তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) যশোর মুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দী দুই রাজাকারের ছবিটি তুলেছেন মাইকেল ব্রেনান। ছবিটি গেটি ইমেজেসের সৌজন্যে পাওয়া।
নিউজম্যান, ঢাকা
আজ ৮ ডিসেম্বর। একাত্তরের এ দিনটি ছিল বুধবার। পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গনে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী ও তাদের দোসরদের জন্য আগের দিনের চেয়েও আরও খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়। নিশ্চিত পরাজয়ের আশঙ্কায় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এ দিন যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া হয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ধর্ণা দিতে থাকেন। ছাড়তে চান ক্ষমতাও। কেন্দ্রে জোট সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে মিত্রবাহিনী তখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। একের পর এক এলাকা শত্রুমুক্ত করতে করতে চারদিক থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তারা।
ডেইলি টেলিগ্রাফের সংবাদদাতা ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ ৮ ডিসেম্বরের ঢাকার বর্ণনায় লিখেছেন, “সামনে এগিয়ে চলা ভারতীয় বাহিনীর কামানের গোলাবর্ষণের আওয়াজ এখন ঢাকা থেকে শোনা যাচ্ছে, সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ঢাকা। শুধু কয়েকটি টেলিফোন কাজ করছে এবং টেলিগ্রাফ মাঝে মাঝে সচল হয়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, যেখানে আমি রয়েছি, সেখানকার বাগানে একদল লোক ট্রেঞ্চ খুঁড়ছে।”
বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকে। হানাদার বাহিনীকে একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত করতে থাকে মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনারা। তাদের সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনীর প্রধান এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং -ইন-চিফ (জিওসি-ইন-সি) জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে তিনটি সৈন্যদল নিয়ে ঢাকার দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার জন্য বলা হয় এবং একটি ব্রিগেডকে দ্রুত হালুয়াঘাটের দিক থেকে ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রায় সবকটি দল দ্রুত গতিতে ঢাকার দিকে এগিয়ে আসছিল। যৌথবাহিনীর এই অগ্রগতির ফলে পাকিস্তান সরকার ও তাদের মিত্র দেশগুলোর বুঝতে বাকি থাকে না যে, যুদ্ধে তাদের হার নিশ্চিত। যশোরের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও তারা পালিয়ে যায়। কুমিল্লার একাংশের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। অপর অংশ পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্মিলিত বাহিনী বীরদর্পে এগিয়ে যেতে থাকে। পাকবাহিনী পশ্চাদপসরণের পর ঢাকায় নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এরপরও তাদের সামরিক অবস্থা ক্রমশই সঙ্গীন হতে থাকে।
মুক্তিসেনাদের প্রবল প্রতিরোধে প্রাণভয়ে বরিশাল, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠি ছেড়ে পাক হানাদারবাহিনী পালিয়ে যায় এ দিন। মুক্তিসেনারা গর্বিত কণ্ঠে দক্ষিণের এই তিনটি অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করেন। একই দিনে দখলদারিত্বের কবল থেকে মুক্ত হয় চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহের গৌরীপুর, ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও খাগড়াছড়ি, মাদারীপুরের কালকিনি, নড়াইলের লোহাগড়া, কুষ্টিয়ার মিরপুর, পলাশবাড়ী, বৃহত্তর হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা। এ সময় সম্মিলিত বাহিনী ঢাকায় হানাদার বাহিনীর অবস্থানগুলোতে বিমান হামলা জোরদার করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পলায়নপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অজস্র নৃশংস গণহত্যা চালায়।
পাকিস্তানের এক উপ-সামরিক আইন প্রশাসক এ দিন বাংলাদেশের সর্বত্র বিকেল পাঁচটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন জারি করে। পাকিস্তানি বাহিনী তখন বিভিন্ন স্থানে সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ। তাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল স্যাম হরমুসজি ফ্রামজি জামশেদজি মানেকশ। আকাশবাণী রেডিও থেকে উর্দু, হিন্দি ও পশতু ভাষায় এটি প্রচারিত হয়। তাঁর এই বাণী লিফলেট আকারে বিমান থেকেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি দখলদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বলার পাশাপাশি আশ্বাস দেন যে আত্মসমর্পণ করলে তাদের প্রতি জেনেভা কনভেনশনের রীতি অনুযায়ী সম্মানজনক ব্যবহার করা হবে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা কিছুতেই আত্মসমর্পণের দিকে না গিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বাংলাদেশে অবস্থানরত সেনাসদস্যদের নির্দেশ দেয়।
অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চলেও এ দিন পাকিস্তানের অগ্রগতি প্রায় থেমে যায়। ছম্ব, রাজস্থান-সিন্ধুসহ বিভিন্ন সীমান্তে বরং ভারতের কাছে তারা দখল হারায়। এ সময় করাচির উপর নৌ ও বিমান আক্রমণ অব্যাহত রাখে ভারত। তবু ইস্টার্ন কমান্ডের বিপর্যয় দেখে রাওয়ালপিন্ডির সামরিক কর্তারা নিয়াজির মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য ‘চীনের তৎপরতা শুরু হয়েছে’ বলে তাকে জানায়। এমন শোচনীয় সামরিক পরিস্থিতির মাঝে ইয়াহিয়া খান বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে তাঁর শাসনক্ষমতা হস্তান্তরের পুরোনো ‘ওয়াদা’ বাস্তবায়ন শুরু করেন। তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান’থেকে আওয়ামী লীগ বিরোধী নুরুল আমিন ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। ভুট্টো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগদানের জন্য পেশোয়ার থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
পাকিস্তানের নাগরিকদের যুদ্ধ তহবিল খোলার আহবান জানিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বিবৃতিতে বলেন, “জনগণকে অর্থের অপচয় বন্ধ ও উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। দেশের এই সর্বাত্মক যুদ্ধের সময় সবাইকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। যে নাগরিকদের মাসিক আয় ২ হাজার টাকার বেশি, তাদের শতকরা ১০ টাকা এবং যাদের আয় তার থেকে কম, তাদেরকে শতকরা ৫ টাকা হারে প্রতিরক্ষা তহবিলে দিতে হবে।”
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তাবের ব্যাপারে এ দিন ভারতীয় প্রতিনিধি সমর সেন বলেন, “পাকিস্তানকে অবশ্যই বাংলাদেশকে স্বীকার করে নিতে হবে। উপমহাদেশে শান্তি পুনঃস্থাপনের জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে জাতিসংঘের কোনো প্রস্তাবই বাস্তবায়ন করা যাবে না।” এমন সময়ে মুজিবনগর থেকে দেওয়া এক বেতার ভাষণে জাতির উদ্দেশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। পাকিস্তানি হানাদাররা এখন প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের পরাজয় এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।”
নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দেওয়ার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তাজউদ্দীন। বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এই উপমহাদেশে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাব তুলেছে, তাতে বোঝা যায় সংঘর্ষের মূলে সে পৌঁছায়নি। এর মূল কারণ বিষয়ে আমেরিকা চোখ বন্ধ করে আছে। এটা তার মানসিক বিকৃতির পরিচায়ক। চীন পাকিস্তানকে সবসময় বাংলাদেশে গণহত্যা চালাতে উসকানি দিয়েছে।”সন্ধ্যায় ভারতের এক সরকারি মুখপাত্র ঘোষণা করেন, “পাকিস্তান যদি পূর্ব বাংলায় তাদের পরাজয় স্বীকার করে নেয় তবে অন্যান্য সকল অঞ্চলেই ভারত যুদ্ধ বন্ধ করবে। বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেই কোনো ভূখণ্ড দখল করার অভিপ্রায় ভারতের নেই।”
এই ঘোষণা বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীর সময় সকাল ১১টায় যখন ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (ডব্লিউএসএজি) বৈঠক শুরু হয়, তখন মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীর কর্মকর্তা উপমহাদেশের সর্বশেষ সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “পশ্চিমাঞ্চলে ভারতীয় বাহিনীর জোর এগোনোর কোনো লক্ষণ নেই। বরং পাকিস্তানের অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে রেখেই তারা সন্তুষ্ট রয়েছে বলে মনে হয়।”
গ্রুপ সভাপতি হেনরি কিসিঞ্জার ওই কর্মকর্তার কাছে জানতে চান পূর্ব রণাঙ্গন থেকে ভারতীয় সৈন্যদের পশ্চিম রণাঙ্গনে নিয়ে যেতে কত সময় লাগতে পারে। যার প্রেক্ষিতে সেই জেনারেল জানান, বেশ কিছু দিন; তবে বিমানবাহিত ব্রিগেড তাড়াতাড়ি নিয়ে যাওয়া সম্ভব, পাঁচ বা ছয় দিনের মধ্যেই। তা সত্ত্বেও এক সম্পূর্ণ নতুন আশঙ্কার অবতারণা করে কিসিঞ্জার বলেন, “মূল প্রশ্ন হলো ভারত যদি আজাদ কাশ্মীর দখলের চেষ্টা চালায় এবং পাকিস্তানের বিমান ও সাঁজোয়া বাহিনীর ধ্বংস সাধনে প্রবৃত্ত হয়! অবশ্য তা হবে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য ভারতের ইচ্ছাকৃত উদ্যোগ।”
এরপর কিসিঞ্জার সমবেতদের জিজ্ঞাসা করেন, “এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্রকে সম্পূর্ণ পরাভূত হতে দিতে এবং পাকিস্তানকে প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে নিবৃত্ত রাখার জন্য ভারত যদি ভয় দেখায়, তা কি আমরা মেনে নিতে পারি?” জবাবে স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি বলেন, “ভারতের এমনতর অভিপ্রায় রয়েছে কি না তা সন্দেহজনক।”তবুও কিসিঞ্জার পাকিস্তানের জন্য ‘সামরিক সরবরাহ’ নিশ্চিত করার পক্ষে দৃঢ় অভিমত প্রকাশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে আক্ষেপ করে বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সব কিছুই আমরা প্রস্তুত করেছি। কিন্তু সবই হবে দু’সপ্তাহ বিলম্বে।”
কলকাতায় পশ্চিমবঙ্গ বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় সেদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, “আগামী ৩ দিনের মধ্যেই বাংলাদেশের ভেতরে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। তবে পশ্চিম রণাঙ্গনে আরো কয়েকদিন যুদ্ধ চলবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ বিতাড়িত। আমিও জাতিসংঘ বুঝি না। আমাদের নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী না বলা পর্যন্ত ভারতীয় সেনারা এগিয়ে যাবে। নিক্সন কিংবা ইয়াহিয়া তাদের গতিরোধ করতে পারবে না।”
সবমিলিয়ে এ দিন থেকেই আন্তর্জাতিক মহলেও স্পষ্ট হয়ে যায় যে পাকিস্তানের পরাজয় অনিবার্য এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল সময়ের অপেক্ষা। জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট এই দিন ঢাকায় নিযুক্ত ২৪০ জন জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও বিদেশি নাগরিককে নিরাপদে স্থানান্তরের জন্য ভারত ও পাকিস্তানের কাছে একটি সুরক্ষিত নিরপেক্ষ অঞ্চল চেয়ে অনুরোধ জানান। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন এবং পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহীকে পৃথকভাবে ডেকে অনুরোধ করেন।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল আর্কাইভ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঘাতকের দিনলিপিসহ বিবিধ তথ্যভাণ্ডার।
পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত বাংলাদেশ
কী লেখা ছিল আত্মসমর্পণ দলিলে?
কেন পিছু হটেছিল মার্কিন নৌবহর?
আত্মসমর্পণের পথে পাকিস্তানি বাহিনী।


এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান