সামরিক হেলিকপ্টারের মধ্যে পাকিস্তানি জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির (বামে) এই ছবিটি তুলেছেন আব্বাস আত্তার নামের এক ইরানি আলোকচিত্রী।
নিউজম্যান, ঢাকা
আজ ১০ ডিসেম্বর। একাত্তরের এই দিনটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের শেষ শুক্রবার। মানচিত্র থেকে এই নামটি মুছে যাওয়ার তখন আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাদের সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনীর অবিরাম আক্রমণের মুখে আত্মসমর্পণে উদ্যত হন পাকিস্তানিদের নিয়োগ করা গভর্নর আবদুল মোত্তালেব মালেক (ডা. এমএ মালিক) ও তার সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী।
পাকবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজি এদিন পালানোরও চেষ্টা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নির্দেশে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা করা সপ্তম নৌবহর তখন মালাক্কা প্রণালীতে অবস্থান করছিল। এদিকে ঢাকায় পরিকল্পিত চূড়ান্ত হামলা চালিয়ে শত্রুদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছিল যৌথবাহিনী। মিত্রবাহিনীর বিমানগুলো এদিন ঢাকা বেতার কেন্দ্র স্তব্ধ করে দেয় এবং বোমা ও রকেট ছুড়ে বিধ্বস্ত করে দেয় ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর।
মিত্রবাহিনীর বিমান আক্রমণে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অচল হয়ে পড়ে। পাকবাহিনীর সৈন্যবোঝাই কয়েকটি জাহাজ তীরে এসে ভিড়লেও তারা মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে পড়ে। এর মধ্যে একটি জাহাজ সাদা পতাকা উড়িয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে পালানোর চেষ্টা করে। সম্মিলিত বাহিনী উত্তরাঞ্চলেও সাফল্য অর্জন করে। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে দিনাজপুর, রংপুর ও সৈয়দপুরে শত্রুবাহিনীকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যৌথবাহিনী এই তিন শহর ছাড়া রংপুর ও দিনাজপুর জেলা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করে।
রাতে পাকিস্তানি বাহিনী জামালপুর গ্যারিসন ছেড়ে ঢাকার দিকে পালানোর সময় শহরের অদূরে যৌথবাহিনীর মুখোমুখি হয়। এ যুদ্ধে প্রায় দেড় হাজার পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। বাকিরা আত্মসমর্পণ করে। এমন সময়ে নিয়াজির গোপন অভিসন্ধি ফাঁস করে দেয় বিবিসি। নিয়াজি নিজের দুর্বলতা ঢাকতে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এসে বলেন, “কোথায় বিদেশি সাংবাদিকরা? আমি তাদের জানাতে চাই—আমি কখনো আমার সেনাবাহিনীকে ছেড়ে যাব না।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লিতে এক বিশাল জনসভায় ভাষণদানকালে বলেন, “যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত জাতিসংঘের আহ্বান ভারত প্রত্যাখ্যান করেনি বা গ্রহণও করেনি। প্রস্তাবটি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজয় শুধু তখনই সম্ভব হবে, যখন বাংলাদেশ সরকার কায়েম হবে এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত এক কোটি শরণার্থী তাঁদের বাস্তুভিটায় ফিরে যেতে পারবে।”
অন্যদিকে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি যৌথ সামরিক কমান্ড গঠন ও রণকৌশল গ্রহণের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। ভারতের পক্ষে সই করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।
একই দিন গভর্নর মালেকের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এবং মুখ্য সচিব পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তা মুজাফফর হোসেন ক্যান্টনমেন্টে জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধির কাছে আত্মসমর্পণের আবেদন হস্তান্তর করেন। এতে কৌশলে ‘আত্মসমর্পণ’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘অস্ত্রসংবরণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
এই আবেদনে আরও লেখা ছিল—যেহেতু সংকটের উদ্ভব হয়েছে রাজনৈতিক কারণে, তাই রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে এর নিরসন হতে হবে। আমি তাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দ্বারা অধিকারপ্রাপ্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ঢাকায় সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাই। আমি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানাই।
এই আবেদন ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধি পল মার্ক হেনরির হাতে দেওয়া হয়। পাকিস্তানি মহলে বার্তাটি ‘মালিক–ফরমান আলী বার্তা’ নামে পরিচিতি পায়। রণাঙ্গনের বাস্তব চাপে এদিন পাকিস্তান নিজেই যখন সম্মানজনকভাবে সৈন্য প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়, তখন সেই উদ্যোগকে সমর্থন না করে মার্কিন সরকার বরং তা রদ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এদিন একটি দুঃখজনক ঘটনাও ঘটে। খুলনার রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামে রূপসা নদীতে নৌবাহিনীর জাহাজ পলাশ নিয়ে খুলনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর ভারতীয় বিমানবাহিনীর সঙ্গে এক ভুল-বোঝাবুঝিজনিত হামলায় গোলার আঘাতে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন।
ঢাকায় কারফিউ জারি করে আল-বদর বাহিনী তাদের কুখ্যাত বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ইত্তেফাক-এর নির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দিন হোসেন ও পিপিআইয়ের চিফ রিপোর্টার নাজমুল হককে বাসা থেকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায়।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল আর্কাইভ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঘাতকের দিনলিপিসহ বিবিধ তথ্যভাণ্ডার।
পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত বাংলাদেশ
কী লেখা ছিল আত্মসমর্পণ দলিলে?
কেন পিছু হটেছিল মার্কিন নৌবহর?
আত্মসমর্পণের পথে পাকিস্তানি বাহিনী।


এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান