বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তের প্রায় দেড় হাজার গজ ভেতরে অগ্রসর হয়ে একটি গ্রামের খোলা প্রান্তরে পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের অদূরে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাসদস্যরা। এপির আর্কাইভে থাকা ছবিটি ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বরের।

নিউজম্যান, ঢাকা

আজ ৭ ডিসেম্বর। একাত্তরের এ দিনটি ছিল মঙ্গলবার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই দিন সংখ্যাগরিষ্ঠের মতানুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও উভয় পক্ষের সৈন্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি তার রাওয়ালপিন্ডির প্রধান কার্যালয়ে এক গোপন বার্তায় জানায়, তাদের ‘পরিস্থিতি নাজুক’ হয়ে উঠতে পারে। পাকিস্তানের নিযুক্ত গভর্নর ডা. আবদুল মুতালেব মালেকও (এম এ মালিক) নিয়াজির সুরে সুর মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে দুর্গত বার্তা পাঠান।

জেনারেল নিয়াজির গোপন বার্তায় বলা হয়, “চারটি ট্যাংক রেজিমেন্ট সমর্থিত আট ডিভিশন সৈন্য নিয়ে আক্রমণ শুরু করেছে ভারত। তাদের সঙ্গে আরও আছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬০ থেকে ৭০ হাজার বিদ্রোহী (মুক্তিযোদ্ধা)। স্থানীয় জনগণও আমাদের বিরুদ্ধে। দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লাকসাম, চাঁদপুর ও যশোর প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠতে পারে।”

নিয়াজি আরও লিখেছেন, “গত নয় মাস ধরে আমাদের সৈন্যরা কার্যকর অপারেশন চালিয়েছে এবং এখন তারা তীব্র যুদ্ধে অবতীর্ণ। গত ১৭ দিনে যেসব খণ্ডযুদ্ধ হয়েছে তাতে জনবল ও সম্পদের বিচারে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে গেছে। রাজাকারেরা অস্ত্রসহ সটকে পড়ার কারণে সেনা হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের নিজেদের ট্যাংক, ভারী কামান ও বিমান সমর্থন না থাকার ফলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে।”

এই বার্তায় সম্মুখসমরের সৈন্যদের পিছিয়ে এনে প্রতিরোধ ঘাঁটিতে সমবেত করার জন্য পরিকল্পনা প্রস্তাবও পেশ করা হয়। একই দিনে নিয়াজির প্রস্তাবের অনুমোদন দেয় তার হেডকোয়ার্টার। তবে অনুমোদনের অপেক্ষায় বসে থাকেনি যশোর ক্যান্টনমেন্টের পাকিস্তানি সৈন্যরা। ঘাঁটি ছেড়ে আগের রাতেই তারা পালিয়ে যায়। এই দিন মিত্রবাহিনী সেখানে গিয়ে দেখতে পায়, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও রসদভর্তি সুরক্ষিত বাঙ্কার সম্পূর্ণ জনশূন্য। পাকি ‘বীর মুজাহিদ’ চার ব্যাটালিয়ন সৈন্যের এই অন্তর্ধানে কার্যত মুক্ত হয় দেশের পশ্চিমাঞ্চল। যশোর পলায়নপর এই পাকিরাই অন্যান্য স্থানে যুদ্ধরত স্বপক্ষীয় সৈন্যদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। দু-তিনটি স্থান বাদে সর্বত্রই তাদের প্রতিরক্ষার আয়োজনে ধস নামে।

এরই প্রেক্ষিতে গভর্নর ডা. এম এ মালিক এক বার্তায় নিয়াজিকে উদ্ধৃত করে ইয়াহিয়াকে বলেন, “যশোরের বিপর্যয়ের ফলে প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের পতন প্রায় সম্পন্ন এবং মেঘনার পূর্বদিকের পতনও কেবল সময়ের প্রশ্ন। এই অবস্থায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যদি প্রতিশ্রুত বৈদেশিক সামরিক সহায়তা না পৌঁছায় তবে জীবন রক্ষার জন্য বরং ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করা বাঞ্ছনীয়।”
মালেকের এই বার্তা রাওয়ালপিন্ডির জন্য অনেক বেশি দুর্ভাগ্যজনক ছিল। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত থেকে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের দিকে তাদের আকাঙ্ক্ষিত অগ্রাভিযানও কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। উত্তর-পশ্চিম ভারতের কোনো বড় বা মাঝারি ভূখণ্ড দখল করার আগেই পূর্ব বাংলায় তাদের সামরিক নেতৃত্ব যদি আত্মসমর্পণের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে তারাও উদ্বেগে চরমে পৌঁছায়।

মালিকের দুর্গত বার্তাটি সন্ধ্যাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক বাসভবন ওয়াশিংটন ডিসির ‘হোয়াইট হাউসে’ পৌঁছানো হয়। তবে ইরান বা জর্ডান থেকে পাকিস্তানকে যুদ্ধবিমান পাঠানোর মার্কিন প্রচেষ্টা তখনও হালে পানি পায়নি। ভারতকে চাপে ফেলতে এই দিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অর্থনৈতিক সাহায্যদান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। আর সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভ কোনো প্রকার বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই পাক-ভারত সংঘর্ষের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড নিক্সন প্রশাসনের জন্যও সমস্যা তখন কম নয়। মার্কিন সিনেটে এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ডেমোক্র্যাট দলীয় কিছু সদস্য পাকিস্তানি জান্তার গণহত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী নীতির প্রতি মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন এবং জাতিসংঘের বিলম্বিত ও একদেশদর্শী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। মানবতাবাদী কারণ ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরেট জাতীয় স্বার্থের হিসাব-নিকাশ থেকে উপমহাদেশের সংঘর্ষের জন্য ভারতকে এককভাবে দোষী করা ও ভারতের উন্নয়ন বরাদ্দ বন্ধ করা নিয়ে মার্কিন সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার যৌক্তিকতা সম্পর্কে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো নানা প্রশ্ন তোলে।

মার্কিন জনমতের এই প্রচণ্ড বিরুদ্ধতা দেখে ৭ ডিসেম্বর দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরামর্শক হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার নিজে এক অজ্ঞাতনামা ‘সরকারি মুখপাত্র’ সেজে আস্থাভাজন কিছু সাংবাদিকের কাছে পরিবেশিত এক সমীক্ষার দ্বারা মার্কিন জনমত পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। তার এই বেনামি সমীক্ষা মার্কিন জনমতকে কতটুকু বিভ্রান্ত করতে না পারলেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ উপমহাদেশের যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষে সেদিন যে রায় দেয় তা-ই মার্কিন সরকারের পরবর্তী কার্যক্রমের প্রধান মূলধনে পরিণত হয়। তবে এর ফলে যুদ্ধাবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। কারণ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের নৈতিক গুরুত্ব থাকলেও তা অনুসরণের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।

সাধারণ পরিষদ ৭ ডিসেম্বর রাতে (উপমহাদেশে তখন ৮ ডিসেম্বর) অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, উভয় পক্ষের সৈন্য প্রত্যাহার এবং শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের জন্য রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান সম্বলিত এক প্রস্তাব ১০৪-১১ ভোটে গ্রহণ করে। ওই সময় নিউইয়র্কে অবস্থানকারী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী জাতিসংঘের ভূমিকা সম্পর্কে মুজিবনগর সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশের জনগণকে যখন নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছিল তখন জাতিসংঘ নিষ্ক্রিয় ছিল। আক্রমণকারী পাকিস্তানি সৈন্যদের হটিয়ে বাংলাদেশ যখন সাফল্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছে তখন জাতিসংঘ কর্তৃক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। অথচ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। একের পর এক জেলা হচ্ছে হানাদারমুক্ত। চারদিকে উড়ছে বাংলার পতাকা। বাংলাদেশের বিজয় অনিবার্য। জয় বাংলা।”

অন্যদিকে, এই দিন মিত্রবাহিনী সিলেটের নিকটবর্তী বিমানবন্দর শালুটিকরে অবতরণ করার পর মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় সিলেট শহর মুক্ত করে। শেরপুর, হবিগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মৌলভীবাজার, চান্দিনা এবং জাফরগঞ্জও মুক্ত হয়। তবে কুমিল্লা ও লাকসামে তখন তুমুল যুদ্ধ চলছে। এদিন সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এর মধ্যে দেবহাটা উপজেলার শ্রীপুর ও ভোমরা সীমান্তের যুদ্ধে পাকবাহিনীর সাড়ে তিনশ সদস্য মারা যায়। পিরোজপুরের শরণখোলা-মঠবাড়িয়া পতনের পর পাকবাহিনী সুন্দরবন হয়ে পালাবার চেষ্টা করে। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে তারা হুলারহাট হয়ে নৌপথে বরিশাল চলে যায়। একই দিন বিকালের দিকে বগুড়া-রংপুর সড়কের করতোয়া সেতুর দখল নিয়ে পাকি ও যৌথবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়।

রাতে ভারতীয় বেতার কেন্দ্র থেকে পাকিস্তানি জওয়ান ও অফিসারদের উদ্দেশে মনস্তাত্ত্বিক অভিযান শুরু করেন ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল স্যাম হরমুসজি ফ্রামজি জামশেদজি মানেকশ। আকাশবাণী থেকে হিন্দি, উর্দু ও পশতু ভাষায় জেনারেল মানেকশ বাংলাদেশে দখলদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “তোমাদের বাঁচার কোনো পথ নেই। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্য তোমাদের ঘিরে রেখেছে। তোমরা যে নিষ্ঠুর আচরণ করেছ তারা তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। অনেক দেরি হওয়ার আগেই তোমরা আত্মসমর্পণ কর। তোমাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা ও যুদ্ধাস্ত্রের শক্তি অকেজো হয়ে গেছে। এমনকি বাইরে থেকে বিমানের সাহায্য আসার সম্ভাবনাও নেই। অতএব তোমরা অস্ত্র ত্যাগ কর। তোমাদের বাঁচার কোনো পথ নেই। একমাত্র পথ হচ্ছে সম্মিলিত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করা।”

আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকেও বাংলা সংবাদ বুলেটিনের পাশাপাশি বারবার মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ প্রচারিত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেও সকাল-সন্ধ্যায় অতিরিক্ত সময় ধরে যুদ্ধ সমীক্ষা, দেশাত্মবোধক গান ও চরমপত্র প্রচার হতে থাকে।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে টাঙ্গাইলও মুক্ত হয়। একে একে নড়াইল, কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ ও ছাতক ছেড়ে পালিয়ে যায় পাকবাহিনী। মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা ঢাকার আশেপাশের জেলাগুলো থেকে প্রায় প্রতি রাতেই ঢাকার ভেতরে ঢুকে আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকেন। ভীত-সন্ত্রস্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা মিলে তখন তৈরি করছিল বাংলাদেশের কৃতী সন্তানদের তালিকা।

তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল আর্কাইভ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঘাতকের দিনলিপি সহ বিবিধ তথ্যভাণ্ডার।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান