একটি ছোট্ট সংশোধনী দিতে চাই। সংবাদপন্থী অসম্পাদিত ভাবনায় ‘বাংলাদেশ ২.০’- এমন শিরোনামে সর্বশেষ যে লেখাটি প্রকাশ করেছিলাম, সেখানে বাংলাদেশি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে
খুলনার দুটি ঘটনার কথা আমি উল্লেখ করেছি। “৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, খুলনায় দুজনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে বলে খবর এসেছে গণমাধ্যমে। যার মধ্যে একজন হিন্দু কলেজ ছাত্র। মুসলিমদের মহানবীকে কটূক্তির অভিযোগ তোলা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। নিরাপত্তা বাহিনীর সামনেই তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। খবরে প্রকাশ, অপরজনকে হত্যা করা হয়েছিল চোর সন্দেহে।” এমনটাই লিখেছিলাম। একদিন পরই আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গণপিটুনির শিকার সেই হিন্দু যুবক মারা যাননি। তিনি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন আছেন। এবার নতুন আলাপে আসি।
পরিচয়টা পেশাগত হলেও ব্যক্তিগতভাবে যাদের কাছের মানুষ হিসেবে ভাবি, তেমন অনেকে ৫ আগস্টের পর থেকে এমন আচরণ করছেন, যেন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের জন্য আমিও খুব দায়ী। দূরবর্তী লোকজন এমনটা ভাবলে মোটেও আশ্চর্য হতাম না। কিন্তু যখন টের পাই এমন ব্যক্তিরাও আমার পেশাদারিত্ব বা নৈতিক অবস্থান নিয়ে সন্দিহান, যারা কমপক্ষে দেড় দশক ধরে মোটামুটি কাছ থেকেই আমাকে দেখছেন, তখন খটকা লাগে বৈকি। তাদেরই একজন ১০ অক্টোবর আমার ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করেন- “কেন, এজন্যই না আন্দোলন করলা?” তাঁকে বলেছিলাম, “সাংবাদিকরা আন্দোলন করে না, আন্দোলনকে জানে এবং জানায়। যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনটা হয়, তাদের মনে হয়, সাংবাদিকরাও আন্দোলন করতেছে। আসলে তারা সাংবাদিকতাই করতেছেন।”
একই পোস্টের কারণে অন্তবর্তী সরকারের পদস্থ এক কর্মকর্তা জানতে চেয়েছিলেন, “২০২১ সালের অক্টোবরের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলাকালে আমি কতোটা লজ্জিত হয়েছিলাম, এবং লজ্জিত হয়ে কী করেছিলাম?” সেবার দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনে বাংলাদেশের কুমিল্লা শহরের নানুয়ার দীঘির উত্তরপাড় পূজামণ্ডপে একটি হনুমান মূর্তির হাঁটুর উপর ইসলাম ধর্মের ধর্মগ্রন্থ কোরআন পাওয়ার খবরে দেশের বিভিন্ন জেলার পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছিল।
এবার চট্টগ্রামের জে এম সেন হলের দুর্গাপূজার সপ্তমীর অনুষ্ঠানে ইসলামি সংগীত পরিবেশনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরপর ফেসবুকে দেওয়া ওই পোস্টে লিখেছিলাম, “মুসলিম হয়েও প্রতিবার মহালয়া আর বিজয়া, এই দুইদিন সবাইকে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানাতাম। এবার মহালয়াতে জানাতে পারিনি, লজ্জায়। যা শুরু হয়েছে, বিজয়াতেও মনে হয় পারবো না। সনাতন বন্ধুদের চোখের দিকেই তাকাতে পারছি না।” এটা আসলে কোনো একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া ছিল না। তখন একযোগে অনেক ঘটনা, বিশেষত বহু পুরানো বন্ধুর নিরূপায় মুখ আর চোখ ভরা শঙ্কা আমাকেও তাড়া করে ফিরছে। তবে পরে কিন্তু আমি ঠিকই সবাইকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানিয়েছি। কারণ তার আগেই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রকাশ্যে বলেছেন, “নিজেদের মনে করিয়ে দেই, সেনাবাহিনীকে দিয়ে, পুলিশকে দিয়ে, র্যাবকে দিয়ে আনন্দ, উৎসবের আয়োজন করতে যাওয়াটা আমাদের ব্যর্থতা।” তার এই মনোভাবে কিছু লজ্জা কাটে।
যদিও এর আগে মার্কিন পাবলিক ব্রডকাস্টিং সংস্থা এনপিআরকে দেওয়া সাক্ষাতকারে ড. ইউনূস বলেছিলেন, “আপনি যখন বলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হচ্ছে, সেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় শেখ হসিনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। সুতরাং আপনি পার্থক্য করতে পারবেন না যে, তারা শেখ হাসিনার অনুসারী হওয়ার কারণে তাদের উপর হামলা হয়েছে নাকি তারা হিন্দু বলে তাদের ওপর হামলা হয়েছে। কিন্তু তাদের ওপর হামলা হয়েছে, এটা নিশ্চিত। কিন্তু তারপর আমরা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করি। আমি সবাইকে বলতে থাকি যে, আমাদের মতভেদ থাকতে পারে। এর মানে এই নয় যে, আমাদের একে অপরকে আক্রমণ করতে হবে।”
এটি সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের অনুবাদ। এখানে সরকার প্রধানের বক্তব্যে বাংলাদেশের সব হিন্দুকে যেভাবে শেখ হাসিনার অনুসারী বলা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক বা প্রতিবাদ হতে পারে। যদিও দেশে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো বিএনপি নেতা, কিংবা জামায়াতে ইসলামীর হিন্দুর শাখার উপস্থিতিই ড. ইউনূসের এমন ভাষ্য বাতিলের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তিনি যেভাবে জানালেন, “হামলা হয়েছে, এটা নিশ্চিত;” লুকোছাপাহীন এমন বক্তব্য আশাজাগানিয়া। তবে যুগে যুগে মানুষ ক্ষমতার বৈশিষ্ট্যকে যতোটা বদলেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের চরিত্রকে বদলিয়েছে ক্ষমতা। যে কারণে বহু জনপদে বহু ক্ষমতাধর স্রেফ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে ক্ষমতার দাস হয়ে যায়। দুনিয়ায় এমন ঘটনা এতোটাই অহরহ যে, মানুষ ক্ষমতার দাসদের ক্ষমতাধর ভাবতে শুরু করেছে। যে কারণে কোথাও ক্ষমতার স্বভাবকে বদলে দেওয়ার বিপ্লব শুরু হলে জনমনে আশার সাথেই জাগে ভয়। নিশ্চয়ই এটা নতুন বা দোষের কিছু নয়। আমরা দেখেছি, কখনো কখনো সুবিধাবাদের সামনে কোনো কোনো মতবাদ দাঁড়িয়ে গেলেও তা টিকতে পারেনি; মানে ক্রমশ প্রভাব হারিয়েছে।
স্তুতিজীবীতার সাথে বুদ্ধিজীবীদের দুরত্ব নির্ণয় এবং তা পরিমাপের সক্ষমতা থাকা সাংবাদিকদের জন্য কতটা জরুরী তা নিয়ে সংবাদভোক্তারা কতটা ভাবেন তা আমার জানা নেই। তবে আমি জানি, স্বতঃস্ফূর্ত সাংবাদিকতা সতত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রের প্রত্যেক সহজাত সাংবাদিক নেহাতই আত্মঘাতী কীট।
চলবে..

