![]() |
| সহযোদ্ধা বেষ্টিত বঙ্গবন্ধু |
মামলার অভিযোগ ছিলো যে, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ভারতের সাথে মিলে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এটির পূর্ণ নাম ছিল রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবর রহমান গং মামলা। তবে তা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবেই বেশি পরিচিতি পায়। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে কথিত ষড়যন্ত্রটি শুরু হয়েছিলো বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়। মামলাটি নিষ্পত্তির চার যুগ পর ২০১১ সালে প্রকাশিত ‘সত্য মামলা আগরতলা’ বইতে ২৬ নম্বর আসামী ক্যাপ্টেন এম শওকত আলী (পরবর্তীতে কর্ণেল, অব.) এটিকে ‘সত্য মামলা’ বলে দাবি করেন।
ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসে একটি সুরক্ষিত কক্ষে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। মোট ১০০টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়। সরকার পক্ষে মামলায় ১১ জন রাজসাক্ষীসহ মোট ২২৭ জন সাক্ষীর তালিকা আদালতে পেশ করা হয়। তন্মধ্যে চার জন রাজসাক্ষীকে সরকার পক্ষ থেকে বৈরী ঘোষণা করা হয়। এর আগে ব্রিটিশ আইনজীবী ও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য টমাস উইলিয়াম ১৯৬৮ সালের ৫ আগস্ট শেখ মুজিবের পক্ষে ট্রাইব্যুনাল গঠন সংক্রান্ত বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন পেশ করেন। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনায় তাঁর সহযোগী ছিলেন আবদুস সালাম খান, আতাউর রহমান খান প্রমুখ। সরকার পক্ষে প্রধান কৌশুলী ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী মঞ্জুর কাদের ও অ্যাডভোকেট জেনারেল টিএইচ খান। তিন সদস্য বিশিষ্ট ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি এসএ রহমান। তিনি ছিলেন অবাঙালি। অপর দুজন এম আর খান ও মুকসুমুল হাকিম ছিলেন বাঙালি। মূলত এই সময় সরকারি নির্দেশে মামলাটিকে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে আখ্যায়িত হয়। মামলার এ শিরোনামের পেছনে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল; মামলার এ নামকরণ করে শেখ মুজিবকে দেশের জনগণের কাছে ভারতীয় চর ও বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলে জনসমর্থন সরকারের পক্ষে যাবে এবং শেখ মুজিবকে কঠোর সাজা দেয়া সম্ভব হবে। কিন্তু সরকারি সাক্ষীরা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সরকারের বিপক্ষেই বিষোদ্গার করতে থাকেন। সাক্ষীরা বলেন, সরকার তাদের নির্যাতন করে এ মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছে, অথচ এ মামলা সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। ফলে দেশবাসীর কাছে এটি সরকারের একটি ষড়যন্ত্র হিসাবে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ততোদিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সরকারি এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ সকল বন্দির মুক্তির দাবিতে গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। প্রবল গণ-আন্দোলন তথা উত্তাল ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খানের সরকার পিছু হটতে শুরু করে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে একান্ত বাধ্য হয়। সরকার প্রধান হিসেবে আইয়ুব খান সমগ্র পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করতে বাধ্য হন। এই গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের পতন ঘটে।
![]() |
| ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে.. |
এসব কারণে ঐতিহাসিকরা এই মামলা এবং মামলা থেকে সৃষ্ট গণ-আন্দোলনকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পেছনে প্রেরণাদানকারী অন্যতম প্রধান ঘটনা বলে গণ্য করে থাকেন। এমনি উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ঢাকা সেনানিবাসে মামলার ১৭ নম্বর আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ খবর প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষুদ্ধ জনতা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনসহ বেশকিছু সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করে। ওই সময় অতিথি ভবনে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এস এ রহমান ও সরকার পক্ষের প্রধান কৌঁসুলি মঞ্জুর কাদের অবস্থান করতেন। তারা উভয়েই পালিয়ে যান এবং সেখানে মামলার কিছু নথিপত্র পুড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে এবং শেখ মুজিবসহ সকল বন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয়। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবর রহমানসহ মামলায় অভিযুক্তদের এক গণসম্বর্ধনা দেয়া হয় এবং শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
![]() |
| ট্রাইব্যুনালে বঙ্গবন্ধু |
মামলা প্রত্যাহারের পরও সরকারের রোষানলে ছিলেন অভিযুক্তরা পরেও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভোরে মামলার দুই নম্বর আসামী নৌ বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেমকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী । সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী সংসদেও ঘোষণা করেছিলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্রের ঘটনা পুরোপুরি সত্য ছিলো। তার ‘সত্য মামলা আগরতলা’ বইয়ের ভূমিকায় তিনি বলেন, “জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আমরা যাঁরা মামলাটিতে অভিযুক্ত ছিলাম, ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি তাদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। কারণ আমরা ষড়যন্ত্রকারী ছিলাম না। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে আমরা বঙ্গবন্ধুর সম্মতি নিয়ে একটি বিপ্লবী সংস্থা গঠন করেছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, একটি নির্দিষ্ট রাতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমরা বাঙালিরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব কটি ক্যান্টনমেন্টে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অস্ত্র কেড়ে নেব, তাদের বন্দী করব এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করব।” শওকত তার বইতে আরো জানান, ১৯৬১ সাল থেকেই কতিপয় দেশ প্রেমিক বাঙালি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর অফিসার বাংলাদেশকে সশস্ত্র পন্থায় স্বাধীন করার জন্য রীতিমত গোপন সংস্থা তৈরির কাজ হাতে নিয়েছিলো।
![]() |
| সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে এবং শেখ মুজিবসহ সকল বন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয় |






এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান