শরীফ খিয়াম আহমেদ

২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৮। পোস্তগোলা, ঢাকা। প্রশিক্ষণ ফ্লাইট চলাকালীন প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিধ্বস্ত হয় পারাবত এয়ারলাইন্সের চেসনা-১৫০ মডেলের একটি প্রশিক্ষণ বিমান। নিহত হন পাইলট ফারিয়া লারা এবং কো-পাইলট সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। বরিশাল থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন তারা। দুর্ঘটনার কিছু মুহূর্ত আগে নিয়ন্ত্রণকক্ষে “মে‑ডে” সংকেত পাঠিয়েছিলেন লারা। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রশিক্ষক বৈমানিক। শেষবার্তায় বলেছিলেন, “আর কয়েক মিনিট মাত্র এ পৃথিবীতে বেঁচে আছি, আমরা আর কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছি।” এরপর যতোবার কোনো প্রশিক্ষণ বিমান দূর্ঘটনার খবর শুনেছি, সবার আগে কেন জানি এই কথাগুলো মনে পড়ে গেছে।

গতকাল (২১ জুলাই, ২০২৫) দুপুরেও তেমনই হয়েছিল প্রথমে। ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উত্তরা ক্যাম্পাসের একটি অ্যাকাডেমিক ভবনের উপর বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের প্রশিক্ষণ জেট বিধ্বস্ত হওয়ার সংবাদ শোনা মাত্র স্মরণে আসে ফারিয়া লারার সেই কথাগুলো।

পরক্ষণে সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া ভিডিও আর ছবিগুলো টেনে নিয়ে যায়, ২০১০ সালের ৩ জুনের নিমতলীতে, সেখান থেকে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির চুড়িহাট্টায়। প্রথম ঘটনায় নিহত ১২৪ জন ও দ্বিতীয় ঘটনায় নিহত ৭১ জনের মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেকই ছিল নারী ও শিশু। যারা পুড়ে অঙ্গার হয়ে মরেছিলেন। আবারো তেমন একটি হৃদয়বিদারক দিনের মুখোমুখি বাংলাদেশ। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুলের বরাত দিয়ে ঢাকার গণমাধ্যমগুলো বলছিল, ভবনটিতে স্কুলের বাচ্চাদের ক্লাস চলছিল। তখনই আন্দাজ করতে পারি, কতগুলো নিস্পাপ মুখ আজ সংখ্যা হয়ে যাবে। নিহত আর নিখোঁজের হিসেবে ভিড় বাড়াবে।

বেশি আগে না, গত মাসেই (১২ জুন, ২০২৫) ভারতের আহমেদাবাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইট বিধ্বস্ত হয়েছিল স্থানীয় বি জে মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসে। সেদিন বিমানে থাকা ২৪২ জনের সাথে পাঁচজন শিক্ষার্থীও মারা গিয়েছিলেন। ওড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার লন্ডনগামী সেই উড়োজাহাজ।

বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, প্রশিক্ষণ বিমানটি সোমবার দুপুর একটা ছয় মিনিটে উড্ডয়নের ১২ মিনিট পর বিধ্বস্ত হয়। বিকেল চারটার পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল জানান, তাদের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ জনের লাশ উদ্ধার করেছে। অর্ধশতাধিক আহত ও দগ্ধকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সদলবলে হাসপাতালে গিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাদের এসব ‘লোক দেখানো’ কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবিতে মুখর ছিলেন নেটিজেনরাও।

বিধ্বস্ত বিমানে ধরে যাওয়া আগুনের তাপে পুড়ে একটুকরো মাংসপিণ্ডে পরিণত হওয়া কারো ছবি দেখলাম। না জানি কতজন পুরোপুরি গলে গেছে! স্কুলের বাগান সংলগ্ন একটি ভবনের নীচতলায় ঢুকে গেছে বিমানটি। ইঞ্জিনে আগুন জ্বলছে, সেটা নেভানোর চেষ্টা করছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দমকল কর্মীরা তখনও পৌঁছায়নি। কিছু ভিডিওতে ঝলসে যাওয়া হতবিহ্বল শিশুদের হেঁটে বেড়িয়ে আসতে দেখা গেছে। আরো কত শত অকল্পনীয় চিত্র! সব ছাপিয়ে যাচ্ছে অভিভাবকদের আতঙ্কিত চিৎকার। উদভ্রান্তর মতো সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন কেউ কেউ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খুঁজছে নিহত শিশুর স্বজন। খোঁজা হচ্ছে রক্ত। আবারো এক জুলাইতে বর্ণনাতীত সব দৃশ্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। এই ঘটনার পর আলোচনায় এসেছে স্কুলের আইডি কার্ডে রক্তের গ্রুপ ও অভিভাবকের কোনো তথ্য উল্লেখ থাকার প্রয়োজনীয়তা। এই মৃত্যুপুরীতে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা কমাতে যা অনেক বেশি জরুরি।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান ইতিমধ্যে বলেছেন, নিহত সাতজনের লাশ শনাক্ত করা যায়নি। তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে। এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটির মাঝেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখি, মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে সেনা সদস্যদের হাতাহাতি, মারধরের ভিডিও। নিতুল চৌধুরী নামের এক শিক্ষার্থী ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যমে লাশের সংখ্যা নিয়ে কথা বলতে গেলে সেনাবাহিনী মারধর শুরু করে।

নিতুলের ভাষ্য, “রোভার স্কাউটের ইনচার্জ হওয়ায় বরাবরই আজকে ঘটনা ঘটার ২০ মিনিটের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হই। আমরা নিজ হাতে কমপক্ষে ২০-২৫ জনের লাশ বের করেছি। কিন্তু আর্মি অফিসাররা রিপোর্ট দেয় মোট মৃত সংখ্যা দুই-তিন জন। আমরা সেখানে বসে হাসপাতাল থেকে খোঁজ পাই কমপক্ষে ৫০-১০০ জনের মতো মৃত। যমুনা রিপোর্টার আমার বন্ধু সাফায়েত আর মাহিরের থেকে জানলে চাইলে ওরা যখন বলে লাশের (সেই) সংখ্যা, আর্মি অফিসার তাদের উপর চড়াও হয়ে তাদেরকে অমানবিক ভাবে মারা শুরু করে। শাফায়েতকে মেরে বাজে ভাবে আহত করে। তাকে বাঁচাতে যেয়ে (গেলে) আমাকে এবং নিহাদ ভাইকেও মারা হয়। লাঠিচার্জ করার এক পর্যায়ে সামনে থাকা আমাদের অধ্যক্ষ জিয়াউল আলম স্যার, উপাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান স্যার এবং উপাধ্যক্ষ মাসুদ আলম স্যারকেও তারা ধাক্কা দেয়। অতঃপর নিজ কলেজ প্রাঙ্গণে আমাদের সারাদিন পরিশ্রম করে সেখান থেকে মাইর খেয়ে লুকায় লুকায় বের হয়ে আসা লাগে।”

মাঝরাতে ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স আসার পর পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হওয়া শুরু করে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দলে দলে ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকেন । তখনও চলমান উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিতের সরকারি ঘোষণা না আসা নিয়েও বিক্ষুব্ধ ছিলেন তারা। এসব ঘটনার জেরে আজ, মঙ্গলবার দিনভর ছাত্রবিক্ষোভে উত্তাল ছিল দূর্ঘটনাস্থল ও সচিবালয়ের মতো এলাকা। দুই জায়গায়তেই বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পরিদর্শনে এসে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আটকে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তাদের ঘিরে রেখে শিক্ষার্থীরা ছয় দফা দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। যার মধ্যে রয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের সঠিক নাম-পরিচয় এবং আহত ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ ও নির্ভুল তালিকা প্রকাশ; শিক্ষার্থীদের প্রতিটি পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান; বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো প্রশিক্ষণ বিমান বাতিল করে আধুনিক ও নিরাপদ বিমান চালু; বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ও কেন্দ্র সংস্কার করে আরো মানবিক ও নিরাপদব্যবস্থা চালু; এবং শিক্ষকদের গায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাত তোলার ঘটনার জন্য জনসমক্ষে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দবি।

সন্ধ্যার সাতটার পর সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে “উত্তরায় যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত–উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনাকালে অনভিপ্রেত ঘটনা প্রসঙ্গে” শিরোনামে প্রকাশিত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, “একদল উৎসুক জনতার সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়, যা এক পর্যায়ে একটি অনভিপ্রেত ঘটনার অবতারণা করে।”

“বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে,” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। এর আগে বিকেলে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করার অভিযোগে শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষাসচিবের পদত্যাগে দাবিতে সচিবালয়ের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। সেখানে আহত কমপক্ষে ৭৫ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার খবর দিয়েছে টিবিএস অনলাইন। এদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত মোট ৩১ জন নিহত ও ১৬৫ জন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে সরকার।

বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘন্টাখানেকের মধ্যে স্পটে যাওয়া এক পুরানো কলিগ, মানে সহযোদ্ধা সাংবাদিক ফোনালাপকালে বলছিলেন, ইতিপূর্বে কখনো এমন ট্র্যাজিক ঘটনাগুলোতে ছবি তুলতে বা ভিডিও করতে এভাবে বাঁধা দেওয়া হয়নি। ক্রাউড কন্ট্রোলের নামে সেনাবাহিনী, সেচ্ছাসেবক- সবাই সাংবাদিকদের উপর চড়াও হচ্ছিলেন। আরেক সংবাদকর্মি বলছিলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনা মনে পড়েছে বারবার। কেন জানি আমারও মনে হচ্ছে, সেদিনের মতোই শোকে পাথর হয়ে গেছে পুরো দেশ। তখনও লাশের সংখ্যা নিরূপণ সংক্রান্ত বহুবিধ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন মাঠের সাংবাদিকরা। হয়তো সেই স্মৃতি থেকেই ঢাকার একজন সিনিয়র সাংবাদিক মিল্টন আনোয়ার প্রশ্ন তুলেছেন, “সাংবাদিক হেনস্থা করে, তাড়িয়ে দিয়ে আপনারা কী লুকাতে চান?” আজ বিকেলে ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি এমনটা লিখেছেন।   

এই সামাজিক মাধ্যমেই সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, “আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, বিভিন্ন মহল থেকে হতাহতের তথ্য গোপন করা হচ্ছে দাবি করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমরা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে জানাতে চাই যে, এ দাবি সঠিক নয়।”

গতকালই আইএসপিআর বলেছিল, “দুর্ঘটনা মোকাবেলায় এবং বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বিমানের বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম বিমানটিকে ঘনবসতি থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন।” তবু ঢাকার মতো জনবহুল শহরে বৈমানিক প্রশিক্ষণ কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ তা এবার বেশ তীব্রভাবে টের পেয়েছে রাজধানীবাসী। নিহত বৈমানিক তৌকিরের আজ প্রথম একক মিশন ছিল বলে জানিয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলোসহ একাধিক গণমাধ্যম। এই ঘটনার পরও কী দুনিয়ার অন্যতম এই জনবহুল শহরের আকাশে কোনো প্রশিক্ষণ বিমান উড়বে কিনা তা সময় বলে দেবে। ইতিমধ্যে রাজনীতিবিদরা এনিয়ে মুখ খুলেছেন। কথা বলেছেন সরকারের একজন উপদেষ্টা, এমনকি বিমানবাহিনীর প্রধানও। তবে তারা কী বলেছেন সেটা এই সংবাদভাষ্যে উল্লেখের চেয়ে অতীতের কিছু ঘটনা টুকে রাখা জরুরি মনে হচ্ছে।

৮ এপ্রিল ২০০৮। ঘাটাইল, টাঙ্গাইল। পাহাড়িপাড়া গ্রামে পাইলটসহ বিধ্বস্ত হয় একটি এফ-৭ এমবি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান। নিহত হন বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার মোর্শেদ হাসান। তিনি বিমান থেকে বের হতে পারলেও প্যারাসুটের ত্রুটির কারণে আহত হয়ে মারা যান।

২৯ জুন, ২০১৫। পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম। জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা এফ-৭ এমবি মডেলের একটি যুদ্ধবিমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কয়েক মিনিট পর সৈকতের প্রায় ছয় নটিক্যাল মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয়। নিখোঁজ হন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পাইলট তাহমিদ রুম্মান।

২৩ নভেম্বর ২০১৮। মধুপুর, টাঙ্গাইল। রসুলপুর ফায়ারিং জোনে এফ-৭ বিজি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মারা যান উইং কমান্ডার আরিফ আহমেদ দীপু। অস্ত্র ব্যবহারের পর বিমানটির জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরে গিয়েছিল।

নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, ২০০৫ সালের ৭ জুন একটি এফ-৭ এমবি যুদ্ধবিমান ‘লো লেভেল ফ্লাইং’ করার সময় ঢাকার উত্তরার একটি বহুতল ভবনের সাথে সংঘর্ষ ঘটেছিল। এছাড়া ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০৩ ও ২০১০ সালেও বাংলাদেশে এফ-৭ সিরিজের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় কারো প্রাণ যায়নি। বিদেশি গণমাধ্যমে চোখ রেখে দেখি, গত মাসেই (১০ জুন, ২০২৫) মিয়ানমার, এর আগে জিম্বাবুয়ে, ইরান ও পাকিস্তানে এফ-৭ সিরিজের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে বৈমানিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

চিনের চেংদু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন ও গুইঝু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে এই সিরিজের বিমান তৈরি করে আসছিল। এয়ারফোর্স টেকনোলজি ডটকম জানাচ্ছে, অবিভক্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি মিগ-২১ যুদ্ধবিমানের আদলে জে-৭ নামে এই বিমান তৈরি করে তারা। পরে এফ-৭ নাম দিয়ে রপ্তানিও শুরু করে। এক্ষেত্রে নামের সঙ্গে কিছু সঙ্কেত ব্যবহার করা হয়। যেমন, বাংলাদেশ যদি এই সিরিজের বিমান আমদানি করে তাহলে এফ-৭ এর পর ইংরেজি অর ‘বি’যুক্ত হবে। আর গ্লাস ককপিটের নকশার জন্য ‘জি’ এবং উন্নত (ইমপ্রুভড ) সংস্করণ বোঝাতে ‘আই’যুক্ত হবে।

বাংলাদেশের বহরে ৩০টির বেশি এফ-৭ যুদ্ধবিমান থাকার কথা ঢাকার বিভিন্ন গণমাধ্যম উল্লেখ করেছে। যার বেশির ভাগ এফ-৭ বিজিআই। সাথে এফটি-৭ এমবি ও এফ-৭ বিজি মডেলের বিমানও রয়েছে। আশির দশকের শেষভাগে এফটি-৭ এমবি ক্রয়ের মাধ্যমে এটি বিমানে যুক্ত হয়। ২০০৬ সালের একটি চালানে ১২টি এফ-৭ বিজি এবং চারটি এফটি-৭ বিজি আনা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০১১ সালের এক চুক্তি অনুযায়ী ২০১৩ সালে বহরে যুক্ত হয় আরো ১৬টি এফ-৭।

২০১৩ সালে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আগে এই সিরিজের মোট প্রায় আড়াই হাজার বিমান তৈরি হয়। চিনের বিমানবাহিনী ২০২৩ সালে এই যুদ্ধবিমানের ব্যবহারও পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এগুলোর বদলে তারা নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, যেমন জেএফ-১৭ থান্ডার, চেংদু জে-১০ এবং সর্বাধুনিক সেংয়াং জে-৩৫ ব্যবহার করছে। চিনের পর সবচেয়ে বেশি এফ-৭ রয়েছে পাকিস্তানের। তারাও এ যুদ্ধবিমানকে পর্যায়ক্রমে বাদ দিয়ে নতুন প্রজন্মের চিনা যুদ্ধবিমান ব্যবহারে আগ্রহী হয়েছে।

ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া ডটকম নামের একটি ওয়েবসাইটের বরাত দিয়ে গত মে মাসে ঢাকার একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছিল, চীনের তৈরি চেংদু জে-১০সি মডেলের ১৬টি মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এসব পুরনো এফ-৭ ইন্টারসেপ্টরসহ বেশ কিছু যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপন করবে। বাংলাদেশ ৩২টি জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-থ্রি যুদ্ধবিমান সংগ্রহের ব্যাপারেও আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া ডটকম ‘মাইলস্টোন ট্রাজেডি’ বিষয়ক এক প্রতিবেদনে লিখেছে, “চূড়ান্ত বিশ্লেষণে, চেংদু এফ-৭ বাংলাদেশের সাহস ও সীমাবদ্ধতার প্রতীক—এটি একটি দ্রুত ও চতুর ইন্টারসেপ্টর, যা এখনও দেশের আকাশসীমা রক্ষা করে চলেছে, কিন্তু এখন এটির উত্তরসূরী প্রয়োজন, যাতে আর কোনো ট্র্যাজেডি না ঘটে।”

তারা আরো লিখেছে, “ঢাকায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি হয়তো একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে—যা আমাদের চিন্তিত করে তুলবে এই প্রশ্নে: পুরোনো, পরম্পরায় পাওয়া সেকেলে ব্যবস্তার উপর নির্ভর করে থাকলে তার মানবিক ও কৌশলগত মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বিশেষ করে এমন এক অঞ্চলে যেখানে আকাশের আধিপত্য জাতীয় নিরাপত্তার ভাগ্য নির্ধারক হয়ে উঠছে।”

“আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা যখন আকাশে তাদের আধিপত্য ও যুদ্ধক্ষমতা বিস্তারের দিকে আগাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সামনেও নিজের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়নের তাগিদ আরো জোরালো হয়ে উঠছে,” যোগ করেছে তারা।

উত্তরার সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর আইএসপিআর জানিয়েছে, একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি, পাইলটের ভুল, বা কোনো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিহত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ৭৬তম বিএএফএ কোর্স সম্পন্ন করে ৩৫ নম্বর স্কোয়াড্রনে কর্মরত ছিলেন। ক্যাডেট অবস্থায় তিনি পিটি-৬ উড়োজাহাজে প্রথম ১০০ ঘণ্টা উড্ডয়নের প্রশিক্ষণ নেন। পরে ১৫ নম্বর স্কোয়াড্রনে প্রায় ৬০ ঘণ্টা উড্ডয়ন সম্পন্ন করে ৩৫ নম্বর স্কোয়াড্রনে যোগ দিয়েছিলেন।

ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটির এ কে খন্দকার প্যারেড গ্রাউন্ডে তাঁর ফিউনারেল প্যারেডে বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান জানান, তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করবে। কোনো ত্রুটি বা গাফিলতি পাওয়া গেলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “প্রতিটি বিমানের একটি নির্ধারিত কার্যক্ষম সময় থাকে, সাধারণত ৩০ বছর। এই সময়ের মধ্যেই আমরা বিমানের প্রস্তুতকারী দেশ বা কোম্পানির মান অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ করি। বিধ্বস্ত বিমানটি পুরোনো ছিল না, এর প্রযুক্তি কিছুটা পুরোনো হতে পারে। তবে রক্ষণাবেক্ষণ বা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আমরা কখনোই আপস করি না।”

বাংলাদেশে বেসামরিক বৈমানিক, বা সামরিক বৈমানিক হতে চেয়ে, কিংবা ওড়ার দক্ষতা বাড়াতে গিয়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের নিয়ে আলোচনায় অনেকে ‘রঙ দে বাসন্তী’ চলচ্চিত্রের গল্প টেনে আনেন। ২০০৬ সালের ওই সিনেমায় নির্মাতা ওমপ্রকাশ মেহরা দেখিয়েছিলেন, দুর্নীতিবাজ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ঘুষ খেয়ে সস্তা যন্ত্রাংশ আমদানির করার কারণে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে মারা যান ভারতীয় বিমানবাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। মন্ত্রীর দুর্নীতি ঢাকতে দুর্ঘটনার জন্য বৈমানিকের ভুলকে দায়ী করে সরকার। অথচ ত্রুটিপূর্ণ বিমানটি জনবহুল শহরে বিধ্বস্ত হওয়া ঠেকাতে গিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সেই ঘটনার সাথে বাংলাদেশে পরিস্থিতি কেন মিলিয়ে দেখা হয়, তা বুঝতে আমাদের আরো কিছু ঘটনা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

৯ মে, ২০২৪। পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম। ককপিটে আগুন ধরার পর কর্ণফুলী নদীতে বিধ্বস্ত হয় রাশিয়ার তৈরি ইয়াক-১৩০ মডেলের একটি প্রশিক্ষণ জেট। বিমানবাহিনীর দুই পাইলট স্কোয়াড্রন লিডার মুহাম্মদ আসিম জাওয়াদ ও উইং কমান্ডার সুহান জহুরুল হক প্যারাসুট দিয়ে নেমে এসেছিলেন। গুরুতর আহত আসিম সেদিনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

২৭ জুলাই, ২০২২। নবাবগঞ্জ, ঢাকা। সেনাবাহিনীর বেল-২০৬ মডেলের একটি প্রশিক্ষণ হেলিকপ্টার ইঞ্জিন বিকলে যাওয়ায় একটি ধানক্ষেতে জরুরি অবতরণ করে বিধ্বস্ত হয়। এই ঘটনায় আহত দুই পাইলটের মধ্যে র‌্যাবের এয়ার উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন।

২৯ জুন, ২০১৫। বুকভরা বাঁওড়, যশোর। কে-৮ ডব্লিউ মডেলের প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে স্কোয়াড্রন লিডার সিরাজুল ইসলাম ও এনায়েত কবির পলাশ নিহত হন। আইএসপিআর জানায়, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

১৩ মে, ২০১৫। জহুরুল হক ঘাঁটি, চট্টগ্রাম। এমআই‑১৭‑২০০ মডেলের হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। দুই সপ্তাহ পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আহত স্কোয়াড্রন লিডার সাফায়াত সারোয়ার।

০১ এপ্রিল, ২০১৫। শাহ মখদুম বিমানবন্দর, রাজশাহী। বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির সেসনা-১৫২ বিমানের ইঞ্জিনে উড্ডয়ন পর আগুন ধরে যায়। নারী প্রশিক্ষণার্থী পাইলট তামান্না রহমান ঘটনাস্থলেই দগ্ধ হয়ে মারা যান এবং গুরুতর দগ্ধ ইনস্ট্রাক্টর শাহেদ কামাল মাসখানেক পর মৃত্যুবরণ করেন।

৮ এপ্রিল, ২০১২। টাঙ্গাইলের মধুপুরে। এল-৩৯ অ্যালবাট্রস জেট মডেলের প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট রেজা শরীফ। চেকোসলাভাকিয়ার তৈরি জেট ট্রেনারটি উড্ডয়নের কিছু সময় পরই দুর্ঘটনা ঘটে।

২০ ডিসেম্বর, ২০১০। বাবুগঞ্জ, বরিশাল। চিনা পিটি-৬ মডেলের একটি প্রশিক্ষণ বিমান ‘কাট অ্যান্ড গো’ প্রশিক্ষণ চলাকালে বিধ্বস্ত হয়। নিহত হন স্কোয়াড্রন লিডার আশরাফ ইবনে আহমেদ ও মাহমুদুল হক।

৩০ অক্টোবর, ২০১০। চৌহালি, সিরাজগঞ্জ। বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবের সেসনা-১৫২ মডেলে প্রশিক্ষণ বিমানটি ঢাকা থেকে রাজশাহী অভিমুখে যাওয়ার সময় যমুনা নদীতে বিধ্বস্ত হয়। কো-পাইলট শামসুদ্দিন আহত অবস্থায় উদ্ধার হলেও নিখোঁজ ক্যাপ্টেন কামরুল হাসানকে আর পাওয়া যায়নি।

৯ এপ্রিল, ২০০৭। পাথালিয়া, যশোর। এয়ার ফোর্স একাডেমি সংলগ্ন এই গ্রামে পিটি‑৬ মডেলের একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভূমিতে আছড়ে পড়লে ফ্লাইট ক্যাডেট ফয়সাল মাহমুদ – ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

২৪ এপ্রিল, ২০০৬। কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ। এখানেও পিটি-৬ মডেলের চিনা প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ফ্লাইট ক্যাডেট তানিজুল ইসলাম মারা গিয়েছিলেন। দগ্ধ অবস্থায় তার দেহ উদ্ধার করা হয়।

১৯ অক্টোবর, ২০০২। উখিয়া, কক্সবাজার। প্রশিক্ষণ ফ্লাইটের সময় বাংলাদেশ টেলিভিশন এর রিলে টাওয়ারের সাথে সংঘর্ষের ফলে বিধ্বস্ত হয় এমআই-১৭-২০০ হেলিকপ্টার। নিহত হন উইং কমান্ডার কামরুল নেওয়াজ,ফ্লাইং অফিসার এম সাব্বির আহমেদ, ওয়ারেন্ট অফিসার জহির হোসেন, ও সার্জেন্ট আবদুস সামাদ। একই বছরের ৩০ জুলাই চট্টগ্রামের আকাশে এ-৫সি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট আদনান মুকিদ।

৭ জানুয়ারি, ২০০১। এফটি-৭বি মডেলে দ্বি-আসন প্রশিক্ষণ জেট বিধ্বস্ত হলে স্কোয়াড্রন লিডার মোহাম্মদ মহসিন নিহত হন। কো-পাইলট স্কোয়াড্রন লিডার রেজা আমদাদ খান গুরুতর আহত হন কিন্তু পরবর্তীতে বেঁচে যান। ১৯৯৩ সালে এফটি-৫ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে কুদ্দুস নামের এক ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট এবং একই বছরে দুটি পিটি-৬ ট্রেনিং বিমানের সংঘর্ষে আরো তিনজন বৈমানিক নিহত হন। তারা হলেন উইং কমান্ডার হক, স্কোয়াড্রন লিডার ইসলাম ও শিক্ষার্থী ফ্লাইং অফিসার মাসুদ (কারো পুরো নাম জানা যায়নি)।

বাংলাদেশি গণমাধ্যমের সুবাদে আরো কিছু প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেলেও সেখানে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। যেমন: ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর কক্সবাজারে মহেশখালীতে দুটো ইয়াক-১৩০ আকাশে সংঘর্ষের পর বিধ্বস্ত হলেও কেউ মারা যায়নি। একই বছরের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বিমান বাহিনীর ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ  বিমানে আগুন ধরে গেলেও প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী প্যারাসুটের মাধ্যমে নিরাপদে অবতরণ করেন।

০৯ জানুয়ারি, ২০২১। শাহ মখদুম বিমানবন্দর, রাজশাহী। গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমির চেসনা-১৫২ মডেলের প্রশিক্ষণ বিমানটি বিমানবন্দরে অবতরণের সময় চাকাগুলো ভেঙে পড়লেও পাইলট বা তার প্রশিক্ষক, কেউ গুরুতর আহত হননি। ওই প্রশিক্ষণ বিমানটি ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ একই বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে ছিটকে পাশের মাঠে ঢুকে পড়ে। সে দুর্ঘটনায়ও কেউ হতাহত হয়নি।

২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর বগুড়ার কাহালুতে পিটি-৬, ২০০৯ সালের ১৬ জুন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী অঞ্চলে এফটি-৬, একই বছরের ২২ অক্টোবর বগুড়া সদরের উরুলিয়ায় আবারো পিটি-৬, পরের বছরের ২৩ সেপ্টেম্বরও কর্ণফুলী নদীতে একই মডেলের প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। ১৯৯৮ সালের ১৭ নভেম্বর ও ২০১৩ সালের ১৪ জুলাই ন্যাঞ্ছাং এ সিরিজের প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের খবরও আপনি খুঁজে পাবেন পুরানো পত্রিকার পাতায়। এছাড়া ১৯৯৬ সালের ৮ মে একটি মিগ-২১, ২০০৩ সালের ১৫ নভেম্বর পাইপার সেসনা এস-২ প্রশিক্ষণের সময় বিধ্বস্ত হয়।

বিধ্বস্ত হওয়া বিমানগুলোর মধ্যে কিছু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, আবার কতগুলো পুনরায় ঠিক করে আবার সার্ভিসে আনা হয়েছে। মুক্তসূত্র থেকে পাওয়া আরো দুটো তথ্য এই লেখার পাঠকের জানা উচিত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর। ডিসি-৩ প্রশিক্ষণ বিমানটি ঢাকার কাছে বিধ্বস্ত হলে পাঁচ জন নিহত হন।

১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে অবতরণ করার সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফকার এফ ২৭-৬০০ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (এখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) কাছাকাছি একটি জলাভূমির মধ্যে বিধ্বস্ত হয়। বিমানটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পূর্বনির্ধারিত ঘরোয়া যাত্রী ফ্লাইট পরিচালনা করছিল।

লেখাটি বড় হয়ে যাচ্ছে, শেষ করা দরকার। তার আগে একটু বর্তমানে ফিরি। শুধু পাঠকদের নয়, নিজেকেও কিছু আশার কথা শোনাই। শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ডে অভিভাবকের ফোন নাম্বার ও শিক্ষার্থীর রক্তের গ্রুপ উল্লেখের ব্যবস্থা নিতে আজ নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। উত্তরায় আহতদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আরো ৩০ জনের আঘাত মোটামুটি গুরুতর। তাদের চিকিৎসায় সহায়তা করতে আজকের মধ্যেই সিঙ্গাপুর ও ভারতের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সরা ঢাকায় পৌঁছাবেন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
[ঢাকা, বাংলাদেশ থেকে প্রথম প্রকাশ: ২২ জুলাই, ২০২৫, ৮.৫৭ পিএম]

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান