ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনার এই দৃশ্যটি ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বরের। তুলেছিলেন আলোকচিত্রী টেডি চেন।
আজ ৪ ডিসেম্বর। একাত্তরের এই দিনটি ছিল শনিবার। এদিন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রথমবারের মতো উচ্চারিত হয় বাংলাদেশের নাম। বিশ্বসভায় এ নাম উত্থাপন করেন সোভিয়েত নাগরিক ইয়াকফ মালিক। সে সময় জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন রাষ্ট্রদূত ইয়াকফ মালিক। একাত্তরের যুদ্ধের পুরো সময়টা মস্কোর হয়ে তুমুল কূটনৈতিক ঝড়ঝাপটা তাঁকেই সামলাতে হয়েছে।
ইয়াকফকে এদিন প্রেক্ষাপট তৈরী করে দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সিনিয়র জর্জ ডব্লিউ বুশ (পরবর্তীতে যিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন)। পাকিস্তানের পক্ষে তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যে প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারতের মধ্যেকার যুদ্ধ হিসেবে সবার সামনে উপস্থাপন করা।
যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দাবি করে, “এই মূহুর্তে ভারত ও পাকিস্তানকে নিজ নিজ সীমান্তের ভেতর সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে।” যুক্তরাষ্ট্রের এই রণকৌশলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফলে এ লড়াইটা যে তৎকালীন বিশ্বের দুই প্রধান শক্তিশালী রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
যেকোনো মূল্যে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ঠেকাতে হবে, মস্কোর কাছ থেকে এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশ পেয়ে একের পর এক কূটনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেন ইয়াকফ মালিক। বিতর্ক চালিয়ে নিয়ে কালক্ষেপন করা শুরু করেন। এই কাজে তাঁর কাছে মিত্র ছিলেন জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি বাঙালি কূটনীতিক সমর সেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীও তাদের পাশে ছিলেন। আর তাদের বিরোধীতায় পাকিস্তানের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের বুশের পাশাপাশি সক্রিয় ছিলেন চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া। এ সময় থেকে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধটা সামরিক ও কূটনৈতিক; দুই ফ্রন্টেই জোরদার হয়।
একই দিনে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক পত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আহবান জানান। এর আগে জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধ প্রমাণে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের বেশ কয়েকটি জায়গায় বিমান হামলা চালায়। যার জেরে যুদ্ধ ঘোষণা ভারতও পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা চালায়।
নিউইয়র্কে তখন সদ্য সকাল। টেলিফোনে ইয়াকফ মালিক ও সমর সেনের মধ্যে কথা হলো। তারা জানতেন ওয়াশিংটন অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করবে। সে প্রস্তাব এককথায় নাকচ করা সম্ভব হবে না। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে সব রকম যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সিদ্ধান্ত হলো, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিপরীতে পাল্টা প্রস্তাব তুলবে মস্কো। সেখানে সাদামাটা যুদ্ধবিরতি নয়, ‘রাজনৈতিক সমাধানের’ শর্ত অন্তর্ভূক্ত থাকব।
পরদিন, অর্থাৎ একাত্তরের এই দিনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঘোষণা দেন, “আর ধৈর্য ধরার সময় নেই। এখন সময় দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার।” বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের আশ্বস্ত করে ইয়াহিয়া বলেন, “আমাদের বীর সেনানিরা অত্যন্ত দৃঢ়তা নিয়ে শত্রুর হামলা প্রতিহত করে চলেছে। এবার তারা পাল্টা আঘাত হানবে।” জনগণকে শান্ত থেকে প্রতিরক্ষার ব্যাপারে নিজ নিজ কর্তব্য করে যাবার নির্দেশ দিয়ে তিনি আরো বলেন, “আল্লাহু আকবর বলে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়ার সময় এসেছে।”
এরই প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামির আমীর আবুল আলা মওদুদী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে জানান যে, “প্রতিটি দেশপ্রেমিক মুসলমান প্রেসিডেন্টের সাথে রয়েছে।” তবে দিনটি পাকপন্থীদের জন্য মোটেও ভালো ছিল না। এদিনেই লক্ষীপুর হানাদার মুক্ত হয়। তিন নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা শমশেরনগর বিমানবন্দর এবং আখাউড়া রেলস্টেশন দখল করেন।
আট নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা দখল করেন মেহেরপুর। এছাড়া ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে কামালপুর নিজেদের আয়ত্তে আনেন। চার নম্বর সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সি আর দত্ত এবং জেড ফোসের্র সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তারা সিলেটের কানাইঘাটে শক্তিশালী অবস্থান নেয়।
বাংলাদেশে আসার পথে পাকিস্তান নৌ-বাহিনীর সাবমেরিন পিএনএস গাজী বিশাখাপত্তম বন্দরের কাছে আক্রান্ত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ভারতীয় বিমান এবং নৌবাহিনীর জঙ্গি বিমানগুলো বারবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, চালনা প্রভৃতি এলাকায় সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়।
পাকবাহিনীর ছিল দুই স্কোয়াড্রন (২৮টি) জঙ্গি বিমান। এক স্কোয়াড্রন চীনা মিগ-১৯, আর এক স্কোয়াড্রন মার্কিনী স্যাবার জেট। প্রথম রাতের আক্রমণেই তাদের বিমান বহরের প্রায় অর্ধেক বিমান ধ্বংস হয়ে যায়।
ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনীর মিলিত প্রত্যাঘাত, ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণ ও নৌবাহিনীর অবরোধের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধের চরিত্র এদিন থেকে এভাবেই আমূল বদলে যায়।
তবুও এদিন মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার সাফল্যে চট্টগ্রামে উল্লাস প্রকাশ করে মিছিল বের করেছিল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র সংঘ। মিছিল শেষে জিন্নাহ পার্কে আয়োজিত সমাবেশে ব্ক্তারা সেনাবাহিনীর পাশে থেকে আক্রমণ চালিয়ে তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার শপথ নেন।
একইদিনে ইসলামী ছাত্র সংঘের পূর্ব পাকিস্তান প্রধান ও আল-বদর বাহিনীর অন্যতম কমান্ডার আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক ও আল-বদর হাইকমান্ড সদস্য মীর কাশেম আলী হানাদার হিন্দুস্তানী বাহিনীর হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেবার জন্য সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানান। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, “ছাত্র সমাজ ইস্পাত কঠিন শপথ নিয়ে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি লড়ে যাবে।”
শিক্ষামন্ত্রী আব্বাস আলী খান এদিন রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে বেতার ভাষণে বলেন, “পাকিস্তান, ইসলাম ও মানবতার দুশমন সাম্রাজ্যবাদী হিন্দুস্তান তার লিপ্সা মেটানোর জন্য অস্ত্র সজ্জিত হয়ে চারদিক থেকে আমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে।”
দেশটির বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ রহিম বিমানবাহিনী সদস্যদের শত্রুদের চরম শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দেন যাতে তারা একশ বছরেও ভুলতে না পারে। একজন সরকারি মুখপাত্র জানান, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ভারতীয় এলাকায় প্রবেশ করে শত্রু নিধনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই তারা অমৃতসর, পাঠানকোট, অবন্তীপুর, শ্রীনগর ছাড়াও রাজস্থানের উত্তরালি, হরিয়ানার আম্বালা ও উত্তর প্রদেশের আগ্রায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এক সরকারি নির্দেশে সকাল সন্ধ্যা কারফিউ এবং রাতে ব্ল্যাক আউট মেনে চলতে বলা হয়। সেইসঙ্গে বিমান হামলাকালে সবাইকে বেসামরিক প্রতিরক্ষাবিধি মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
একইদিন সবুর খান এক বিবৃতিতে সকল দেশ প্রেমিককে ঐক্যবদ্ধভাবে সেনাবাহিনীর পাশে থেকে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহবান জানান। তিনি বলেন, “মুসলমানরা কখনো পরাজিত হয়নি, এবারও হবে না। বিধর্মীদের যুদ্ধের খায়েশ চিরদিনের জন্য মিটিয়ে দেয়া হবে।”
কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর মতোই ঝুলছে বিচার
মানবাধিকারের যে প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত।
পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত বাংলাদেশ
কী লেখা ছিল আত্মসমর্পণ দলিলে?


এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান