মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের জন্য পাকিস্তানি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজিকে (ডানে) নিয়ে যাচ্ছেন ভারতীয় জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা (মাঝে)। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের এই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করেন ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘুনাথ রায় চৌধুরী (রঘু রাই)।
নিউজম্যান, ঢাকা
আজ ১৫ ডিসেম্বর। একাত্তরের এ দিনটি ছিল বুধবার। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরকে মোকাবিলায় প্রস্তুত হওয়া ভারতীয় নৌবাহিনীর সমর্থনে এ দিন সোভিয়েত রণতরীর ২০টি জাহাজ ভারত মহাসাগরে অবস্থান নেয়। এরপরই মার্কিন নৌবহর নিজেদের গুটিয়ে ফেলে। ফলে পাকবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির মনে যুদ্ধে সহায়তা পাওয়ার যেটুকু আশা ছিল, তা শেষ হয়ে যায়।
তখন রণাঙ্গনে চলছে মুক্তিকামী জনতার বিজয়োল্লাস। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলায় অবরুদ্ধ ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। জয় তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
একাত্তরের এই দিনে চারদিক থেকে পরাজিত হতে হতে পাকিস্তানি বাহিনী বুঝে ফেলে—যুদ্ধে তাদের পরাজয় নিশ্চিত। ফলে সকালে সব আশা ছেড়ে দিয়ে শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে বিদেশি দূতাবাসগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেন নিয়াজি। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মীরা সেই প্রস্তাব পাঠিয়ে দেন দিল্লির মার্কিন দূতাবাসে। সেখান থেকে তা পাঠানো হয় ওয়াশিংটনে। এরপর ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাসের কাছে জানতে চায়, নিয়াজির এই প্রস্তাবে পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সমর্থন আছে কি না।
প্রস্তাবের মূল কথা ছিল— “আমরা যুদ্ধ বন্ধ করেছি। তবে বাংলাদেশে অবস্থানরত গোটা পাকবাহিনীকে চলে যেতে দিতে হবে, কাউকে গ্রেপ্তার করা চলবে না।” কিন্তু ভারত সরকার এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের পাকবাহিনীকে এই আশ্বাস দিতে রাজি হয় যে, যুদ্ধবন্দিদের জেনেভা কনভেনশন অনুসরন করা হবে।
পাকি জেনারেল নিয়াজির শর্তসাপেক্ষ আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পেয়ে ভারতীয় বাহিনী মনে করে এটি তার একটি কৌশল। নিয়াজির প্রস্তাবকে তাদের কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব বলেই মনে হয়, আত্মসমর্পণ নয়। কিন্তু মিত্রবাহিনী বিনাশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছুতেই রাজি নয়। পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজির দেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের জবাবে বিকেলে জেনারেল স্যাম হরমুসজি ফ্রামজি জামশেদজি মানেকশ পাকবাহিনীকে জানিয়ে দেন যে, শর্তহীন আত্মসমর্পণ না করলে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া হবে না।
প্রস্তাবের প্রতি মিত্রবাহিনীর আন্তরিকতার নিদর্শন হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটা থেকে ১৬ ডিসেম্বর সকাল নয়টা পর্যন্ত ঢাকার ওপর বিমান হামলা বন্ধ রাখা হবে বলেও পাকিস্তানি জেনারেলকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি আত্মসমর্পণ করলে মিত্রবাহিনী কোনো প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াবে না—এমন আশ্বাসও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে হুঁশিয়ার করে আরও বলা হয়, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্তহীন আত্মসমর্পণ না করলে ১৬ ডিসেম্বর সকাল নয়টা থেকে সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমণ করা ছাড়া মিত্রবাহিনীর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।’
জেনারেল নিয়াজি তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে পাকিস্তান হেডকোয়ার্টারকে অবহিত করেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ১৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় জেনারেল নিয়াজিকে নির্দেশ দেন—ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের জন্য যে সব শর্ত দিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার স্বার্থে তা মেনে নেওয়া যেতে পারে। এ নির্দেশ পেয়ে সেনানিবাসে নিজের কক্ষে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিয়াজি। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে রাত দুইটার মধ্যে বাংলাদেশের সর্বত্র অবস্থানরত হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে তারবার্তা পাঠান। এ দিনটি মূলত দখলদার বাহিনীর চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের দিন-ক্ষণ নির্ধারণের মধ্য দিয়েই অতিবাহিত হয়।
একই দিনে ঢাকার বাসাবোতে ‘এস ফোর্স’-এর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। জয়দেবপুরেও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক আক্রমণে তারা পর্যুদস্ত হয়। টঙ্গী, ডেমরা, গোদনাইল ও নারায়ণগঞ্জে মিত্রবাহিনীর আর্টিলারি আক্রমণে বিপর্যস্ত হয় দখলদার বাহিনী। এ ছাড়া এ দিন সাভার পেরিয়ে গাবতলীর কাছাকাছি নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয় মিত্রবাহিনীর একটি ইউনিট।
ভারতীয় ফৌজের একটি প্যারাট্রুপার দল পাঠিয়ে ঢাকার মিরপুর ব্রিজে পাকিস্তানি ডিফেন্স লাইন পরখ করে নেওয়া হয়। রাতে যৌথ বাহিনী সাভার থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পথে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কাদেরিয়া বাহিনী ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। রাত দুইটার দিকে যৌথ বাহিনী পাকসেনাদের মুখোমুখি হয়। ব্রিজ দখলের জন্য যৌথ বাহিনী প্রথমে কমান্ডো পদ্ধতিতে আক্রমণ শুরু করে। ব্রিজের ওপাশ থেকে পাকবাহিনী মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ করতে থাকে। এ সময় যৌথ বাহিনীর আরেকটি দল এসে পশ্চিম পাড় দিয়ে আক্রমণ চালায়। সারারাত তুমুল যুদ্ধ চলে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যে কোনো মুহূর্তে তারা আত্মসমর্পণ করবে। চারদিক থেকে ঢাকা অবরুদ্ধ। এ দিন গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখা হয়— “ইয়াহিয়ার সৈন্যবাহিনীকে তাড়িয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীরা মুক্ত বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছেন। দেশের ভেতরে বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত লোকজনও বাড়িতে ফিরে আসছেন।” এ সময় জামায়াতে ইসলামি, পিডিপি ও নেজামে ইসলামীর অনেক নেতাকর্মী মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। আবার অনেকেই আত্মগোপনে চলে যায়।
চট্টগ্রাম রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনী কুমিরার দক্ষিণে আরও কয়েকটি স্থান হানাদারমুক্ত করে। সন্ধ্যায় মুক্তিযোদ্ধারা চট্টগ্রাম শহরের প্রথম রক্ষাব্যূহ ভাটিয়ারীতে আক্রমণ চালায়। সারারাত মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ চলে। ভাটিয়ারী থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে যৌথ বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে রংপুরের দিকে অগ্রসর হয়। রাতে তারা চারদিক থেকে রংপুর শহর ঘিরে ফেলে। পরের দিন রংপুর সেনানিবাসে আক্রমণ করার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হওয়ায় তার আর প্রয়োজন হয়নি।
ফরিদপুর অঞ্চলে যৌথ বাহিনী কামারখালীর পাকঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালায়। সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে তারা অবস্থান ছেড়ে ফরিদপুর শহরের দিকে পালাতে থাকে। যৌথ বাহিনী তাদের পিছু ধাওয়া করে। পথে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে স্বেচ্ছায় শত্রুসেনারা আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণকারী অফিসারদের মধ্যে একজন মেজর জেনারেল ছিলেন।
একই দিনে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ পাকিস্তানি কমান্ডারদের আত্মসমর্পণের জন্য শেষবারের মতো নির্দেশ দেন। জেনারেল মানেকশ বলেন, “আমি আবার বলছি, আর প্রতিরোধ করা নিরর্থক। ঢাকা গ্যারিসন এখন সম্পূর্ণভাবে আমাদের কামানের আওতায়।” এই দিনে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরী এবং বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর নিহত হন।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল আর্কাইভ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঘাতকের দিনলিপিসহ বিবিধ তথ্যভাণ্ডার।
পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত বাংলাদেশ
কী লেখা ছিল আত্মসমর্পণ দলিলে?
দিনে প্রাদেশিক সরকারের পদত্যাগ, রাতে বুদ্ধিজীবী হত্যা
গভর্নর হাউসে হামলা, রেডক্রসের আশ্রয়ে পাকিস্তানি কর্তারা।
বিজয়ের প্রাক্কালে জাতির মস্তিষ্কে আঘাত
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ।


এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান