“আমি আপনার কথার সাথে বিন্দুমাত্র একমত না হতে পারি, কিন্তু আপনার মত প্রকাশের অধিকার রক্ষার জন্য জীবন বাজি রাখবো।” ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের এই উক্তিটি কৈশোরেই মাথায় গেঁথে দিয়েছিলেন এস এম তুষার। বরিশালের কলেজ পাড়ার এই আদি বাসিন্দা আমার দেখা প্রথম সেলিব্রেটি। মানে তাঁকে দেখেই প্রথম জেনেছিলাম—জগতে এমন মানুষও আছেন, যারা জীবনকে সেলিব্রেট করতে জানেন। রাজনীতি, সাংবাদিকতা, মঞ্চনাটক বা চলচ্চিত্র নির্মাণ, এমন বহু কিছুতে সক্রিয় মানুষটা এখন শুধু লেখালেখি করেন। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে তাঁকে বারবার মনে পড়ছে। কারণ তিনিই প্রথম ধারণা দিয়েছিলেন দুনিয়ার বিভিন্ন ধর্মের দর্শন ও যাপনের সাদৃশ্য সম্পর্কে। সেটাও আবার স্বরচিত গানে গানে। যে কারণে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলোর পড়ার আগ্রহ তুঙ্গে উঠেছিল।
পরবর্তীতে সাংবাদিকতা শুরুর পর ভলতেয়ারের সেই কথা স্মরণে এসেছে বারবার, ঠিক যে ভঙ্গিতে ওস্তাদের মুখে প্রথমবার শুনেছিলাম। কমপক্ষে আড়াই দশক ধরে তাঁকে এই সম্বোধনে ডাকি। তিনিও ওস্তাদী অব্যাহত রেখেছেন। দিন দশেক আগেও আর্থার শোপেনহাওয়ারের বরাত দিয়ে বললেন, “জীবন হচ্ছে মৃত্যুর কাছ থেকে ধার নেয়া কিছু সময়।” যা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, জাগতিক নানাবিধ মোহে, অথবা সমকালীন দ্রোহে। ধর্মীয় উগ্রবাদ বা কট্টরপন্থার সঙ্গে লোক-আধ্যাত্মিকতার দ্বন্দ্ব যে মোটামুটি সর্বত্র অর্থাৎ সব স্থান, কাল ও ধর্মে বিদ্যমান, সেই বিষয়ে জানার সূত্রও তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।
ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামী সভ্যতা হাজার বছর ধরে এই দ্বন্দ্ব দেখে আসছে। যেমন—সুফি ও সাহিত্যিক মানসুর আল–হাল্লাজকে স্রেফ একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বিচারের মুখোমুখি করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন আব্বাসীয় খলিফা আল মুকতাদির। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তাঁর মৃতদেহকে টুকরো টুকরো করে কাটা হয়। সেই কাটা দেহাবশেষকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। বুঝতে পারছেন তো, বাংলাদেশের কট্টরপন্থী মুসুল্লিদের সাথে উদারপন্থীদের যে বৈপরিত্য, তার শিকড় কতোটা পুরানো। শিয়া মুসলিমদের ইমামিয়া ধারার বিশ্বাস, এই কট্টরপন্থার শিকার হয়েছিলেন খোদ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহাম্মাদ (সা.); এবং পরবর্তীতে প্রত্যেক ইমাম। শত শত বছর পরও এক মুসলিম যখন তাঁর ধর্মীয় অনুভূতি থেকে আল্লাহ ও ইসলাম রক্ষার নামে আরেক মুসলিমকে হত্যা করতে চায়, তখন ইমামিয়া ঈমান নিয়েও আরো ঘাঁটাঘাঁটির আগ্রহ বাড়ে বৈকি। মনে প্রশ্ন জাগে, আজও ইসলাম রক্ষার নামে যারা ফিতনার বিস্তার ঘটান, তারা কি সেই খারিজিদেরই বংশধর?
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জাবরা এলাকায় ‘খালা পাগলীর মেলা’ নামে অনুষ্ঠিত এক লোকজ পার্বনে গত ৪ নভেম্বর দিবাগত রাতে পালাগান আয়োজন করা হয়েছিল; যা মূলত একপ্রকারের কথোপকথনমূলক লোকগীতি, যা বিচারগান নামেও সমধিক পরিচিত। যেখানে এক বা একাধিক বয়াতি (বাউল গানের গায়খ) দোহারদের (সহশিল্পী) সহযোগে গান পরিবেশন করেন। এবং এই গান কাহিনীমূলক হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে গায়েনরা বিভিন্ন চরিত্র রূপদান করেন। এখানে পরিবেশিত আলাদা আলাদা গল্পকেই বলা হয় পাট বা পালা। তেমনই একটি পাট “জীব ও পরম”। আধ্যাত্মিক এই পালায় ‘জীব’ (মানুষ) এবং ‘পরম’ (স্রষ্টা বা পরমাত্মা) মধ্যেকার সম্পর্কের বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। দুই শিল্পী এখানে পালা করে মানুষ ও পরমাত্মা সেজে গভীর দার্শনিক তত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিকতার বিষয়গুলো সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন। এক্ষেত্রে যে সৃষ্টি সাজে, তাঁকে মানবসমাজের অজ্ঞতা প্রকাশের জন্য স্রষ্টা বরাবর এমন সব প্রশ্ন করতে হয়, যা একশ্রেণীর মৌলভি-মুসল্লিদের দৃষ্টিতে ইসলামবিরোধী।
প্রতিটি মানুষ আসলে জলাভূমির মতন। তাঁর মনের পাত্রের ওপর নির্ভর করে সে কাকে কিভাবে ধারণ করতে পারবে। যেমন—সেই রাতের পালায় মহারাজ আবুল সরকার জীব এবং ফকির আবুল সরকার পরমের ভূমিকায় ছিলেন। এ সময় ফকিরের কাছে প্রশ্ন করতে গিয়ে মহারাজ অবান্তর সব কথা বলেছেন। যাতে পরমের সামনে জীবের ক্ষুদ্রতা ও অজ্ঞতা দর্শক-শ্রোতারা তীব্র আবেগে সহজভাবে বুঝতে পারেন। এই পালার পর তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা হতে পারে, সেটাও ধারণা করেছিলেন এই সাধক। মঞ্চে বসা আরেক বাউলশিল্পী রিতা দেওয়ানকে দেখিয়ে আবুল সরকার বলেছিলেন, “রিতা দেওয়ানও এই জীব আর পরম পালা করেছিলেন। জীবের জায়গা থেকে রিতা সরকার সেদিন পরমের ভূমিকায় থাকার শাহ আলম সরকারের উদ্দেশ্যে যে কথাগুলো বলেছিল, তাতে রিতা দেওয়ানের নামে হুলিয়া (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) জারি হয়েছিল। অনেকগুলো মামলা হয়েছিল, আপনারা জানেন তো? এ সময় রিতা দেওয়ান বলে ওঠেন, “আটটা মামলা হয়েছিল।” একটু থেকে আবুল সরকার হাসতে হাসতেই বলেন, “আজ সেই জীবের পাল্লা আমাকে দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধেও যে কয়টা মামলা হবে তা আমি জানি না। হতেই পারে। তবে একটা কথা বলি, গান-বাজনার বিরুদ্ধে কোরআন সমর্থিত কোনো দলিল নাই।”
“বিএনপির লোকেরা বাউল গান বা মাজারবিরোধী নয় দাবি করে সমর্থিত সংসদ সদস্য প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়ে তিনি বলেছিলেন, “কারণ যদি তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাইতে না পারে, এমনি তো দুই শতাধিক মাজার ভাইঙ্গা ফেলা হয়েছে। এখন একটু থামছে। কারণ সামনে নির্বাচন। (ভাবছে) একটু ‘গ্যাপ দেই। এখনো মাজার ভাঙতে থাকলে কিন্তু ভোট পামু না। তাই এখন তারা একটু থামছে, বিশ্রাম নিতেছে। নির্বাচনে যদি তারা (মাজারবিরোধীরা) ক্ষমতায় যায় তবে আমাদের বাড়িঘরসহ ভাঙ্গা শুরু করবো, খালি মাজার না।” মূলত এই বক্তব্যের কারণেই তাঁকে কয়েক সপ্তাহ আগের ঘটনার জন্য মামলা হওয়ার আগেই আটক করে পুলিশ, সোশ্যাল মিডিয়ায় এমনও লিখেছেন বাংলাদেশি অনেক নেটিজেন। কাছাকাছি সময়ে ভাইরাল হয়েছে আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদের সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর একটি বক্তব্য। চট্টগ্রামের একটি আসনের প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান বলেছিলেন, “যার যার নির্বাচনি এলাকায়— যারা প্রশাসনে আছে, তাদেরকে অবশ্যই আমাদের আন্ডারে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের কথায় উঠবে, আমাদের কথায় বসবে, আমাদের কথায় গ্রেপ্তার করবে, আমাদের কথায় মামলা করবে।”
আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে আবুল সরকারের স্ত্রী বাউলশিল্পী আলেয়া বেগম বলেন, “আমরা ওলি আউলিয়া এবং মাজারের প্রচারক। তো যেখানে ওলি আউলিয়া মাজার ভেঙে ফেলে তারা, আর আমরা তার প্রচারক; অতএব, এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এই ব্যাপারেই তাদের একটা প্রতিপক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বী এবং শত্রু হয়ে গিয়েছি। মূলত এটাই কারণ। তারা (মাজার) ভাঙ্গে, আর আমরা অলি-আউলিয়া-গুরুদের কেরামতির আশ্চর্য যেই ঘটনাগুলি, সেগুলো তুলে ধরি।”
“সে একজন সত্যিকার অর্থে সহজ সরল মনের একজন মানুষ। আমি আমার বাউল মনের থেকে তাকে যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে দেখেছি যে তার ভিতর একটা সুন্দর মানবতা বিরাজমান,” নিজের স্বামী সম্পর্কে এমনটা উল্লেখ করে আলেয়া আরো বলেন, “শুধুমাত্র মাজারের পক্ষে আমরা কথা বলে থাকি, অলি-আউলিয়ার গুনগান করে থাকি, সেই কারণটা তুলে ধরে তাঁকে করা হয়েছে। অথচ ওনার বইতে শত শত গান রয়েছে শুধু আল্লাহর শানে।”
অক্টোবরে ঢাকার মিরপুরের হযরত শাহ আলী বোগদাদীর (রহ.) মাজারে সেখানকার পরিচালনা কমিটির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে আক্রান্ত এক শতবর্ষী বটবৃক্ষ ও মাজারের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ রক্ষা এবং দেশজুড়ে চলমান সাধক, ফকির, পাগল ও বাউল পীড়নের প্রতিবাদ জানাতে যারা বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন, তাদেরও একজন ছিলেন আবুল সরকার। সেই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে আবুল সরকারকে মাজার বিরোধীদের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিতে দেখা গিয়েছিল। আবুল সরকার বলেছিলেন, ”এই ঘটনায় ম্যানেজার, এমনকি জেলা প্রশাসক জড়িত হলে, তাঁকেও ছাড় দেওয়া হবে না। তারা এখন এই গাছ কাটা ধরছে, এরপর মাজার ভাঙবে।”বাংলার সাধকদের সঙ্গে বৃক্ষের সম্পর্ক অনেক নিবিড় দাবি করে তিনি জানান, এর আগে সিন্নিগাছ হিসেবে পরিচিত রওজা সংলগ্ন বটগাছের গোড়ায় মোমবাতি ও আগরবাতি প্রজ্জলন নিষিদ্ধ করেছে বর্তমান মাজার কমিটি।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, যে গাছের জন্ম হযরত শাহ আলী বোগদাদীর (রহ.) ব্যবহৃত লাঠি থেকে। বহু ভক্ত-আশেকান সেই গাছের নীচে মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালিয়ে মানত করতেন। মাজার কর্তৃপক্ষ বিকল্প হিসেবে গাছের পাশে একটি বড় থালায় মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা রাখলেও এইটাকে হাজার বছর ধরে চলে আসা আধ্যাত্মিক চর্চার উপর আঘাত বলেই মনে করছেন ভক্তরা। মাজারের মসজিদের ইমামরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে আবুল সরকার বলেছিলেন, “তারা যেপাত্রে খাবার খায়, সেটিই ফুটো করছে। তারা নিয়মিত আয়োজন করে বয়ান করে মোমবাতি জ্বালানো, আগরবাতি নিষেধ, মানত নিষেধ, অথচ মাজারের ফান্ড থেকেই তারা বেতন নেয়। এদের প্রত্যেককে এখান থেকে তাড়াতে হবে। যারা মাজার বিরোধী লোক, তারা মাজারে থাকতে পারবে না। যারা মাজারের পক্ষের লোক, তারাই শুধু মাজার পরিচালনা করবে।”
জ্ঞানকাঠামোর অনমনীয়তাই হচ্ছে মৌলবাদিতা, এমনটা উল্লেখ করে ২০১৬ সালে প্রকাশিত গাধার গয়না কাব্যগ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছিলাম, আর মৌলবাদিরা মূলত দু প্রকার—এক. ছাগু প্রকৃতির (ডান) দুই. চুতিয়া প্রকৃতির (বাম); অর্থাৎ লেফট-রাইট করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে মৌলবাদ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে—আক্ষেপবাদীদের খেদ কখনোই শেষ হয় না, হবারও না। তারা ক্রমাগত আক্ষেপচর্চা করলেও বস্তুত এর কারণ সন্ধান করতে চায় না। ভয় পায় হয়ত। কারণ তাদের অবচেতন নিশ্চয়ই জানে, প্রত্যেক মানুষ নিজেই তার আক্ষেপের জন্য দায়ী।
ভাবনাগুলো পুরানো গুছিয়ে লিখে রেখেছিলাম ২০১৫ সালের জুলাইতে। অর্থাৎ ১০ বছর আগে, শেখ হাসিনার শাসনামলে। সেই কথাগুলো পুনরায় স্মরণ করতে হচ্ছে, করাটা দরকারি মনে হচ্ছে। কারণ মানুষের বিস্মৃতিপ্রবণ চিন্তার দৈন্যতা, দর্শনের দুর্বলতা, সার্বোপরী – আত্মজ্ঞানের সংকট প্রসূত সুবোধের অভাব এ দুনিয়ায় আজও অতটাই প্রকট যতটা সত্তর হাজার বছর আগেও ছিল। জানি না আমায় আর কত হতাশ করবে আমারই স্বত্তা ও স্বজাতি। যদিও আমাদের, মানে দুনিয়াবাসীর শুভ বুদ্ধির উদয় হবে, এমন আশাও মরছে না। গত জন্মেও হয়ত এই একই আশা নিয়ে এ বাঙলাতেই মরেছিলাম।
হে বিশ্বাসীগণ, মহান ঈশ্বর, ভগবান বা আল্লাহ কখন কাকে দিয়ে কেন কি করান, তা তিনিই ভালো জানেন। মনে রাখবেন, প্রতিটি ঘটনা তার নির্দেশেই হচ্ছে, এমনকি (আপনার দৃষ্টিতে) অভিশপ্ত পাপীরা যা করছেন, তা’ও। তামাম জাহানকে তিনি মঙ্গলের তরেই পরিচালিত করেন। নিশ্চয়ই আমরা কেউ তার চেয়ে বেশী জানি না। আমাদের সমগ্র জ্ঞানই সাময়িক ধারণার চেয়ে বেশি কিছু নয়। তামাম জাহানকে তিনি মঙ্গলের তরেই পরিচালিত করেন। নিশ্চয়ই আমরা কেউ তার চেয়ে বেশী জানি না। আমাদের তামাম জ্ঞানই সাময়িক ধারণার চেয়ে বেশী কিছু নয়। বিশ্বাসী মন কী করে ভোলে পথ!
বইটি উৎসর্গ করেছিলাম শ্রেষ্ঠত্বের প্রত্যাশাবিমুখ বিশ্বাসীদের। কাছাকাছি সময়ে কবি ও ঔপন্যাসিক শ্মশান ঠাকুরের লেখা একটি বাক্য দেখে বুঝেছিলাম একইভাবে আমার সমসাময়িক অনেকেই ভাবছেন আসলে। তিনি লিখেছিলেন, “নিজের ভিতর শ্রেষ্ঠত্বের দাবীই, শয়তানের উপস্থিতি।” খেয়াল করে দেখেছি, এমন মানুষের সন্ধান পেলেই আমার মনটা গলে যায়। সম্ভব হলে তাদের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করি। যদিও তখন জানতাম না পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আনফালের ৭৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “আর যারা কুফরী করে তারা একে অপরের বন্ধু। যদি তোমরা (বিশ্বাসীরা) তা (বন্ধুত্ব) না কর, তাহলে দুনিয়াতে ফিতনা ও মহাবিপর্যয় দেখা দিবে।” শেখ হাসিনার আমলেই লিখেছিলাম, “আজও চলছে মগজ ধোলাই, খুব খেয়াল/পিছনে চাপাতি সামনে সরকারি দেয়াল।” আজও কি সেই একই কথা প্রযোজ্য নয়? সকল মত ও পথের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা কি ক্রমশ কমছে না?
১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের শেহওয়ান এলাকার ইন্দুস হাইওয়ের কাছে সিন্ধী সুফি ঝুলেলাল শাহবাজ কালান্দারের (১১৪৯-১২৭৪) মাজারে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত ৭৫ জন মারা গিয়েছিলেন। এই হামলার দায় স্বীকার করে আমাক নিউজ এজেন্সিতে বিবৃতি দিয়েছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস (ইসলামিক স্টেট)। সেই দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। বিখ্যাত ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’গানের সুবাদে শুধু পাকিস্তানে নয়, সমগ্র ভারতবর্ষেই কমবেশী পরিচিত, শাহবাজ কালান্দারে মাজারের মতো ভারত-বাংলাদেশের বহু মাজার আর আখড়ায়ও প্রতি বৃহস্পতিবার স্থানীয় ভক্তরা জড়ো হন। দিনটিকে গুরুবার বলে আখ্যা দেন তারা। এমন একটি দিনে অমন বিখ্যাত মাজারে সেই আত্মঘাতী হামলা আদতে ভারতীয় সুফি দর্শনকে মধ্যপ্রাচ্যের আইএস (ইসলামিক এস্টেট) দর্শনের হিংস্রতম হুমকী বলেই মনে হয়েছিল তখন।
অনেক পাঠকের নিশ্চয়ই মানে, সেই সময়ে বাংলাদেশেও ইসলামের নামে চলমান হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের নায়কদের টার্গেডে শুধু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী লেখক, প্রকাশক, ব্লগার, বিধর্মী সংখ্যালঘু আর বিদেশিরা নন, সুফিভাব বা বাউল দর্শনের অনুসারীরাও ছিলেন। ২০১৬ সালের মে মাসেই কুষ্টিয়ায় বাউল সাধক লালনের ভক্ত, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক মীর সানাউর রহমানকে কুপিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে আইএস। একই সময়ে রাজশাহীর তানোর উপজেলার সুফি সাধক, মুদি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে হত্যা করা হয়। তার আগের মাসে, মানে এপ্রিলে একই কায়দায় খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মুক্তমনা অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম। চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিতি ছিলো তার। আরো আগে ২০১৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশ্য সড়কে খুন হয়েছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফিউল ইসলাম , যিনিও লালন ভক্ত ছিলেন।
তার আগে ২০১৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় মধ্য বাড্ডার নিজ বাসায় সুফিবাদী পীর, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খিজির খানকে জবাই করে হত্যা করা হয়। একই মাসে আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি চলার সময় পুরনো ঢাকা হোসেনী দালান চত্বরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় একজন নিহত হন। তার আগের মাসে চট্টগ্রাম নগরের আকবর টিলা এলাকায় ‘ল্যাংটা ফকিরের মাজারে’ রহমতউল্লাহ ওরফে ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেম আবদুল কাদেরকে জবাই করা হয়। আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৪ সালের আগস্টে ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই করে দুর্বৃত্তরা। তার আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ইমাম মাহদির প্রধান সেনাপতি দাবিদার লুৎফর রহমান ফারুক, তাঁর বড় ছেলে ও চার অনুসারীকে গোপীবাগের বাসায় ঢুকে জবাই করে দুর্বৃত্তরা।
যার জেরে তখনকার এক মন্তব্য প্রতিবেদনে লিখেছিলাম, “এসব দেখেশুনেও কেন যে সুদিনের আশায় থাকি! ঠিক বুঝি না কি করে ভাবি একদিন এই দুনিয়ায় আর কোনো মতাদর্শিক হত্যাকাণ্ড ঘটবে না। বোধকরি—সেদিন এ ধরায় কোনো মানুষই থাকবে না।
চলবে..
পুরানো প্রতিবেদন
সুফি গান: যা বলেছিলেন ফারুকী
আসর নিষিদ্ধ জেনে বিষ্মিত হয়েছিলেন উপদেষ্টা।
হুমকিতে হাজার বছরের আধ্যাত্মিকতাচর্চা, রেহাই পায়নি মাজারের গাছও
শাহ আলী মাজারে সংবাদ সম্মেলন শনিবার।


এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান