে পারল; নাকি ক্ষতটা বাড়াল?
কিংবা, পাকিস্তানি বাহিনীর এদেশীয় সহযোগীরা ছাড়া একাত্তরের বাকি সবাই কেন মুক্তিযোদ্ধা নন? যার যার জায়গা থেকে তখন প্রত্যেকেই কি যুদ্ধটা করেননি—কেউ স্বাধীনতার পক্ষে, কেউ বিপক্ষে? মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা লোকজনের বাসভবন ছাড়া এমন কয়টি বাড়ি আপনি চেনেন, যেটি একাত্তরে দুর্গে পরিণত হয়েছিল? প্রত্যন্ত গ্রামে গেরিলাদের অন্ন জোগাতে যে নিরীহ গৃহবধূ দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েছিলেন, এমন কেউ কি কখনো কোনো আলোচনায় এসেছেন? গুপ্তবার্তা নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম সাইকেল নিয়ে ছুটে বেড়ানো যে দুরন্ত কিশোর কখনো নিজেকে যোদ্ধা দাবি করে সুবিধা নিতে যাননি; তাঁর মুক্তিযুদ্ধটা কেই-বা জানবে কবে?
আর এখন, কী এক অদ্ভুত অবস্থা! সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার এবং লেখক জহির রায়হানও নতুন সংজ্ঞায় মুক্তিযোদ্ধা নন। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর মতো অনেকে এখন মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী বিবেচিত হবেন। কারণ, ২০২২ সালে সংশোধিত আইনে “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সকল শিল্পী ও কলা-কুশলী এবং দেশ ও দেশের বাহিরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে দায়িত্ব পালনকারী সকল বাংলাদেশি সাংবাদিক” মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী তাদের মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বদের কর্মকাণ্ড ‘যুদ্ধ’, আর সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামকারীরা তাদের ‘সহযোগী’ মাত্র; যোদ্ধা নন!
এখানে উল্লেখ্য, হাসিনার আমলে সংশোধিত আইনে জহির মুক্তিযোদ্ধা বিবেচিত হলেও পৃথক সংজ্ঞায় নির্ধারিত সময়কাল অনুযায়ী তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধের শহীদ’ ছিলেন না। নতুন আইনেও তাঁকে শহীদ বিবেচনার সুযোগ নেই। যদিও বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রামে জহির রায়হানের অবদান কোনো আইনি সীমাবদ্ধতায় মলিন হবে না। তবে আমাদের একাত্তর বিষয়ক জাতিগত চরিত্র ও তার ধারাবাহিকতায় তৈরি হওয়া রাজনৈতিক জটিলতার স্বরূপ বোঝার জন্য এটি দারুণ একটি উদাহরণ।
এখন মুক্তিযোদ্ধা কারা?
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটানো জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া নতুন সংজ্ঞায় কারা ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বিবেচিত হবেন, তা আইনে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটা হুবহু তুলে ধরছি এখানে:
“যাহারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে গ্রামে-গঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, এরূপ সকল বেসামরিক নাগরিক (ওই সময়ে যাদের বয়স সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে); এবং সশস্ত্র বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), পুলিশ বাহিনী, মুক্তি বাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) ও উক্ত সরকার কর্তৃক স্বীকৃত অন্যান্য বাহিনী, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স, আনসার সদস্যরা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন।”
আরও বলা হয়েছে, “হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীর মাধ্যমে নির্যাতিত সব নারী (বীরাঙ্গনা)” বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ ছাড়া “মুক্তিযুদ্ধকালে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ফিল্ড হাসপাতালের সব চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সহকারীরাও” বীর মুক্তিযোদ্ধা বিবেচিত হবেন। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা থেকে “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়া” বাক্যাংশটির সাথে ‘মুজিব বাহিনী’ শব্দবন্ধও বাদ দেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে দেশের অভ্যন্তরে বা প্রবাসে অবস্থান করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপিত করা এবং মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করার প্রয়াসে সংগঠকের ভূমিকা পালন, বিশ্বজনমত গঠন, কূটনৈতিক সমর্থন অর্জন এবং মনস্তাত্ত্বিক শক্তি অর্জনের প্রেক্ষাপটে যেসব বাংলাদেশের নাগরিক প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করেছেন।”
পাঁচ ধরনের সহযোগীর ব্যাখ্যাও অধ্যাদেশে উল্লেখ রয়েছে। সে অনুযায়ী: “যেসব বাংলাদেশি পেশাজীবী মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন এবং যেসব বাংলাদেশি নাগরিক বিশ্বজনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন; যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অধীন কর্মকর্তা বা কর্মচারী বা দূত এবং ওই সরকারের নিয়োগ করা চিকিৎসক, নার্স বা অন্যান্য সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন; মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সঙ্গে সম্পৃক্ত সব এমএনএ বা এমপিএ; যারা পরে গণপরিষদের সদস্য গণ্য হয়েছিলেন; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সব শিল্পী ও কলাকুশলী এবং দেশ ও বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে দায়িত্ব পালনকারী সব বাংলাদেশি সাংবাদিক এবং স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল” মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী হিসেবে বিবেচিত হবে।
উল্লেখ্য, আগের আইনে এই সহযোগীরা মুক্তিযোদ্ধা বিবেচিত হতেন।
গত বছরের ১৫ মে উপদেষ্টা পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছিল নতুন আইনের খসড়া। পূর্ববর্তী আইনের প্রস্তাবনাসহ যেসব অংশে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের’ নাম ছিল, তা বাদ দেওয়া হয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ শব্দবন্ধটিও আর কোথাও নেই।
নতুন আইনে মুক্তিযুদ্ধ বলতে “১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধকে” বোঝানো হয়েছে।
আগের আইনে মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞায় বলা ছিল, “মুক্তিযুদ্ধ অর্থ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়া দখলদার ও হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম ও মুসলিম লীগ এবং তাহাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, মুজাহিদ বাহিনী ও পিচ কমিটির বিরুদ্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধ।”
ইউনূস কি সনদধারী ছিলেন?
প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস কখনো মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়েছেন কি না, তা জানার কোনো চেষ্টা করিনি। তবে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা পড়েছি। ‘গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন’ নামের বইয়ে তিনি লিখেছেন, “২৭ মার্চ আমরা স্থানীয় টেলিভিশন কেন্দ্র ও দৈনিক সংবাদপত্রের সাংবাদিক বৈঠক ডাকলাম। আমি বাংলাদেশ নাগরিক সমিতির সচিব ও দলের মুখপাত্র নির্বাচিত হলাম। স্থানীয় টেলিভিশন কেন্দ্র আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে খবর পরিবেশনের সুযোগ পায় না। তারা আমাদের প্রতিবেদন উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করল। আমরা তাদের কাছে হয়ে উঠলাম তাজা আন্তর্জাতিক খবর সরবরাহকারী, যে খবরের সঙ্গে আবার স্থানীয় কিছু মানুষজন জড়িত আছেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বাকি পাঁচজন সকলেই শহরের হাসপাতালের ডাক্তার। আমরা সবাই একযোগে নিজেদের এমন একটি দেশের নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করছি, যার এখনো জন্মই হয়নি। কী রোমাঞ্চকর সংবাদ!”
ইউনূস লিখেছেন, “সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে আমাদের সাক্ষাৎকার ছাপা হলো। ছবি ছাপা হলো। সেদিন বিকেলে আমরা আবার সমবেত হলাম জিল্লুরের বাড়িতে টিভিতে সন্ধ্যার খবর শোনার জন্য। আমাদের আন্দাজ ঠিক প্রমাণিত হয়েছিল, আমাদের খবর খুব গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হচ্ছিল। স্থানীয় সংবাদে আমার একটি সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো। আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, টেনেসিবাসীদের জন্য আপনার কোনো বার্তা আছে কি? ‘হ্যাঁ, অবশ্যই আছে’—আমি উত্তর দিলাম। বললাম, দয়া করে আপনাদের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্যদের অনুরোধ করে বার্তা পাঠান, যাতে অবিলম্বে পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা যায়। আপনাদের পাঠানো অস্ত্রশস্ত্র নির্দোষ নিরস্ত্র বাংলাদেশের নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করতে সাহায্য করছে। আপনাদের এই নির্দয় গণহত্যা বন্ধ করতে পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আপনাদের প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানান।”
ইউনূস উল্লেখ করেন, “২৯ মার্চ ওয়াশিংটনে বাঙালিদের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে এর আগের দিন ২৮ মার্চ আমি ওয়াশিংটনে পৌঁছে যাই। এরপর ২৯ মার্চ বিকেলে বিক্ষোভ দেখাবার জন্য আমরা সবাই সমবেত হলাম ক্যাপিটল ভবনের সিঁড়িতে। আমার বানানো ফেস্টুন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে বহু বাঙালি এসেছিলেন বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিতে। নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, ডেট্রয়েটের বাঙালিরা সমবেত হন।”
“ম্যাজিকের মতো কাজ হলো। ক্যাপিটাল হিলের সিঁড়িতে সে বিক্ষোভ প্রদর্শন এক ঐতিহাসিক ঘটনা। আমেরিকান আইনসভার সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলাম আমরা। সম্মিলিত সহায়ক গোষ্ঠী আমাদের অবস্থা ও দাবি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য সময় নিলেন। সেদিন সংবাদমাধ্যমগুলো বিশেষভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। টেলিভিশনের ক্যামেরা গোটা মিছিলের ছবি তুলেছিল, তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিল; সাংবাদিকদের কাছে দিনটি হয়ে উঠেছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ,” যোগ করেন তিনি।
বইটির বরাত দিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)। সেখানে বাসস লিখেছিল, “১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তখন যুক্তরাষ্ট্রের মিডল টেনেসি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত। সেখানে জন্মভূমির স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে নেমে পড়েন তিনি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সেখানে স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন জোগাতে বাঙালিদের সংগঠিত করা, তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি মার্কিন প্রশাসনসহ জাতিসংঘে কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন।”
মার্কিন সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের খবর পৌঁছে দিতে সেখানকার স্থানীয় পত্রিকা ও টেলিভিশনের সম্পাদক এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কাজটি নিয়মিত করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সমর্থন জোগাতে ‘বাংলাদেশ ইনফরমেশন সেন্টার’ পরিচালনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিলে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে ‘বাংলাদেশ নিউজলেটার’ প্রকাশ করতেন বলেও বাসস উল্লেখ করেছে।
বাসস আরও লিখেছে, “পরে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে নিযুক্ত হন। একসময় সমাজে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে গড়ে তোলেন গ্রামীণ ব্যাংক। মূলত সমাজ পরিবর্তন ও মানবসেবার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অধ্যাপক ইউনূস ছোটবেলা থেকে কাজ করে চলেছেন। সেই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি যেমন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন, একইভাবে গড়ে তোলেন গ্রামীণ ব্যাংক।” যদিও তিনি আর আইনসিদ্ধ বীরযোদ্ধা নন, তবুও কোটি বাংলাদেশির বহুকাঙ্ক্ষিত এক ভোটযুদ্ধ আয়োজনের মূল ভারটা ছিল তাঁরই কাঁধে।
এরপর কী?
ইতিহাসের গতিপথ কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞার ফ্রেমে চিরকাল আটকে থাকে না। একাত্তরের সেই মহাকাব্যিক ক্যানভাসে অস্ত্র হাতে লড়াই করা সেনানী যেমন সত্য, তেমনি সত্য সেই শিক্ষক, শিল্পী বা সাংবাদিক—যাঁরা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপনের অপেক্ষায় থাকা নতুন অধ্যাদেশ তথা আইনি সংস্কার আদতে এক গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা যেকোনো অধ্যাদেশ পরবর্তী সংসদ গঠনের পর প্রথম বৈঠকেই উত্থাপন করতে হয়। যদি সংসদ এটি অনুমোদন না করে, তবে নির্দিষ্ট সময় পর এর কার্যকারিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলোপ পায়।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়া বাংলাদেশের নতুন সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বীর বিক্রম খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং আরেক প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার সন্তান ইশরাক হোসেন। এমনকি বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একজন কিংবদন্তি সেক্টর কমান্ডারের পুত্র। তাই তাঁরা এই সংজ্ঞার আইনি খুঁটিনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখবেন বলে আশা করা যেতে পারে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস কিংবা জহির রায়হানদের মতো ব্যক্তিত্বদের ‘যোদ্ধা’ থেকে ‘সহযোগী’র কাতারে নামিয়ে আনা কি কেবলই বিধান পরিমার্জন, নাকি এর মাধ্যমে যুদ্ধের বিশালতাকে সংকুচিত করা হচ্ছে? বীরত্বের স্বীকৃতি কেবল অস্ত্রের গর্জনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মেধা ও মননশীল সংগ্রামের মর্যাদা অটুট থাকবে—সেই প্রশ্নের মীমাংসা হয়তো কোনো অধ্যাদেশ করতে পারবে না। আইনের পাতায় সংজ্ঞা বদলাতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে একাত্তরের প্রতিটি অবদানই নিজস্ব মহিমায় ভাস্বর থাকবে। ইতিহাসের রায় শেষ পর্যন্ত সময়ের হাতেই তোলা থাকল।


এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান