রায়েরবাজার বধ্যভূমির এই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন প্রয়াত রশীদ তালুকদার।
নিউজম্যান, ঢাকা
শোকাবহ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ। বাঙালি জাতির চিন্তা ও দর্শনে গভীর ক্ষত তৈরির দিন। একাত্তরে এই দিন রাতেই বাংলাদেশের প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। নয় মাসের রক্তগঙ্গা পেরিয়ে গোটা জাতি যখন উদয়ের পথে দাঁড়িয়ে, দেশের পূর্ব দিগন্তে বিজয়ের লাল সূর্য উদিত হচ্ছে—ঠিক সেই সময় আসে নির্মম এই দিন।
শত শত জ্ঞানী-গুণী ও মুক্তচিন্তার মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সঙ্গে ছিল তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সদস্যরা। তাদের নির্মমতার শিকার হওয়া জ্ঞানী-গুণী ও মুক্তচিন্তার মানুষদের স্মরণ করতেই প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করা হয়।
দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এই বিশেষ দিবসটি ঘোষণা করেছিলেন। আজও যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যসহকারে দিনটি পালন করছে জাতি। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের হত্যাকাণ্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম জঘন্য বর্বর ঘটনা, যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল।
পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলে রেখে যায়। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর স্বজনেরা তাঁদের লাশ খুঁজে পান। বর্বর পাকবাহিনী ও রাজাকাররা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করেছিল। লাশজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন; চোখ, হাত-পা বাঁধা। অনেকের শরীরে ছিল অজস্র ক্ষত। অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। ক্ষতচিহ্নের কারণে অনেকে তাঁদের প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেননি।
১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সংকলন, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন নিউজউইক-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা সূত্রে শহীদ বুদ্ধিজীবীর মোট সংখ্যা এক হাজার ৭০ জন বলে উল্লেখ করা হয়। বাংলা একাডেমির শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ (১৯৯৪) থেকে জানা যায়, ২৩২ জন বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছেন। তবে তালিকার অসম্পূর্ণতার কথাও গ্রন্থে সরাসরি স্বীকার করা হয়েছে।
একাডেমি এই গ্রন্থে যে সংজ্ঞা দিয়েছে, তা অনুযায়ী বুদ্ধিজীবী বলতে লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, সব পর্যায়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, চলচ্চিত্র ও নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবী ও সংস্কৃতিসেবীদের বোঝানো হয়েছে। মূলত মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ২৫ মার্চ কালরাত থেকেই বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ শুরু হয়েছিল।
সর্বোচ্চ শহীদ শিক্ষাবিদেরা
একাত্তরে বৃহত্তম বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার ঠিক দুই দিন পর, ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এর আগে ডিসেম্বরের ৪ তারিখ থেকে ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রস্তুতি নেওয়া হতে থাকে।
মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়িত হয়। ওই দিন রাতে শুধু ঢাকাতেই প্রায় দুই শত বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরেরা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে শহীদ হওয়া বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৯১ জন শিক্ষাবিদ, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবী, ১৩ জন সাংবাদিক এবং ১৬ জন অন্যান্য পেশার (সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী ও প্রকৌশলী) মানুষ ছিলেন।
তাঁদের চোখে কাপড় বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগসহ আরও বহু স্থানে অবস্থিত নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ওপর বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাঁদের নৃশংসভাবে রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়। এমনকি আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পরেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের ১৮ তারিখে, মতান্তরে ২৯ তারিখে, বেসরকারিভাবে একটি বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। ওই কমিশনের আহ্বায়ক ছিলেন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। তাঁর প্রস্তুত করা প্রতিবেদনটি পরে আর প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তীতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রাদেশিক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী এ দেশের হাজার বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনামতো হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারেনি তারা।”
ফরমান আলীর লক্ষ্য ছিল একের পর এক শীর্ষ বুদ্ধিজীবীকে গভর্নর হাউসে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা। জহির রায়হান বলেছিলেন, “এরা নির্ভুলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনস্ক বুদ্ধিজীবীদের বাছাই করেই আঘাত হেনেছে।” পরবর্তীতে জহির রায়হান নিজেও ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ হন। তাঁর আগে তাজউদ্দিন আহমেদ ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর একটি সরকারি তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু সেই সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি।
২৫ বছর পর মামলা দায়ের
স্বাধীনতার ২৫ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ১৯৯৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনায় রমনা থানায় প্রথম মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নম্বর–১৫)। ওই হত্যা মামলায় আল-বদর বাহিনীর চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানকে আসামি করা হয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পক্ষে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। আর তাকে সহযোগিতা ও হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের মুখ্য ভূমিকায় ছিল জামায়াতে ইসলামীর গঠিত আল-বদর বাহিনী।
মামলাটি দায়ের করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিনের বোন ফরিদা বানু। মামলার এজাহারে তিনি বলেন, তাঁর ভাই গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ও মুহসীন হলের হাউস টিউটর ছিলেন। ১৪ ডিসেম্বর সকালে ঘাতকরা মুহসীন হল-সংলগ্ন বাসায় গিয়ে তাঁকে না পেয়ে হলের দিকে যায়। হলের সামনে তাঁকে পেয়ে দারোয়ান আবদুর রহিমের গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে ইপিআরটিসির একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি।
ঘাতকরা অন্যান্য হাউস টিউটরের বাসায়ও যায়। সে সময় ওই হলের ছাত্র ছিলেন বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তিনি পুরো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। পরে জানা যায়, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ড. মো. মুর্তজা, ড. আবুল খায়ের, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সিরাজুল হক ও ড. সন্তোষ ভট্টাচার্যসহ আরও অনেককে ধরে নিয়ে গেছে আল-বদর বাহিনী।
শহীদ বুদ্ধিজীবী মো. মুর্তজা ও সিরাজুল হকের ছেলে এনামুল হক অপহরণকারীদের দুজনকে শনাক্ত করতে পারেন। তারা হলেন চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান। দুজনই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মঈনুদ্দীন দৈনিক পূর্বদেশ এবং আশরাফুজ্জামান তৎকালীন অবজারভার পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর ফরিদা বানু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা ছেড়ে আজিমপুরে ভাড়া বাসায় চলে যান। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তিনি আত্মীয়স্বজন নিয়ে ড. মুর্তজা, ড. আবুল খায়ের ও ড. সন্তোষ ভট্টাচার্যসহ অনেক বুদ্ধিজীবীর গলিত লাশ দেখতে পান। ৫ জানুয়ারি মিরপুরের বর্তমান শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাছে গিয়ে তিনি তাঁর ভাই গিয়াসউদ্দিন আহমেদের গলিত লাশ শনাক্ত করেন—লুঙ্গি ও জামা দেখে।
বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিশন–১৯৭১-এর একটি নথিতে এই তালিকা প্রণয়নে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর ভূমিকা থাকার কথাও উল্লেখ পাওয়া যায়। টার্গেট তালিকা প্রণয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে আসে। অপারেশনের ইনচার্জ ছিলেন মঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান ছিলেন প্রধান জল্লাদ। প্রথমজন লন্ডন ও অপরজন নিউইয়র্কে প্রবাসী। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো কার্যকর উদ্যোগ আজও নেওয়া হয়নি।
১৬ ডিসেম্বরের পর আশরাফুজ্জামান খানের নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে তার একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। ডায়েরির দুটি পৃষ্ঠায় প্রায় ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম এবং তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার নম্বরসহ লেখা ছিল। তার গাড়িচালক মফিজুদ্দিনের সাক্ষ্যমতে, রায়েরবাজারের বিল ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি থেকে বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর গলিত লাশ পাওয়া যায়, যাঁদের সে নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করেছিল।
চৌধুরী মঈনুদ্দীন ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি বুদ্ধিজীবীদের নাম-ঠিকানা রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার বশীর আহমেদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এ ছাড়া আরও ছিলেন এ বি এম খালেক মজুমদার (শহীদুল্লাহ কায়সারের হত্যাকারী), মাওলানা আবদুল মান্নান (ডা. আলীম চৌধুরীর হত্যাকারী), আবদুল কাদের মোল্লা (কবি মেহেরুন্নেসার হত্যাকারী) প্রমুখ।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল আর্কাইভ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঘাতকের দিনলিপিসহ বিবিধ তথ্যভাণ্ডার।


এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান