![]() |
|
ঢাকায় আত্মসমর্পণের পূর্ব মুহুর্তে
আরোরা, নিয়াজিসহ অন্যান্যরা।
|
আজ ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের ৪৮তম বিজয় দিবস। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ের ৪৭ বছর পূর্ণ হলো আজ। একাত্তরে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে এই দিনে আসে কাঙ্খিত বিজয়। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ঔপনিবেশিক শত্রুমুক্ত হয় বাংলার মাটি। পৃথিবীর বুকে মাথা তোলে বাংলাদেশ নামের নতুন একটি দেশ। মুক্তির জয়গানে মুখর কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আজ স্মরণ করেছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সেই অকুতোভয় বীরদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
জাতীয় জীবনে নানা সংকট আর অনিশ্চয়তা থাকলেও আজ ভোরে পুব আকাশে যে নতুন সূর্য উঠেছে তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে এ দিনটি গৌরব ও আনন্দের। বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ড. নীহার রায় রচিত ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ থেকে জানা যায় যে, একমাত্র রাজা শশাঙ্ক এবং জালালুদ্দিন যদু ছাড়া আর কোনো বাঙ্গালীই বঙ্গ বা বাংলাদেশ শাসন করেননি । পাল ও সেন বংশও ছিল বহিরাগত। মুসলিম আমলের ইসলাম খাঁ, শায়েস্তা খাঁ, মীর জুমলাসহ সকল শাসকই ছিলেন অবাঙ্গালী। নবাব আলীর্বদী খাঁ ও এসেছিলেন দাক্ষিণাত্য থেকে। নবাব সিরাজউদ্দৌলারও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে কোন সংযোগ ছিল না।’
এরপর ১৯০ বছরের উপনিবেশবাদী বৃটিশ শাসন । ১৯৪৭ সালে মুক্তির খোয়াবে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ ধ্বনি তুলে এই বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ ও আমজনতা ‘পাকিস্তান’ নামক এক বিচিত্র ও বিষম রাষ্ট্র গঠনে কায়েদে আজমের সহযোগী হলেও প্রকৃত স্বাধীনতা পেলেন না । তাই তারা আবার ধ্বনি তুলল ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা’।
বৃটিশ শাসকরা যেভাবে ভারতবর্ষকে শাসন-শোষন করেছিল, তার চেয়েও ভয়াবহ কায়দায় পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক-শোষক গোষ্ঠী বাংলাদেশকে তাদের নির্মম উপনিবেশ শোষনের লীলাক্ষেত্রে পরিনত করেছিলো। এই শোষন -বৈষম্যের ভয়াবহতা সর্বপ্রথম বিধৃত হয় লন্ডন থেকে ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত পাকিস্তানে নিষিদ্ধকৃত ‘আন হ্যাপি ইস্ট-পাকিস্তান’ শীর্ষক বইয়ে।
![]() |
| বিজয়ের পর ঢাকার জনতাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। |
অর্থনৈতিক শোষন বৈষম্যের পাশাপাশি চলছিল বাঙ্গালীর ভাষা ও সংস্কৃতির উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ ও তথাকথিত মুসলমানিকরন প্রকল্প। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, তাদের এই কাজে সহযোগী ছিল এদেশেরই কিছু কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবী । বস্তুত পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক শোষক গোষ্ঠীর এই ক্রমবর্ধমান শোষন-বৈষম্য ও বাঙালীর ভাষা ও সংস্কৃতির উপর নগ্ন হস্তক্ষেপের একমাত্র ও অনিবার্য পরিনতিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভব। তাদের সে অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে দামাল বাঙালি। ধাপে ধাপে আঘাত হানতে থাকে শাসনযন্ত্রে।
![]() |
| আত্মসমর্পণের খণ্ডচিত্র। |
স্বাধীনতা অর্জিত হলেও গত ৪৭ বছর জাতির চলার পথ মসৃণ ছিলো না কখনো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়া, দারিদ্র্য ও দুর্নীতি থেকে মুক্তির সংগ্রামের পাশাপাশি একইভাবে চলেছে সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম, যুদ্ধাপরাধের বিচার, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ আন্দোলন। এসব আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যেই মোকাবিলা করতে হয়েছে প্রবল বন্যা, ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের। এই বন্ধুর পথপরিক্রমায় অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শত বাধা-প্রতিবন্ধকতাতেও হতোদ্যম হয়নি এ দেশের সংগ্রামী মানুষ। হারায়নি সাহস। লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে অব্যাহত আছে বাঙালির এগিয়ে যাওয়া।
বিজয় উদযাপনে আজ সকাল থেকেই সারা দেশে পথে নেমেছে উৎসবমুখর মানুষ। শহীদদের স্মরণ করে বিনম্র শ্রদ্ধায় দেশের সব স্মৃতিসৌধ ভরিয়ে দিয়েছে ফুলে ফুলে। সব বয়সী মানুষ সমবেত হয়েছে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে। শ্রদ্ধার ফুলে ঢেকে গেছে সৌধের বেদি।
![]() |
| আত্মসমর্পণের খণ্ডচিত্র। |
বিজয় দিবস বাংলাদেশে বিশেষ দিন হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের সর্বত্র পালন করা হয়। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই দিনটিকে বাংলাদেশে জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। প্রথম বছরের বিজয় দিবস থেকেই কার্যকর হয়েছিলো ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়া এ দেশের প্রথম সংবিধান।
এই বার্তা পাঠানোর কিছু আগে মেজর জেনারেল নাগরার বাহিনী কাদের সিদ্দিকী বাহিনীকে সঙ্গে করে মিরপুর ব্রীজে হাজির হন এবং সেখান থেকে নাগরা পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজিকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। নিয়াজি আত্মসমর্পণের ইচ্ছা ব্যক্ত করার পর সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে নাগরার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা শহরে প্রবেশ করে।
![]() |
| আত্মসমর্পণ দৃশ্য। |
পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করার জন্য ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চীফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব মধ্যাহ্নে ঢাকা এসে পৌঁছান। বিকেল চারটার আগেই বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর দুটি ইউনিটসহ মোট চার ব্যাটালিয়ান সৈন্য ঢাকা প্রবেশ করে। সঙ্গে কয়েক সহস্র মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকার জনবিরল পথঘাট ক্রমে জনাকীর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে ‘জয় বাংলা’ ধ্বণিতে মুখরিত চারিদিক। বিকেল চারটয় ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান ও ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম-কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, বাংলাদেশের ডেপুটি চীফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খোন্দকার এবং ভারতের অপরাপর সশস্ত্রবাহিনীর প্রতিনিধিরা ঢাকা অবতরণ করেন।
রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিকেলে চারটা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক জোন-বি এবং ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার নিয়াজির নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ করে ৯১ হাজার ৫৪৯ পাক হানাদার বাহিনী। এ কারণেই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ -বাঙ্গালীর হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জল দিন।
![]() |
| আত্মসমর্পণের পরে নিয়াজি। |
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। বিশ্বের বুকে স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দিন। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী নিয়ে স্বাধিকারের জন্য আন্দোলন শুরু হয়েছিলো তা পূর্ণতা পায় ১৯৭১ সালের ৯ মাসব্যপী মুক্তিযুদ্ধে। যে যুদ্ধ পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। যে যুদ্ধ তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো। এ যুদ্ধাবস্থার শেষ অধ্যায়ে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছিল চীনকে সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে। এটা বুঝতে পেরে সোভিয়েত ইউনিয়ন চীন সীমান্তে সেনা মোতায়েন শুরু করে। তখন চীনের তাদেরকে আটকানোর শক্তি ছিলো না। তাই চীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে নিজেকে বিরত রাখে।
১৪ ডিসেম্বরই বোঝা গিয়েছিল যে পাকিস্তানি বাহিনীর মরণঘণ্টা বেজে গেছে। ঢাকা থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে বার্তা পাঠানোর সংখ্যা সেদিন থেকেই অনেক বেড়ে গিয়েছিলো আকস্মিক ভাবে। এই সব বার্তায় ফুটে উঠছিলো চরম হতাশার সুর। সকাল ১০টায় প্রেরিত এক বার্তায় বলা হয়, ‘আমরা আশ্বাসের ওপর বেঁচে আছি। কিছু ঘটবে কী না অনুগ্রহ করে জানান, যা ঘটবার সেটা অতি দ্রুত হতে হবে।’ আরেক বার্তায় বলা হয়, ‘আমাদের কোনো মিসাইল নেই, আমরা কীভাবে গোলা নিক্ষেপ করব? কোনো বিমানবাহিনী নেই। বিমান হামলা হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার কারণ।’
![]() |
| আত্মসমর্পণের খণ্ডচিত্র। |
১৫ ডিসেম্বর দিনটি শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে সরকারবিহীন পরিস্থিতিতে এবং বাতাসে পাওয়া যাচ্ছিল আত্মসমর্পণের গন্ধ। ভেতরের খবর অবশ্য সবার জানা ছিলো না। আগের দিন বিকেলে গভর্নর ও নিয়াজির কাছে প্রেরিত বার্তায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জানান, ‘আপনারা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যখন আর প্রতিরোধ কোনোভাবেই সম্ভব নয়, সেটা কোনো কাজের কথাও হবে না। এখন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সব রকম ব্যবস্থা আপনাদের নেওয়া উচিত।’ তবে সর্বশেষ এই বার্তাতে আত্মসমর্পণ কথাটা ঊহ্য রাখা হয় এবং দায়-দায়িত্ব চাপানো হয় প্রাদেশিক সরকার ও সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কম্যান্ডের ওপর।
সে সময় কী ঘটছিল পর্দার অন্তরালে তার এক বিবরণ দিয়েছেন ঢাকাস্থ জাতিসংঘ উদ্বাস্তু বিষয়ক কর্মকর্তা জন কেলি। ইস্টার্ন কম্যান্ডের হেডকোয়ার্টারসে জেনারেল নিয়াজি চাইছিলেন রাওয়ালপিন্ডি থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশ আসুক আত্মসমর্পণের জন্য। ১৫ ডিসেম্বর সকালে তিনি গভর্নর ড. আব্দুল মুত্তালিব মালিকের কাছ থেকে চিঠি পেয়েছিলেন ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
![]() |
| যুদ্ধবন্দী পাকসেনারা। |
নিয়াজি পিন্ডিতে জেনারেল হামিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। জেনারেল হামিদ তাকে ‘নির্দেশমতো কাজ করতে’ বলেন। নিয়াজি আকুল হয়ে প্র্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে কথা বলতে চান। দেশের এই গুরুতর পরিস্থিতিতে ইয়াহিয়ার তখন অন্য দশা।
নিয়াজি লিখেছেন, ‘জেনারেল হামিদ বললেন তিনি (ইয়াহিয়া) বাথরুমে গেছেন। আদতে তিনি বাথরুমে ছিলেন না, অতিরিক্ত মদ্যপানে তার তখন বেসামাল অবস্থা। এরপর এয়ার মার্শাল রহিম খান আমার সঙ্গে কথা বলেন, তাকেও মনে হচ্ছিলো মাতাল। তিনি চাপ দেন আমি যেন প্রেসিডেন্টের হুকুম তামিল করি।’ এরপরই মালিক-ফারমান আলীর তৈরী করা লড়াইয়ে ক্ষান্ত দেওয়ার বার্তা ভারতীয়দের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা নেন নিয়াজি।
![]() |
| হতাশ বেসামরিক পশ্চিম পাকিস্তানীরা। |
জেনারেল নিয়াজির অফিসে এসে জেনারেল জ্যাকব লক্ষ্য করেন যে, নিয়াজি আর জেনারেল নাগরা পাঞ্জাবী ভাষায় পরস্পরকে একটার পর একটা স্থুল ও আদি রসাত্মক কৌতুক উপহার দিচ্ছেন। সেখানে আরো উপস্থিত ছিলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী, জেনারেল মোহাম্মদ জামসেদ খান, রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ ও এয়ার ভাইস মার্শাল ইনাম উল হক।
নিয়াজির সঙ্গে আলোচনার আগে জ্যাকব জেনারেল জি সি নাগরাকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভারতীয় সৈনিক ঢাকায় আনার নির্দেশ দেন এবং ঢাকার নিরাপত্তা, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি যেমন গার্ড অফ অনার, টেবিল-চেয়ার ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে পাঠিয়ে দেন। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে আত্মসমর্পণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
![]() |
| আত্মসমর্পণের খণ্ডচিত্র। |
পিনপতন নীরবতার মধ্যে কর্নেল খারা আত্মসমর্পণের শর্তগুলো পড়ে শোনান এবং খসড়া কপিটি জেনারেল নিয়াজিকে দেন। পাকিস্তানিরা ধারণা করেছিলেন যে আত্মসমর্পণ নয়, যুদ্ধবিরতি হবে। আত্মসমর্পণের সংবাদ পেয়ে তারা বেশ হতাশ হয়ে পড়ে। জেনারেল ফরমান আলী যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের বিরোধিতা করেন। তিনি ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পক্ষে মত দেন। জেনারেল নিয়াজি দলিলটি অন্যদের দেখার জন্য দেন। কেউ কেউ কিছু পরিবর্তনের কথা বলেন।
![]() |
| নতজানু নিয়াজি। |
জেনারেল জ্যাকব জানান, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে রেসকোর্স ময়দানে। সেখানে প্রথমে ভারত ও পাকিস্তানি বাহিনীর সম্মিলিত দল জেনারেল আরোরাকে গার্ড অব অনার প্রদান করবে। এরপর আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষর হবে এবং জেনারেল নিয়াজি তার অস্ত্র ও পদবির ব্যাজ খুলে জেনারেল আরোরার কাছে হস্তান্তর করবেন।
আত্মসমর্পণের পদ্ধতির কিছু কিছু ব্যবস্থায় জেনারেল নিয়াজি গররাজি ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান তার অফিসেই হোক। শর্তগুলোর বিষয়ে জেনারেল জ্যাকবের অনড় অবস্থানের কারণে শেষে জেনারেল নিয়াজি সবই মেনে নেন। তবে আত্মসমর্পণের পরও নিরাপত্তার জন্য তার অফিসার ও সৈনিকদের ব্যক্তিগত অস্ত্র নিজেদের কাছে রাখার অনুমতি চান।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে সাধারণত বিজিত সেনাপতি বিজয়ী সেনাপতির সদর দপ্তরে গিয়ে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর দেন ও অস্ত্র সমর্পণ করেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এর ব্যতিক্রম ঘটানো হয়। এখানে বিজয়ী সেনাপতি বিজিত সেনাপতির এলাকায় গিয়ে জনসমক্ষে অত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন।
![]() |
| বিজয়োল্লাস। |
আবদুল করিম (এ কে) খন্দকার আরো লিখেছেন, হেলিকপ্টারে করে পড়ন্ত বিকেলে আমরা তেজগাঁও বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করি। অবতরণ করার সময় দেখি হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তেজগাঁও বিমানবন্দরে জেনারেল নিয়াজী, জেনারেল জ্যাকব এবং আরো কিছু পাকিস্তানি ও মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তা আমাদের অভ্যর্থনা জানান। এরপর জিপে করে আমরা রমনা রেসকোর্স ময়দানে রওনা হই। রেসকোর্সে আমি জেনারেল আরোরার সঙ্গে তার জিপে করে যাই। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, মানুষের মুখচ্ছবিতে প্রশান্তির ছায়া। রমনার চারপাশে মানুষের ব্যাপক ভিড়। এমন পরিস্থিতিতে ভিড় ঠেলে আমরা উপস্থিত হলাম রমনা ময়দানের সেই নির্দিষ্ট স্থানটিতে।
অনুষ্ঠানটি ছিল অনাড়ম্বর এবং এটি অল্পসময়ে শেষ হয়। অনুষ্ঠানে মাত্র দুটি চেয়ার আর একটি টেবিল ছিল। একটি চেয়ারে জেনারেল নিয়াজি ও অন্যটিতে জেনারেল আরোরা বসলেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি খুব সুশৃঙ্খলভাবে হয়নি। মানুষের ভিড়ে অতিথিদের দাঁড়িয়ে থাকাটা কঠিন ছিল। আমি, ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার এডমিরার এসএম নন্দ ও পূর্বাঞ্চল বিমানবাহিনীর কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরি চান্দ দেওয়ান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর পাশেই ছিলেন পূর্বাঞ্চল সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল এফ আর জ্যাকব। আমি জেনারেল আরোরার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অশোক রায় আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যদিও ভিড়ের চাপে আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারছিলাম না।
![]() |
| বিজয়ের আবেগ। |
আত্মসমর্পণ দলিলের লেখা ছিল, ‘পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সকল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো। পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্রসমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে।’
দলিলে বলা হয়, ‘দলিলটি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড লেফটেন্যান্ট-জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীন হবে। নির্দেশ না মানলে তা আত্মসমর্পণের শর্তের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে এবং তার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের স্বীকৃত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আত্মসমর্পণের শর্তাবলীর অর্থ অথবা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।’
দলিলে আরো লেখা ছিলো যে, ‘লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশনের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন এবং আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুবিধার অঙ্গীকার করছেন। লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীন বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের সুরক্ষাও দেওয়া হবে।’
![]() |
| বিজয়োল্লাস। |
আরো পড়ুনঃ
- ভারত মহাসাগরে সোভিয়েত রণতরী
- যেদিনের ক্ষত ঘুচবে না কখনো
- পদত্যাগ করে প্রাদেশিক সরকার
- ঢাকার ১৫ মাইলের মধ্যে মিত্রবাহিনী
- যুক্তরাষ্ট্রের হুমকীর মুখেও অটল ভারত
- বেসামাল প্রেসিডেন্ট, গভর্নর দিশেহারা
- পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ নিয়াজির
- জয় তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র
- যুদ্ধবিরতির তরে মরিয়া ইয়াহিয়া
- পিন্ডি-ইসলামাবাদ পায় পতনের সঙ্কেত
- ভারত-ভুটানের স্বীকৃতি মেলে এই দিন
- ঢাকায় ১২ ঘন্টায় ২৩২ বিমান হামলা!
- রাষ্ট্রসংঘে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার দ্বৈরথ
- নিক্সনকে উদ্বিগ্ন ইয়াহিয়ার চিঠি
- আবারও এলো গৌরবের মাস















এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান